জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: নতুন নাম, নতুন মোড়ক, কিন্তু পুরোনো আর্থিক সংকটই কি আড়াল করার চেষ্টা? বিপিএলের বাইরে ঘরোয়া ক্রিকেটে নতুন ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্ট, ডোমেস্টিক থ্রি বা ডি থ্রি। তিন ফরম্যাটের এই আয়োজন ঘিরে প্রত্যাশা থাকলেও, টুর্নামেন্টের দল বণ্টন, বিসিবির অর্থ ব্যয় এবং খেলোয়াড় নির্বাচনের নিয়ম নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। যে আসরকে ঘিরে নতুন বাণিজ্যিক সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে, সেটি শেষ পর্যন্ত ক্রিকেট বোর্ডের জন্য কতটা লাভজনক হবে?
টুর্নামেন্টে অংশ নিচ্ছে ছয়টি ফ্র্যাঞ্চাইজি। এর মধ্যে পাঁচটি দলের সঙ্গে বিসিবির পরিচালকদের সম্পৃক্ততার কথা উঠে এসেছে। এইচ ব্লুস্টারের সঙ্গে যুক্ত পরিচালক শাহনিয়ান তানিম, সিটিজেন ব্যাংকের সঙ্গে মাসুদুজ্জামান মাসুদ, একমি গ্রুপের সঙ্গে ফাহিম সিনহা এবং ফরচুন গ্রুপের সঙ্গে মিজানুর রহমান। সেভেন রিংস সিমেন্টের মালিক সাইফ রহমান বিসিবি সভাপতির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে রয়েছে ওয়ালটন গ্রুপ।
ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর সঙ্গে বোর্ড পরিচালকদের এমন সম্পৃক্ততা স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন তুলতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা নির্ধারণে মালিকানা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং স্বার্থের সংঘাতসংক্রান্ত নীতিমালা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
আরেকটি প্রশ্ন, মাত্র দুটি কোম্পানি কেন এই টুর্নামেন্টে পৃষ্ঠপোষক হতে আগ্রহ দেখিয়েছে? স্থানীয় ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ কম হলে টুর্নামেন্টের দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক সম্ভাবনা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়।
এবার আসা যাক অর্থের হিসাবে। ডি থ্রিতে প্রতিটি ফ্র্যাঞ্চাইজির জন্য ফি নির্ধারণ করা হয়েছে আড়াই কোটি টাকা। কিন্তু একই সঙ্গে বিসিবি নিজস্ব তহবিল থেকে প্রতিটি দলকে আড়াই কোটি টাকা করে অনুদান দিচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ ছয়টি দলের জন্য বিসিবির অনুদান দাঁড়ায় ১৫ কোটি টাকা। ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর কাছ থেকে ফি হিসেবে আসার কথা আরও ১৫ কোটি টাকা। তবে এই দুই অঙ্কের হিসাবই টুর্নামেন্টের প্রকৃত আয়-ব্যয়ের পূর্ণ চিত্র নয়। মাঠ, সম্প্রচার, আয়োজন, স্পনসরশিপ এবং অন্যান্য ব্যয় ও আয় হিসাব করলেই বোঝা যাবে, শেষ পর্যন্ত বোর্ডের আর্থিক অবস্থান কোথায় দাঁড়ায়।
বিসিবির নতুন কমিটি দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যয় বৃদ্ধি এবং নতুন রাজস্ব উৎস তৈরির সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এর মধ্যে ঘরোয়া ক্রিকেটারদের ম্যাচ ফি প্রায় তিন গুণ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক বৃদ্ধি ইতিবাচক হলেও, এর বিপরীতে রাজস্ব কতটা বাড়ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম ধনী বোর্ড বিসিসিআইয়ের রঞ্জি ট্রফির ম্যাচ ফির সঙ্গে বিসিবির ঘরোয়া ক্রিকেটের ব্যয়ের তুলনা সামনে আসছে। তবে দুই বোর্ডের আয়, বাণিজ্যিক কাঠামো ও টুর্নামেন্টের আর্থিক মডেল বিবেচনায় নিয়েই এমন তুলনার যথার্থতা নির্ধারণ করতে হবে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি প্লেয়ার্স ড্রাফটের পয়েন্ট সিস্টেম। ড্রাফটের সময় ঘনিয়ে এলেও খেলোয়াড় নির্বাচন কীভাবে হবে, কোন খেলোয়াড় কত পয়েন্ট পাবেন এবং সেই পয়েন্টের ভিত্তিতে দল গঠনের নিয়ম কী, তা নিয়ে স্পষ্টতা নেই বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিষয়টি জানতে টুর্নামেন্ট কমিটির চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি পদ্ধতিটিকে জটিল বলে স্বীকার করেন এবং ক্রিকেট অপারেশনস ম্যানেজার শাহরিয়ার নাফিসের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। তবে প্রতিবেদন প্রকাশের আগে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
একটি বড় টুর্নামেন্টের ড্রাফট পদ্ধতি যদি খেলোয়াড়, ফ্র্যাঞ্চাইজি এবং গণমাধ্যমের কাছে পরিষ্কার না হয়, তাহলে স্বচ্ছতা ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
এদিকে সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রির ক্ষেত্রেও আইসিসির সহায়তা চেয়েছে বিসিবি। বাংলাদেশের ক্রিকেটের সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রির জন্য আইসিসি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই তালিকায় আফগানিস্তান ও নেপালের মতো দেশের নাম থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ক্রিকেটের বাণিজ্যিক অবস্থান নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে।
এই বাস্তবতায় ডি থ্রি কি ঘরোয়া ক্রিকেটের জন্য নতুন আয়ের পথ খুলবে, নাকি বোর্ডের ব্যয় সামলানোর আরেকটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে?
ফ্র্যাঞ্চাইজি বণ্টনের স্বচ্ছতা, পয়েন্ট সিস্টেমের স্পষ্ট ব্যাখ্যা এবং টুর্নামেন্টের পূর্ণাঙ্গ আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ করা গেলে এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া সহজ হবে।
শেষ পর্যন্ত এই আয়োজনের সাফল্য নির্ধারণ করবে শুধু মাঠের খেলা নয়, আর্থিক জবাবদিহি এবং বাণিজ্যিক কার্যকারিতাও। আর সেই হিসাবের ভার কার কাঁধে পড়বে—ক্রিকেটারদের, নাকি ক্রিকেট বোর্ডের?
—জা. অর্থনীতি/এলএটি