Print Date & Time : 25 October 2026 Sunday 04:19 am

কিউআর কোড বদলে দিচ্ছে ওয়ালেটের চিত্র

image

সাইদুর রহমান নোমান, ঢাকা: সুইডেনের একটি ছোট ক্যাফের কথা ভাবুন। সকালে কফি কিনতে এসে ক্রেতা পকেট থেকে মানিব্যাগ (ওয়ালেট) বের করলেন না, কাউন্টারে খুচরা টাকাও গুনলেন না। একটি কিউআর কোডে স্ক্যান করেই পরিশোধ করলেন কফির দাম। দৈনন্দিন জীবনের এমন বেশিরভাগ লেনদেন এভাবেই করছেন দেশটির বাসিন্দারা। তারা এভাবে ডিজিটাল পেমেন্টে অভ্যস্ত। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিক্সব্যাংকের ২০২৫ সালের জরিপে দেখা যায়, ৯১ শতাংশ উত্তরদাতা ‘সুইশ’ নামক ডিজিটাল পেমেন্ট অ্যাপ ব্যবহার করছেন। ২০২৫ সালে দোকানে সর্বশেষ কেনাকাটার সময় নগদ অর্থে মূল্য পরিশোধ করেছেন মাত্র ৫ শতাংশ। 

এখন সুইডেনের মতো বাংলাদেশেও এভাবে ডিজিটাল পেমেন্ট করতে পারবেন। সুইডেনের সুইশ অ্যাপের মতো বাংলাদেশে বাংলা কিউআর চালু করা হয়েছে। বাংলাদেশের কোনো এক দোকান থেকে কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় কিছু পণ্য কিনলেন। পণ্যর মূল্য পরিশোধের সময় নগদ টাকা না থাকলেও চলবে। মূল্য পরিশোধের জন্য আপনার ব্যাংক বা এমএফএস একাউন্টে টাকা থাকলেই হবে। দোকানে থাকা বাংলা কিউআরে এক স্ক্যানেই পণ্যর দাম পরিশোধ করতে পারবেন। কোনো খরচ ছাড়াই এই লেনদেন করা যায়। এভাবে নগদ টাকার বদলে বাংলা কিউআরের ব্যবহার বাড়ায় বদলে যাচ্ছে লেনদেনের পদ্ধতি। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুনের শেষ দিকে বাংলা কিউআর-এ দৈনিক লেনদেনের সংখ্যা ছিল এক লাখের কিছু বেশি। কয়েক মাসের ব্যবধানে তা বেড়ে কয়েকগুণ হয়েছে। গত ৬ থেকে ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক সপ্তাহে বাংলা কিউআর-এ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার লেনদেন হয়েছে। এসব লেনদেনে দৈনিক গড় অর্থের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৫১ কোটি টাকা। অর্থাৎ বাংলা কিউআর-এ শুধু লেনদেনের সংখ্যাই বাড়েনি, বেড়েছে এর মাধ্যমে আদান-প্রদান হওয়া অর্থের পরিমাণও।

নিউমার্কেটের মুদি দোকানদার রাজ্জাক মিয়া জানান, আগে বেশিরভাগ ক্রেতা নগদ টাকা দিয়ে পণ্য কিনতেন। এখন অনেকেই মোবাইল ফোনে কিউআর কোড স্ক্যান করে দাম পরিশোধ করেন। এতে টাকা খুচরা করার ঝামেলা কমে, লেনদেনও সহজ হয়। তবে সব ক্রেতা এখনও কিউআর ব্যবহার করেন না। 

বাংলা কিউআরে লেনদেন করে পণ্য ক্রয় করা সাদ্দাম হাসান বলেন, এখন কেনাকাটা করতে এসে সব সময় নগদ টাকা সঙ্গে রাখার প্রয়োজন হয় না। অনেক দোকানে বাংলা কিউআর কোড থাকায় মোবাইল ফোন দিয়েই পণ্যের দাম পরিশোধ করা যায়। আগে অনেক সময় খুচরা টাকা নিয়ে ঝামেলায় পড়তে হতো, এখন সেই সমস্যাও কিছুটা কমেছে। কিউআর কোড স্ক্যান করে টাকার পরিমাণ লিখে পেমেন্ট করলেই হচ্ছে। এতে সময়ও কম লাগে, লেনদেন করাও সহজ হয়। তবে সব দোকানে এখনও এই সুবিধা পাওয়া যায় না। আরও বেশি দোকানে বাংলা কিউআর চালু হলে কেনাকাটার সময় ক্রেতাদের সুবিধা বাড়বে। পেমেন্ট করার আগে অবশ্যই টাকার পরিমাণ ও প্রাপকের তথ্য মিলিয়ে নেওয়া উচিত।

লেনদেন বেড়েছে পাঁচগুণ, দৈনিক অঙ্ক ১৫১ কোটি টাকা
একটি ছোট্ট কোড স্ক্যান করেই পণ্যের দাম পরিশোধ করা যায়। অথচ এই সহজ পদ্ধতিতে লেনদেনের পরিমাণ যে কয়েক মাসের ব্যবধানে এতটা বাড়তে পারে, তার চিত্র উঠে এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে। জুনের শেষ সপ্তাহে বাংলা কিউআরে দৈনিক গড় লেনদেনের অর্থমূল্য ছিল ২৮ কোটি টাকার কিছু বেশি। কয়েক মাসের ব্যবধানে তা বেড়ে সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে ১৫০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। অর্থাৎ এ সময়ে দৈনিক গড় লেনদেনের অর্থমূল্য পাঁচগুণেরও বেশি হয়েছে। লেনদেনের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি প্রতিটি লেনদেনে অর্থের পরিমাণও বেড়েছে। ফলে বাংলা কিউআর এখন কেবল ছোট অঙ্কের কেনাকাটার একটি মাধ্যম হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকছে না; এর মাধ্যমে তুলনামূলক বড় অঙ্কের লেনদেনও হচ্ছে।

সপ্তাহভিত্তিক পরিসংখ্যানেও এই পরিবর্তনের চিত্র স্পষ্ট। ২৮ জুন থেকে ৪ জুলাই পর্যন্ত এক সপ্তাহে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে প্রায় ১২ লাখ ৪০ হাজার লেনদেন হয়েছিল। এসব লেনদেনের মোট অর্থমূল্য ছিল প্রায় ২৬০ কোটি টাকা। অর্থাৎ ওই সপ্তাহে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ লাখ ৭৭ হাজার লেনদেন হয়েছে। মোট অর্থের হিসাবে দৈনিক গড় লেনদেনের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৭ কোটি টাকা।

এর পর জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহ ও আগস্টের শুরুতে লেনদেনের পরিমাণ আরও বাড়ে। ২৬ জুলাই থেকে ১ আগস্ট পর্যন্ত এক সপ্তাহে বাংলা কিউআরে প্রায় ১৬ লাখ লেনদেন হয়। এসব লেনদেনের মোট অর্থমূল্য ছিল প্রায় ৪১০ কোটি টাকা। আগের হিসাবের তুলনায় লেনদেনের সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে অর্থের পরিমাণও। অর্থাৎ কিউআরভিত্তিক পেমেন্টের ব্যবহার ধীরে ধীরে আরও বিস্তৃত হচ্ছিল।

আগস্টের শেষ দিকে এসে এই প্রবৃদ্ধির গতি আরও বাড়ে। ২৩ থেকে ২৯ আগস্ট পর্যন্ত এক সপ্তাহে বাংলা কিউআরে লেনদেনের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২৩ লাখ ৩০ হাজারে। এ সময়ে মোট লেনদেনের অর্থমূল্য ছিল প্রায় ৮৫০ কোটি টাকা। মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগের তুলনায় লেনদেনের সংখ্যা ও অর্থমূল্য— দুই ক্ষেত্রেই বড় পরিবর্তন দেখা যায়।

এর পরের সপ্তাহেও লেনদেনের পরিমাণ বাড়ে। ৩০ আগস্ট থেকে ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলা কিউআরে প্রায় ২৪ লাখ ৩০ হাজার লেনদেন হয়। এসব লেনদেনের মোট অর্থমূল্য ছিল প্রায় ৯৬০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক সপ্তাহে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি লেনদেন হয়েছে এই ব্যবস্থায়।

সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে এসে লেনদেন কিছুটা কমে। ৬ থেকে ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক সপ্তাহে বাংলা কিউআরে প্রায় ২৩ লাখ ৪০ হাজার লেনদেন হয়। আগের সপ্তাহের তুলনায় লেনদেনের সংখ্যা কিছুটা কমলেও মোট অর্থমূল্য বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার ৫৭ কোটি টাকায়। অর্থাৎ লেনদেনের সংখ্যা সামান্য কমলেও এর মাধ্যমে আদান-প্রদান হওয়া অর্থের পরিমাণ বেড়েছে।

এই পরিসংখ্যানের বিশ্লেষণে দেখা যায়, একটি লেনদেনে গড়ে কত টাকা আদান-প্রদান হচ্ছে। জুনের শেষ সপ্তাহে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে প্রতিটি লেনদেনে গড়ে প্রায় ২ হাজার ১০০ টাকা ছিল। সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে তা বেড়ে প্রায় ৪ হাজার ৫৩০ টাকায় দাঁড়ায়। কয়েক মাসের ব্যবধানে একটি লেনদেনের গড় অর্থমূল্য দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে।

বড় দোকান ছাড়িয়ে ছোট ব্যবসায়ও ছড়াচ্ছে বাংলা কিউআর
বাংলা কিউআরের ব্যবহার বাড়ার পাশাপাশি বাড়ছে এর সঙ্গে যুক্ত মার্চেন্টের সংখ্যাও। এপ্রিলের শুরুতে বাংলা কিউআর মার্চেন্টের সংখ্যা ছিল প্রায় ১১ লাখ ৯০ হাজার। মে মাসে তা বেড়ে হয় প্রায় ১২ লাখ ৭০ হাজার এবং জুনে প্রায় ১৩ লাখ ৬০ হাজার। জুলাইয়ের শুরুতে এই সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১৬ লাখ ৫০ হাজারে।

এর পর মার্চেন্টের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। ১ সেপ্টেম্বর বাংলা কিউআর মার্চেন্টের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩৩ লাখ ৩০ হাজার। ১৯ সেপ্টেম্বর তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩৭ লাখ ৫০ হাজারে। এপ্রিলের শুরু থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ২৫ লাখ ৬০ হাজার মার্চেন্ট যুক্ত হয়েছে এই ব্যবস্থায়। শুধু সেপ্টেম্বরের প্রথম ১৯ দিনেই নতুন করে যুক্ত হয়েছে ৪ লাখ ২০ হাজারের বেশি মার্চেন্ট।

এই বিস্তার শুধু বড় বিপণিবিতান বা সুপারশপে সীমাবদ্ধ নয়। ছোট দোকান ও ক্ষুদ্র ব্যবসাতেও বাড়ছে কিউআর পেমেন্টের ব্যবহার। ফলে ব্যবসায়ীরা নগদ টাকার পাশাপাশি ডিজিটাল মাধ্যমে মূল্য গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছেন। 

আজিমপুরের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আব্দুল কাদের বলেন, আমার ছোট দোকানে প্রতিদিন অনেক ক্রেতা আসেন। আগে সবাই নগদ টাকা দিয়ে কেনাকাটা করতেন। এখন অনেকে মোবাইল ফোনে কিউআর কোড স্ক্যান করে দাম পরিশোধ করেন। এতে ক্রেতাদের সুবিধা হচ্ছে, আমারও নগদ টাকা সামলানোর ঝামেলা কিছুটা কমছে। বিশেষ করে খুচরা টাকা না থাকলে যে সমস্যা হতো, সেটি এড়ানো যায়। তবে সব ক্রেতা এখনও কিউআরে পেমেন্ট করেন না। ধীরে ধীরে এই ব্যবস্থা আরও চালু হলে আমাদের মতো ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য লেনদেন করা সহজ হবে।

বাংলা কিউআরের ব্যবহার আরও বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংকও বিভিন্ন নির্দেশনা দিয়েছে। এর লক্ষ্য হলো, মার্চেন্টের জন্য লেনদেন সহজ করা এবং গ্রাহকদের কাছে এই পেমেন্ট পদ্ধতিকে আরও সহজলভ্য করে তোলা।

তৎক্ষণিকভাবে টাকা পাবেন ব্যবসায়ীরা
বাংলা কিউআরের ব্যবহার সহজ করতে নতুন নিয়ম চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্টের (পিএসডি) সার্কুলার নম্বর ০৫-এর মাধ্যমে এ বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়। নির্দেশনা অনুযায়ী, ১ অক্টোবর থেকে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে সফল লেনদেনের অর্থ মার্চেন্টের ব্যবসায়িক হিসাবে তাৎক্ষণিকভাবে জমা দেওয়ার ব্যবস্থা কার্যকর হয়েছে। ফলে ক্রেতা পেমেন্ট করার পর ব্যবসায়ীদের অর্থ পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হবে না।

বাংলা কিউআর ব্যবহার আরও সহজ করতে ব্যাংক, মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) ও পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডারদের (পিএসপি) মোবাইল অ্যাপের হোম পেজে সহজে চোখে পড়ে এমন স্থানে বাংলা কিউআরের আইকন রাখার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পাশাপাশি ব্যাংকের সঞ্চয়ী ও চলতি হিসাবের গ্রাহকরাও যেন নিজ নিজ অ্যাপ ব্যবহার করে বাংলা কিউআর স্ক্যান করে পেমেন্ট করতে পারেন, সে ব্যবস্থাও রাখতে বলা হয়েছে।

বাংলা কিউআরে লেনদেনে কমল ফি, রয়েছে প্রণোদনা
বাংলা কিউআরের ব্যবহার বাড়াতে লেনদেনের ফি কাঠামোতেও পরিবর্তন এনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ধরা যাক, একটি দোকান থেকে ৫০০ টাকার পণ্য কিনে বাংলা কিউআরে দাম পরিশোধ করলেন এক ক্রেতা। এই লেনদেনে আইআরএফ শূন্য হওয়ায় এ খাতে ফি দিতে হবে না। পাশাপাশি, নির্ধারিত শর্ত পূরণ হলে গ্রাহকের পেমেন্টের উৎস প্রতিষ্ঠান বা ইস্যুয়ার ১ টাকা এবং দোকানির পক্ষে পেমেন্ট গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান বা অ্যাকোয়ারার ৫০ পয়সা প্রণোদনা পেতে পারে। এভাবে ফি কমানো ও প্রণোদনার মাধ্যমে বাংলা কিউআরের ব্যবহার বাড়াতে চায় বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, ১ অক্টোবর থেকে বাংলা কিউআর লেনদেনে ইন্টারচেঞ্জ রিইম্বার্সমেন্ট ফি (আইআরএফ) শূন্য করা হয়েছে। ফলে এই ফি বাবদ সংশ্লিষ্ট সেবাদাতাদের মধ্যে অর্থ আদান-প্রদানের প্রয়োজন থাকছে না।

একইসঙ্গে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে লেনদেনে ব্যাংক ও অন্যান্য সেবাদাতাকে উৎসাহিত করতে প্রণোদনার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। নির্দেশনা অনুযায়ী, ২ হাজার টাকা পর্যন্ত সফল লেনদেনের ক্ষেত্রে ইস্যুয়ারের জন্য শূন্য দশমিক ২০ শতাংশ এবং অ্যাকোয়ারারের জন্য শূন্য দশমিক ১০ শতাংশ হারে মাসিক প্রণোদনার কথা বলা হয়েছে।