Print Date & Time : 25 October 2026 Sunday 02:59 am

ভারত থেকে আমদানি করা ১৩৫ টন চালে আফলাটক্সিন

image

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম: ভারত থেকে আমদানি করা সিদ্ধ চালে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে এমন বিষাক্ত উপাদান আফলাটক্সিন শনাক্ত হয়েছে। চট্টগ্রামের হালিশহর কেন্দ্রীয় খাদ্যগুদামে (সিএসডি) সংরক্ষিত ১৩৫ টন চালে এই উপাদান পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। 

আমদানির পর প্রাথমিক পরীক্ষায় চালগুলো মানুষের খাওয়ার উপযোগী বলে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী পরীক্ষায় বিষাক্ত উপাদানের উপস্থিতির তথ্য পাওয়ার পর ওই চালানের প্রায় ৯ হাজার ৫০০ টন চাল বিতরণ বন্ধ রেখেছে খাদ্য বিভাগ। চালের মান নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে নতুন করে পরীক্ষা শুরু হলেও শনাক্ত হওয়া উপাদানের সুনির্দিষ্ট পরিচয়, ঘনত্ব এবং স্বাস্থ্যঝুঁকির মাত্রা সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন এখনও প্রকাশ করা হয়নি।

জানা যায়, সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান অ্যাগ্রোকর্প ইন্টারন্যাশনাল আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রে ৫০ হাজার টন চাল আমদানির কার্যাদেশ পেয়েছিল। ওই চুক্তির আওতায় প্রতি টন ৩৫৩ দশমিক ১১ ডলার দরে চালগুলো আমদানি করা হয়। গত ২১ জুলাই এমভি এইচটি পাইওনিয়ার জাহাজটি চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছায়। এটি ছিল ওই চুক্তির আওতায় শেষ চালান। চাল খালাসের পর এর একটি অংশ চট্টগ্রামের হালিশহর ও দেওয়ানহাট, ঢাকার তেজগাঁও এবং গাজীপুরের জয়দেবপুরের সরকারি খাদ্যগুদামে পাঠানো হয়। তবে পরবর্তী সময়ে চালের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় পুরো চালানের বিতরণ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

প্রথম পরীক্ষায় ছাড়পত্র, পরে বিষাক্ত উপাদান শনাক্ত
জাহাজটি চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছানোর পরদিন ২২ জুলাই খাদ্য অধিদপ্তরের পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধিদলের উপস্থিতিতে চালের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়। প্রাথমিক পরীক্ষার প্রতিবেদনে চালগুলো মানুষের খাওয়ার উপযোগী বলে উল্লেখ করা হয়। এরপর ২৪ ও ২৫ জুলাই চাল খালাস করা হয়। কিন্তু পরে চালের মান নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা চালের মান অত্যন্ত নিম্ন বলে মন্তব্য করেন। কেউ কেউ এ চাল প্রায় খাওয়ার অনুপযোগী বলেও উল্লেখ করেন। বিষয়টি খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব ও খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে জানানো হয়। মান নিয়ে উদ্বেগের কারণে পরিবহন ঠিকাদাররাও চালের সরবরাহ বন্ধ রাখেন। এরপর চালের নিরাপত্তা যাচাইয়ে নতুন করে পরীক্ষার উদ্যোগ নেয় খাদ্য অধিদপ্তর। মহাপরিচালক জসীম উদ্দিন খানের নির্দেশে পরীক্ষার ফলাফল না পাওয়া পর্যন্ত প্রায় ৯ হাজার ৫০০ টন চালের বিতরণ বন্ধ রাখা হয়।

গত ১৭ আগস্ট বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) গাজীপুরের দুই সদস্যের একটি দল চট্টগ্রামে এসে হালিশহর ও দেওয়ানহাট খাদ্যগুদামের বিভিন্ন স্তূপ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে। দলের নেতৃত্ব দেন ব্রির শস্যমান ও পুষ্টি বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শরিফা সুলতানা দিপ্তী।

হালিশহর সিএসডির ব্যবস্থাপক মাহমুদ হাসান জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, খাদ্য অধিদপ্তরের প্রতিনিধিরা সংশ্লিষ্ট চালের চালান থেকে দুই দফা পরীক্ষা করেছেন। ওই চালের চালান থেকে বিতরণ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে পরীক্ষার ফলাফল এখনও গুদামে পৌঁছায়নি।

চট্টগ্রাম খাদ্য বিভাগের মুভমেন্ট অ্যান্ড স্টোরেজ বিভাগের নিয়ন্ত্রক রেজওয়ান সাকিব বলেন, চালের মধ্যে বিষাক্ত উপাদান শনাক্ত হওয়ার বিষয়ে তিনি অবগত হয়েছেন। বিষয়টি আরও পরীক্ষা করে দেখতে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। আপাতত ওই চালানের চাল বিতরণ বন্ধ রয়েছে।

স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ
আফলাটক্সিন একধরনের বিষাক্ত যৌগ, যা অ্যাসপারজিলাস প্রজাতির কিছু ছত্রাক থেকে তৈরি হয়। দূষিত খাদ্যের মাধ্যমে দীর্ঘদিন এই উপাদান শরীরে প্রবেশ করলে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এর মধ্যে লিভার ক্যানসারের ঝুঁকিও রয়েছে।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের শস্যমান ও পুষ্টি বিভাগের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ আলী বলেন, চাল ও বাদামসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্যে আফলাটক্সিনের উপস্থিতি গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এর ফলে ক্যানসারও হতে পারে।

তবে সংশ্লিষ্ট চালের নমুনায় শনাক্ত হওয়া উপাদানটির পরিচয় ও পরিমাণ সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষার প্রতিবেদন ছাড়া ঝুঁকির মাত্রা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। চালটি মানুষের খাওয়ার জন্য কতটা অনিরাপদ, তা জানতে পরীক্ষাগারের চূড়ান্ত ফলাফল প্রয়োজন।

মান নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন
আমদানির পর প্রাথমিক পরীক্ষায় খাওয়ার উপযোগী ঘোষিত চালের পরবর্তী পরীক্ষায় বিষাক্ত উপাদান শনাক্ত হওয়ার ঘটনায় খাদ্যমান নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রথম পরীক্ষায় কী কী বিষয় যাচাই করা হয়েছিল, আফলাটক্সিন শনাক্তের পরীক্ষা করা হয়েছিল কি না এবং পরবর্তী পরীক্ষায় ভিন্ন ফল আসার কারণ কী, তা স্পষ্ট নয়।

হালিশহর গুদামে সংরক্ষিত ১৩৫ টন চালের বাইরে একই চালানের অন্য গুদামে পাঠানো চালের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। সেসব চাল নতুন করে পরীক্ষা করা হবে কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা স্পষ্ট করেননি।

শনাক্ত হওয়া চাল আলাদা করে সংরক্ষণ, গুদাম থেকে সরিয়ে নেওয়া কিংবা ধ্বংস করার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তও জানা যায়নি। একইভাবে প্রাথমিক পরীক্ষায় চালের মান যাচাইয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হবে কি না, সে বিষয়েও খাদ্য বিভাগের পক্ষ থেকে কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।

প্রায় ৯ হাজার ৫০০ টন চালের বিতরণ বন্ধ থাকায় এখন মূল প্রশ্ন, পুরো চালানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কী ধরনের পরীক্ষা করা হবে এবং পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে চালের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেবে খাদ্য বিভাগ।