Print Date & Time : 25 October 2026 Sunday 01:50 am

বিপুল প্রণোদনা ও কর ছাড়েও কাটছে না পোশাকনির্ভরতা

image

সাইদুর রহমান নোমান, ঢাকা: রপ্তানি খাতকে উৎসাহিত করতে প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকা নগদ প্রণোদনা দিচ্ছে সরকার। পাশাপাশি রপ্তানিকারকরা পাচ্ছেন আয়কর ছাড়সহ নানা সুবিধা। কিন্তু বিপুল সরকারি সহায়তার পরও রপ্তানি আয়ে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী প্রবৃদ্ধি যেমন আসেনি, তেমনি রপ্তানি পণ্যে কাঙ্ক্ষিত বৈচিত্র্যও তৈরি হয়নি।

দীর্ঘদিন ধরেই দেশের রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি তৈরি পোশাক খাতের দখলে। তাতেও আবার টি-শার্ট, ট্রাউজার, জার্সি ও পুলওভারের মতো কয়েকটি পণ্যের প্রাধান্য। কিন্তু সম্ভাবনাময় পোশাক-বহির্ভূত খাতগুলো শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারছে না। ফলে রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনার জন্য বছরের পর বছর ধরে দেওয়া সরকারি প্রণোদনা ও কর-সুবিধার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে রপ্তানি খাতে নগদ প্রণোদনা বাবদ সরকার ব্যয় করেছিল ৮ হাজার ৬৮৯ কোটি ৩১ লাখ টাকা। পরের অর্থবছরে তা ৮ হাজার ১৯৮ কোটি ৪৫ লাখ টাকায় নামে। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রণোদনা বেড়ে ৮ হাজার ৪৯৯ কোটি ৯৬ লাখ টাকায় দাঁড়ায়। অর্থাৎ তিন অর্থবছরে রপ্তানিকারকদের নগদ প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে মোট ২৫ হাজার ৩৮৭ কোটি ৭২ লাখ টাকা।

তবে এই তিন অর্থবছরে পর্যায়ক্রমে কমছে প্রণোদনার হার। ২০২২-২৩ অর্থবছরে বিভিন্ন খাতে এ সহায়তার হার ছিল ১ থেকে ২০ শতাংশ। পরের অর্থবছরে তা কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ থেকে ১৫ শতাংশে নামানো হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের এ হার আরও কমিয়ে শূন্য দশমিক ৩ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে নির্ধারণ করা হয়।

কর ছাড়েও হাজার কোটি টাকা
নগদ প্রণোদনার পাশাপাশি রপ্তানিকারকরা আয়কর ছাড়ের সুবিধাও পেয়েছেন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল ও সংশ্লিষ্ট খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো ৩ হাজার ৪৩৮ কোটি টাকার কর-সুবিধা পেয়েছিল। পোশাক-বহির্ভূত অন্যান্য রপ্তানি খাত পেয়েছিল ১ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে ওই অর্থবছরে কর-সুবিধার পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ১০২ কোটি টাকা।

পরের অর্থবছর ২০২১-২২ সালে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল ও সংশ্লিষ্ট খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর কর-সুবিধা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ৬৪৬ কোটি টাকায়। অন্য রপ্তানি খাতগুলো পায় ১ হাজার ৯১০ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে কর-সুবিধার পরিমাণ দাঁড়ায় ৬ হাজার ৫৫৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এ সুবিধা বেড়েছিল প্রায় ২৮ দশমিক ৫ শতাংশ।

এ হিসাবে দুই অর্থবছরে রপ্তানি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো মোট ১১ হাজার ৬৫৮ কোটি টাকার কর-সুবিধা পেয়েছে। এর মধ্যে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল ও সংশ্লিষ্ট খাত পেয়েছে ৮ হাজার ৮৪ কোটি টাকা। অন্য রপ্তানি খাতগুলো পেয়েছে ৩ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা।

রপ্তানি আয়ে তৈরি পোশাকের প্রাধান্য
দেশের পণ্য রপ্তানি আয়ে তৈরি পোশাক খাতের প্রাধান্য দীর্ঘদিনের। ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশের পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছিল ৪ হাজার ৬৪৩ কোটি ১০ লাখ ডলার। পরের অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ৪ হাজার ৪৪৭ কোটি ডলারে। তবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রপ্তানি আয় বেড়ে ৪ হাজার ৮২৮ কোটি ৩০ লাখ ডলারে পৌঁছায়।

তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে মোট পণ্য রপ্তানি আয়ের ৮২ দশমিক ১৫ শতাংশ এসেছিল তৈরি পোশাক থেকে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ হার কিছুটা কমে ৮১ দশমিক ২৯ শতাংশে দাঁড়ায়। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা সামান্য বেড়ে হয় ৮১ দশমিক ৪৯ শতাংশ।

অর্থাৎ তিন অর্থবছরে মোট পণ্য রপ্তানি আয়ে তৈরি পোশাকের অংশ সামান্য কমলেও নির্ভরতার চিত্রে বড় পরিবর্তন আসেনি। এখনও দেশের মোট পণ্য রপ্তানি আয়ের প্রতি ১০০ ডলারের ৮১ ডলারের বেশি আসছে তৈরি পোশাক থেকে। বিপরীতে পোশাক-বহির্ভূত সব খাত মিলিয়ে অবদান ১৯ শতাংশেরও কম।

এ পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, তৈরি পোশাকের বাইরে অন্যান্য পণ্যের রপ্তানি বাড়লেও সামগ্রিক রপ্তানি কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আসেনি। আন্তর্জাতিক বাজারে তৈরি পোশাকের চাহিদা কমে যাওয়া, মূল্য প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি কিংবা বাণিজ্যিক সুবিধা সংকুচিত হলে দেশের সামগ্রিক রপ্তানি আয় ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ফাহমিদা খাতুন জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, রপ্তানি খাতে নগদ প্রণোদনা ও কর-সুবিধা কিছু প্রতিষ্ঠানকে সহায়তা দিলেও শুধু অর্থ দেওয়াই রপ্তানি বাড়ানোর নিশ্চয়তা নয়। সহায়তার বিপরীতে উৎপাদনশীলতা, নতুন বাজারে প্রবেশ, পণ্যের বৈচিত্র্য ও কর্মসংস্থানের কী উন্নতি হয়েছে, তার নিয়মিত মূল্যায়ন দরকার। লক্ষ্যভিত্তিক ফল না থাকলে একই সুবিধা দীর্ঘদিন চালিয়ে যাওয়ার যৌক্তিকতা থাকে না।

তিনি আরও বলেন, রপ্তানি আয় ওঠানামার পেছনে বৈশ্বিক চাহিদা, জ্বালানি ও ঋণব্যয়, সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা এবং নীতির অনিশ্চয়তাও কাজ করে।

টি-শার্ট, ট্রাউজার, জার্সি ও পুলওভারের আধিপত্য
দেশের মোট পণ্য রপ্তানিতে তৈরি পোশাকের প্রাধান্যের পাশাপাশি এ খাতের মধ্যেও কয়েকটি পণ্যের ওপর নির্ভরতা বেশি। বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হওয়া তৈরি পোশাকপণ্যের মধ্যে টি-শার্ট, ট্রাউজার, জার্সি ও পুলওভারের মতো কয়েকটি পণ্যের আধিপত্য রয়েছে।

প্রতিবেদনের জন্য সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে রপ্তানি করা মোট পোশাকের ৫৫ দশমিক ৭ শতাংশ ছিল এসব পণ্য। পরের অর্থবছরগুলোতে এ হার ধারাবাহিকভাবে কমে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৫৩ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে আসে।

অর্থাৎ কয়েক বছরে প্রধান পোশাক পণ্যগুলোর অংশ কিছুটা কমলেও তৈরি পোশাক রপ্তানিতে এসব পণ্যের প্রাধান্য রয়ে গেছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে এসব পণ্যের চাহিদা কমে গেলে বা প্রতিযোগিতা বেড়ে গেলে রপ্তানি আয় ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, রপ্তানি আয়ের টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি অন্যান্য পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে পোশাক খাতের মধ্যেও উচ্চমূল্যের ও বৈচিত্র্যময় পণ্যের উৎপাদন বাড়ানো প্রয়োজন।

পোশাক-বহির্ভূত খাতের অবস্থান দুর্বল
তৈরি পোশাকের বাইরে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, ফুটওয়্যার, সিরামিক, প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য, ওষুধ এবং হালকা প্রকৌশল পণ্যের সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের (বিএফটিআই) এক উপস্থাপনায় এসব খাতের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরা হয়েছে।

বিএফটিআইয়ের উপস্থাপনায় বলা হয়, এসব খাতের বিকাশে প্রযুক্তির আধুনিকায়ন, শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধি, পণ্যের মান নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক সনদ অর্জন এবং উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় কমানো গুরুত্বপূর্ণ। শুধু নগদ প্রণোদনা নয়, এসব সক্ষমতা তৈরিতে সরকারি সহায়তা কতটা কাজে লাগছে, সেটিও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

এ বিষয়ে ফাহমিদা খাতুন বলেন, পোশাক রপ্তানিতে দীর্ঘদিনের সাফল্য ও তৈরি অবকাঠামোর কারণে বিনিয়োগ এই খাতেই কেন্দ্রীভূত হয়েছে। অন্যদিকে পণ্য উন্নয়ন, দক্ষতা, মানসনদ, গবেষণা, নকশা এবং বাজারসংযোগে প্রয়োজনীয় সহায়তা অপর্যাপ্ত।

তিনি বলেন, নীতির দুর্বলতা হলো, প্রণোদনা দেওয়া হলেও নতুন পণ্য ও বাজার তৈরির জন্য সমন্বিত, সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা এবং জবাবদিহি নেই।

এলডিসি উত্তরণে সহায়তার ধরন বদলানোর প্রশ্ন
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতির মধ্যে বাংলাদেশের রপ্তানি সহায়তার কাঠামো নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। বিএফটিআইয়ের এক উপস্থাপনায় বলা হয়েছে, উত্তরণের পর কিছু বিশেষ বাণিজ্যিক সুবিধা ও নীতিগত নমনীয়তা কমে যেতে পারে। পাশাপাশি রপ্তানির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত কিছু ভর্তুকির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যবিধির সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে সরাসরি নগদ প্রণোদনার পাশাপাশি উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগকে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শ্রমিকদের কারিগরি দক্ষতা উন্নয়ন, কারখানার যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তির আধুনিকায়ন, মান নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণ এবং পণ্য পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়ন।

একই সঙ্গে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বাইরে এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে প্রবেশের উদ্যোগ জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ফাহমিদা খাতুন বলেন, এলডিসি উত্তরণের পর প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে নগদ সহায়তার বদলে বন্দর ও কাস্টমসের দক্ষতা, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ-জ্বালানি, সহজ বাণিজ্য অর্থায়ন, দক্ষ জনবল, প্রযুক্তি গ্রহণ, গবেষণা ও মানসনদে বিনিয়োগ জরুরি।

তিনি বলেন, পোশাকবহির্ভূত খাত, যেমন: ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য, কৃষি-প্রক্রিয়াজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল ও তথ্যপ্রযুক্তির জন্য পৃথক উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রয়োজন। সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রযুক্তি উন্নয়ন, পরীক্ষাগার ও আন্তর্জাতিক মান পূরণে সহায়তা দিতে হবে।

ফাহমিদা খাতুনের মতে, বাণিজ্য চুক্তি, দূতাবাসের মাধ্যমে বাজার তথ্য সরবরাহ, বিদেশে প্রদর্শনী আয়োজন এবং রপ্তানি ঋণ-গ্যারান্টির মাধ্যমে নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। একই সঙ্গে নগদ সহায়তা পর্যায়ক্রমে কমিয়ে রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।