জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: একজন সরকারি কর্মকর্তা সারা বছর নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করলেন। সময়মতো মানুষের সেবা দিলেন, ফাইল নিষ্পত্তি করলেন, দায়িত্বের বাইরে গিয়েও কাজ করলেন। অন্যদিকে, আরেকজন কর্মকর্তা কাজে অবহেলা করলেন, ফাইল আটকে রাখলেন, মানুষের ভোগান্তি বাড়ালেন। কিন্তু বছর শেষে দুজনের বেতন বৃদ্ধির নিয়ম যদি প্রায় একই হয়, তাহলে ভালো কাজ করার বাড়তি প্রণোদনা কোথায়?
সরকারি চাকরিতে বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে কাজের মান, দক্ষতা এবং কর্মদক্ষতার সরাসরি সম্পর্ক থাকা উচিত কি না, এই প্রশ্ন এখন গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিকভাবে এ ব্যবস্থাকে বলা হয় পারফরম্যান্সভিত্তিক বেতন বা কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে বেতন বৃদ্ধি।
এ ব্যবস্থায় শুধু চাকরির বয়স বা পদ নয়, একজন কর্মী কতটা ভালো কাজ করছেন, নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণ করছেন কি না এবং তার কাজের ফলাফল কেমন—এসব বিষয়ও বেতন বৃদ্ধি বা অতিরিক্ত আর্থিক পুরস্কারের ক্ষেত্রে বিবেচনা করা হয়।
তবে বাংলাদেশে বিষয়টি বুঝতে হলে একটি পার্থক্য পরিষ্কার করা জরুরি। সরকারি দপ্তরের কাজের মূল্যায়ন হয় না, এমন নয়। বরং দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানের কর্মসম্পাদন মূল্যায়নের ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু সেই মূল্যায়নের ফল প্রত্যেক সরকারি কর্মচারীর ব্যক্তিগত বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত—এমন সাধারণ নিয়ম আছে বলে দাবি করা ঠিক হবে না।
বাংলাদেশে আগে বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি বা এপিএ ব্যবস্থার মাধ্যমে মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য নির্ধারণ এবং সেসব লক্ষ্য অর্জনের অগ্রগতি মূল্যায়ন করা হতো। তবে ২০২৫ সালের অক্টোবরে এপিএর পরিবর্তে সরকারি কর্মসম্পাদন পরিবীক্ষণ পদ্ধতি বা জিপিএমএস চালুর বিষয়ে পরিপত্র জারি করা হয়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্যও এ পদ্ধতির নির্দেশিকা প্রকাশিত হয়েছে।
এখানে মূল বিষয় হলো, একটি দপ্তর তার লক্ষ্য পূরণ করল কি না, সেটি এক ধরনের মূল্যায়ন। আর সেই দপ্তরের প্রত্যেক কর্মচারী ব্যক্তিগতভাবে কতটা দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করলেন, সেটি আরেক ধরনের মূল্যায়ন। এই দুটিকে এক করে দেখলে ভুল হবে।
এবার দেখা যাক, আন্তর্জাতিক গবেষণা কী বলছে।
অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা বা ওইসিডির তথ্য অনুযায়ী, অনেক উন্নত দেশে সরকারি কর্মীদের পদোন্নতি, বোনাস কিংবা কিছু ক্ষেত্রে বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে কর্মদক্ষতার মূল্যায়ন যুক্ত রয়েছে। তবে সব দেশ একই পদ্ধতি অনুসরণ করে না। কোথাও ভালো কাজের জন্য এককালীন বোনাস দেওয়া হয়, কোথাও বেতন বৃদ্ধির সিদ্ধান্তে কর্মদক্ষতা বিবেচনা করা হয়।
কিন্তু এই ব্যবস্থা চালু করলেই যে সরকারি সেবার মান নিশ্চিতভাবে বেড়ে যাবে, তা নয়।
বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব কাজে ফলাফল সহজে পরিমাপ করা যায়, সেখানে কর্মদক্ষতার সঙ্গে আর্থিক পুরস্কার যুক্ত করলে ইতিবাচক ফল পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। যেমন, নির্দিষ্ট মানদণ্ডে শিক্ষার ফলাফল, স্বাস্থ্যসেবার কিছু পরিমাপযোগ্য ফল কিংবা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য মূল্যায়ন করা তুলনামূলকভাবে সহজ হতে পারে।
কিন্তু প্রশাসনের অনেক কাজের ফলাফল মাপা কঠিন। একজন কর্মকর্তা কতটি ফাইল নিষ্পত্তি করলেন, সেটি গোনা যায়। কিন্তু তার সিদ্ধান্ত কতটা সঠিক ছিল, মানুষ কতটা ভালো সেবা পেলেন কিংবা দীর্ঘমেয়াদে সেই সিদ্ধান্তের প্রভাব কী হলো, সেগুলো শুধু সংখ্যায় প্রকাশ করা কঠিন।
২০১২ সালে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের একটি গবেষণায় ১১০টি গবেষণার ফল পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ৬৫টি গবেষণায় কর্মদক্ষতাভিত্তিক বেতনের ইতিবাচক প্রভাব পাওয়া গেছে। তবে অধিকাংশ শক্তিশালী প্রমাণ এসেছে এমন পেশা থেকে, যেখানে কাজের ফলাফল তুলনামূলকভাবে সহজে মাপা যায়। সাধারণ প্রশাসনিক চাকরিতে এই ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ ছিল সীমিত।
তাহলে বাংলাদেশের জন্য কেপিআই বা মূল কর্মদক্ষতা সূচকভিত্তিক ইনক্রিমেন্ট চালু করা কতটা সম্ভব?
প্রথমত, প্রতিটি পদের কাজ অনুযায়ী পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। যেমন, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেবা দেওয়া, আবেদন নিষ্পত্তি, অভিযোগের সমাধান এবং কাজের মান বজায় রাখা। তবে শুধু কাজের সংখ্যা বাড়ানোর লক্ষ্য দিলে ভুল সিদ্ধান্ত বা তাড়াহুড়োর ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, মূল্যায়ন হতে হবে স্বচ্ছ। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তিতে নম্বর দেওয়া হলে এই ব্যবস্থা কর্মদক্ষতার বদলে পক্ষপাতকে উৎসাহিত করতে পারে। তাই নির্দিষ্ট মানদণ্ড, লিখিত প্রমাণ এবং মূল্যায়নের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ থাকা জরুরি।
তৃতীয়ত, সব কর্মীর কাজ একই ধরনের নয়। একজন চিকিৎসক, একজন শিক্ষক, একজন প্রকৌশলী এবং একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তার কাজের ফলাফল একই সূচকে মাপা সম্ভব নয়। তাই পদভিত্তিক মূল্যায়ন দরকার।
সবশেষে, কর্মদক্ষতার সঙ্গে বেতন বৃদ্ধির সম্পর্ক তৈরি করতে হলে প্রশিক্ষণ, প্রয়োজনীয় জনবল, কাজের সরঞ্জাম এবং ন্যায্য কর্মপরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে। কর্মীর হাতে প্রয়োজনীয় সম্পদ না দিয়ে শুধু লক্ষ্য পূরণের চাপ দিলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।
অর্থাৎ, বাংলাদেশের সরকারি চাকরিতে কেপিআইভিত্তিক ইনক্রিমেন্ট চালুর সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু এটি বাস্তবায়নের আগে মূল্যায়নের মান, পক্ষপাত ঠেকানো, কাজের ধরন অনুযায়ী সূচক তৈরি এবং কর্মীদের আপিলের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
কারণ, লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু কম কাজ করলে বেতন আটকে দেওয়া নয়; বরং ভালো কাজকে স্বীকৃতি দেওয়া, দুর্বলতার জায়গা চিহ্নিত করা এবং সরকারি সেবার মান বাড়ানো।
শেষ পর্যন্ত সরকারি কর্মচারীর বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে কর্মদক্ষতার সম্পর্ক তৈরি করা যেতে পারে। তবে সেটি যেন কাগজে-কলমে নম্বর দেওয়ার ব্যবস্থা না হয়ে ওঠে। মূল্যায়ন হতে হবে ন্যায্য, পরিমাপযোগ্য এবং মানুষের বাস্তব উপকারের সঙ্গে সম্পর্কিত।
একজন সরকারি কর্মকর্তা সময়মতো মানুষের সেবা দিলেন, আরেকজন কাজে অবহেলা করলেন। কিন্তু বেতন বৃদ্ধির নিয়ম যদি একই হয়, তাহলে ভালো কাজের বাড়তি পুরস্কার কোথায়? আন্তর্জাতিকভাবে এর একটি সমাধান হলো কর্মদক্ষতাভিত্তিক বেতন। এতে নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণ, কাজের মান এবং দায়িত্ব পালনের ফলাফল বিবেচনা করা হয়। তবে বিশ্বব্যাংকের গবেষণা বলছে, সব ধরনের সরকারি কাজে এই পদ্ধতির ফল এক নয়। তাই শুধু কাজের সংখ্যা নয়, কাজের মানও যাচাই করতে হবে। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের সরকারি চাকরিতে ভালো কাজের জন্য আলাদা আর্থিক পুরস্কারের ব্যবস্থা কতটা কার্যকরভাবে চালু করা সম্ভব?
—জা. অর্থনীতি/এলএটি