প্রচণ্ড গরম আনছে এল নিনো, জাতিসংঘের সতর্কতা

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: শিগগিরই শক্তিশালী এল নিনো তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, তীব্র তাপপ্রবাহ, খরা, অতিবৃষ্টিসহ চরম বৈরী আবহাওয়া দেখা দিতে পারে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রভাব আরও তীব্র হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানীরা। গত মঙ্গলবার বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) জানিয়েছে, চলতি জুন থেকে আগস্টের মধ্যে এল নিনো গড়ে ওঠার ৮০ শতাংশ সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে এ সময়ে বিশ্বের অধিকাংশ অঞ্চলে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা বিরাজ করবে। 
এল নিনো হলো মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার একটি প্রাকৃতিক আবহাওয়া প্রক্রিয়া। সাধারণত এটি ৯ থেকে ১২ মাস স্থায়ী হয়। তবে এবার এটির নভেম্বর পর্যন্ত স্থায়ী থাকার সম্ভাবনা ৯০ শতাংশ। এল নিনো প্রতি দুই থেকে সাত বছর পর পর দেখা দেয়। এ সময় বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ধরনে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে। কোথাও খরা দেখা দেয়, আবার কোথাও অতিবৃষ্টি ও বন্যার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
ডব্লিউএমওর মহাসচিব সেলেস্টে সাউলো রয়টার্সকে বলেন, ‘সম্ভাব্য শক্তিশালী এল নিনোর জন্য আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে। এটি খরা ও অতিবৃষ্টিকে আরও তীব্র করবে এবং স্থলভাগ ও সমুদ্রে তাপপ্রবাহের ঝুঁকি বাড়াবে।’ তিনি বলেন, ইতোমধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী জলবায়ুজনিত অন্যতম ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে তাপপ্রবাহ। এল নিনো এই ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে। ফলে তাপজনিত অসুস্থতা, মশাবাহিত ও অন্যান্য রোগের বিস্তার এবং খাদ্য ও পানিসম্পদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এবারের এল নিনো নিয়ে উদ্বেগের দুটি প্রধান কারণ রয়েছে। প্রথমত, এটি স্বাভাবিকের তুলনায় শক্তিশালী হতে পারে। দ্বিতীয়ত, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এর প্রভাব আরও মারাত্মক হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। গ্রিন হাউজ গ্যাস নিঃসরণের ফলে শিল্পবিপ্লব-পূর্ব সময়ের তুলনায় পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ইতোমধ্যে প্রায় ১ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। ফলে এল নিনো দেখা দিলে তাপমাত্রা আরও দ্রুত বাড়তে পারে এবং খরা, তাপপ্রবাহ, দাবানল, বন্যা ও ফসলহানির মতো দুর্যোগ আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
যুক্তরাজ্যের লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পিয়ার্স ফস্টার রয়টার্সকে বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের বিদ্যমান প্রভাবের কারণে এল নিনো ঘটলে এসব আবহাওয়াজনিত ঘটনা আরও তীব্র ও ক্ষতিকর হয়ে ওঠে।’ এল নিনো ও জলবায়ু পরিবর্তনের যৌথ প্রভাবে ২০২৭ সাল স্মরণকালের সবচেয়ে উষ্ণ বছর হতে পারে বলে সতর্ক করেছে ডব্লিউএমও। এখন পর্যন্ত শক্তিশালী এল নিনোর কারণে এই রেকর্ড ২০২৪ সালের দখলে। 
ডব্লিউএমও জানিয়েছে, এপ্রিলের শেষদিক থেকে মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে, যা এল নিনো গঠনের স্পষ্ট ইঙ্গিত। এ ছাড়া ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরে গড়ের তুলনায় ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি উষ্ণ পানি জমা হয়েছে, যা পৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করছে। 
সাধারণত এল নিনোর সময় দক্ষিণ আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চল, যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চল, আফ্রিকার শৃঙ্গ অঞ্চল এবং মধ্য এশিয়ায় বৃষ্টিপাত বাড়ে। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া, মধ্য আমেরিকা, ইন্দোনেশিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ার কিছু অংশে খরা দেখা দিতে পারে। একইসঙ্গে মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের প্রবণতাও বেড়ে যায়।
২০২৪ সালে ব্রাজিলের রিও গ্রান্দে দো সুল অঙ্গরাজ্যে ভয়াবহ বন্যায় ১৮০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয় এবং প্রায় ৬ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও এল নিনো মিলেই ওই দুর্যোগকে তীব্র করেছিল। কিছু দেশের আবহাওয়া সংস্থা ইতোমধ্যে সতর্ক করেছে, ২০২৬ সালের দ্বিতীয়ার্ধে এশিয়ায় আরও গরম ও শুষ্ক আবহাওয়া দেখা দিতে পারে। ফলে কৃষি উৎপাদনে ক্ষতির সঙ্গে খাদ্য সরবরাহে চাপ বাড়তে পারে।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেন, ‘এটিকে ‘জরুরি জলবায়ু সতর্কবার্তা’ হিসেবে নিতে হবে বিশ্বকে। এল নিনো উষ্ণ হয়ে ওঠা পৃথিবীর আগুনে আরও জ্বালানি যোগ করবে।’ জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে দ্রুত অগ্রসর হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।