জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: দেশের বিদেশি ঋণের পরিমাণ এক দশকে বেড়েছে প্রায় তিনগুণ। শুধু ঋণ নেওয়াই নয়, বাড়ছে সেই ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধের চাপও। একদিকে সরকারি ঋণ, অন্যদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার সভরেন গ্যারান্টিযুক্ত ঋণ এবং বেসরকারি খাতের বিদেশি ঋণ-সব মিলিয়ে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ পরিস্থিতি নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ।
জানা যায়, বিদেশি ঋণ ও সুদ পরিশোধ ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে সাড়ে ৭ বিলিয়ন ডলার।
বিশ্বব্যাংকের সম্প্রতি প্রকাশিত ‘ইন্টারন্যাশনাল ডেট স্ট্যাটিসটিকস ২০২৬’ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে দেশের বিদেশি ঋণ ও পরিশোধের এই চিত্র। ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এক দশকে বাংলাদেশের বিদেশি ঋণ বেড়েছে ১৯২ দশমিক ৫৯ শতাংশ।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সাল শেষে বাংলাদেশের মোট বিদেশি ঋণ ছিল ৩৮ দশমিক ৭৭১ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সাল শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১৩ দশমিক ৪৩৮ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ ১০ বছরে ঋণ বেড়েছে ৭৪ দশমিক ৬৬৭ বিলিয়ন ডলার।
ঋণ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উল্লম্ফন দেখা যায় ২০২০ ও ২০২১ সালে। ২০২০ সালে ঋণ বাড়ে ১১ দশমিক ০৮৪ বিলিয়ন ডলার। পরের বছর আরও ১৭ দশমিক ৯২৭ বিলিয়ন ডলার বেড়ে মোট ঋণ দাঁড়ায় ৯১ দশমিক ৪৮৬ বিলিয়ন ডলারে।
দীর্ঘমেয়াদি ঋণই এই ঋণের বড় অংশ। ২০১৫ সালে যার পরিমাণ ছিল ৩২ দশমিক ১৩৩ বিলিয়ন ডলার, ২০২৫ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৯৯ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে স্বল্পমেয়াদি ঋণ ৬ দশমিক ৬৩৮ বিলিয়ন থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪ দশমিক ০৫৮ বিলিয়ন ডলারে। স্বল্পমেয়াদি ঋণের প্রায় পুরোটাই বেসরকারি খাতের।
করোনাকালে আন্তর্জাতিক বাজারে সুদহার কম থাকায় ২০২১ সালে বেসরকারি খাতে বিদেশি ঋণ গ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। ওই বছর স্বল্পমেয়াদি ঋণ এক লাফে ৬৪ দশমিক ৬৪ শতাংশ বেড়ে ১৮ দশমিক ০৮৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক সুদহার, বিশেষ করে সোফর বেড়ে যাওয়ায় বেসরকারি উদ্যোক্তারা ঋণ পরিশোধ শুরু করেন। ফলে ২০২৩ ও ২০২৪ সালে স্বল্পমেয়াদি ঋণ কমে যায়।
এদিকে, সরকারি ও সভরেন গ্যারান্টিযুক্ত বিদেশি ঋণ ২০১৫ সালের ২৭ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে দাঁড়িয়েছে ৮৩ দশমিক ৪৫৭ বিলিয়ন ডলারে। সরকারের দীর্ঘমেয়াদি ঋণের সবচেয়ে বেশি ২৫ দশমিক ২৭ শতাংশ বিশ্বব্যাংক থেকে, প্রায় ২০ শতাংশ এডিবি থেকে এবং ১৪ দশমিক ২১ শতাংশ জাপান সরকারের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে। রাশিয়ার অংশ ১০ শতাংশ।
ঋণ পরিশোধের হিসাবেও বড় পরিবর্তন এসেছে। ২০১৫ সালে দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি ঋণের আসল পরিশোধের পরিমাণ ছিল ১ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৪ দশমিক ৮৮৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক দশকে বেড়েছে ২৭৯ শতাংশ।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র সুদ পরিশোধে। ২০১৫ সালে বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হয়েছিল ৩৩১ মিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৫০৯ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ সুদ পরিশোধ বেড়েছে ৬৫৮ শতাংশ।
এর মধ্যে ২০২৫ সালে সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধ করা হয়েছে ১ দশমিক ৯৯৪ বিলিয়ন ডলার। বেসরকারি খাতের দীর্ঘমেয়াদি ঋণের সুদ পরিশোধ হয়েছে ৫১৫ মিলিয়ন ডলার।
বর্তমানে সরকারি বিদেশি ঋণের গড় পরিশোধকাল প্রায় ২৫ বছর। এর মধ্যে গ্রেস পিরিয়ড ছয় বছর। আর সরকারি ঋণের ভারিত গড় সুদহার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ শতাংশে।
সব মিলিয়ে ২০২৫ সাল শেষে বাংলাদেশের বিদেশি ঋণ মোট জাতীয় আয়ের ২৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ২০১৫ সালে ছিল ১৮ দশমিক ১ শতাংশ। একই সময়ে বিদেশি ঋণ পরিশোধের পরিমাণ জাতীয় আয়ের ২ শতাংশে পৌঁছেছে।
অর্থাৎ বিদেশি ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধির পাশাপাশি আসল ও সুদ পরিশোধের চাপও বাড়ছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে।
—জা. অর্থনীতি/এলএটি