Print Date & Time : 23 October 2026 Friday 08:31 pm

বাংলাদেশে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের চাহিদা বাড়ছে, পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকে এখনো আস্থার চ্যালেঞ্জ

image

মো. খায়রুল হাসান

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেশে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের চাহিদা বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। তবে প্রবৃদ্ধির চিত্র সব প্রতিষ্ঠানে এক নয়। ২০২৬ সালের আগস্টে প্রচলিত ব্যাংকগুলোর ইসলামী শাখা ও উইন্ডোতে আমানত আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় যথাক্রমে ৩২.৫৩ ও ২৮.১৩ শতাংশ বেড়েছে। বিপরীতে, পূর্ণাঙ্গ ইসলামী  ব্যাংকগুলোর আমানত কমেছে ১.৬৯ শতাংশ এই বৈপরীত্যের অর্থ হলো, শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের সামগ্রিক চাহিদা বেড়েছে, কিন্তু নির্দিষ্ট কিছু ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকের আস্থা এখনো পুরোদমে ফিরেনি। এজন্য পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোকে আমানতের পাশাপাশি তাদের আর্থিক সক্ষমতা, সুশাসন, বিনিয়োগের মান, শরিয়াহ পরিপালন ও গ্রাহকসেবার দিকে নজর দিতে হবে।

আমানতের পরিসংখ্যানে দুই ধরনের প্রবণতা

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্ট শেষে ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকের আমানত দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৯২ হাজার ৫০ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের আগস্টে তা ছিল ৩ লাখ ৯৮ হাজার ৭৮৭ কোটি টাকা। এক বছরে আমানত কমেছে ৬ হাজার ৭৩৭ কোটি টাকা বা ১.৬৯ শতাংশ। তবে জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে আমানত বেড়েছে ৩ হাজার ৫০৮ কোটি টাকা বা ০.৯০ শতাংশ।

অন্যদিকে, প্রচলিত ব্যাংকগুলোর ইসলামী শাখায় আমানত এক বছরে ১২ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকা বেড়ে ৫১ হাজার ৬৬০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। ইসলামী উইন্ডোগুলোতে আমানত ৬ হাজার ৮৯৬ কোটি টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১ হাজার ৪১১ কোটি টাকায়।

সব মিলিয়ে, আগস্ট শেষে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আমানত দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৭৫ হাজার ১২৩ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ১২ হাজার ৮৩৮ কোটি টাকা বা ২.৭৮ শতাংশ বেশি। দেশের ব্যাংকিং খাতের মোট আমানতের ২০.৭৬ শতাংশ এখন এ ব্যবস্থার আওতায়।

প্রচলিত ব্যাংকগুলোর ইসলামী শাখা ও উইন্ডোর প্রবৃদ্ধি শরিয়াহভিত্তিক সেবার প্রতি আগ্রহের ইঙ্গিত দেয়। তবে এ তথ্য দিয়ে গ্রাহকেরা পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংক থেকে আমানত সরিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানে নিয়েছেন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। এর জন্য ব্যাংকভিত্তিক আমানত প্রবাহ ও গ্রাহক আচরণের তথ্য প্রয়োজন।

চাহিদা বাড়লেও আস্থা অর্জন করতে হবে

শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের প্রতি আগ্রহের পেছনে ধর্মীয় মূল্যবোধের পাশাপাশি ন্যায়সংগত লেনদেন, স্বচ্ছতা ও অর্থের নিরাপত্তার প্রত্যাশা রয়েছে। কিন্তু এসব প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে শুধু ইসলামী পরিচয় দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে আস্থা ধরে রাখা সম্ভব নয়।

আমানতকারী প্রয়োজনের সময় অর্থ তুলতে পারছেন কি না, প্রতিশ্রুত মুনাফা পাচ্ছেন কি না, আর্থিক তথ্য সম্পর্কে জানতে পারছেন কি না এবং অভিযোগের প্রতিকার হচ্ছে কি না—এসব বিষয়ই আস্থা নির্ধারণ করে।

তাই পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকগুলোর লক্ষ্য শুধু নতুন আমানত সংগ্রহ নয়; বিদ্যমান আমানত ধরে রাখা, আর্থিক সক্ষমতা পুনর্গঠন এবং সুশাসনের প্রমাণ দেওয়া। একই সঙ্গে ইসলামী শাখা ও উইন্ডোকেও শরিয়াহ পরিপালন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও সেবার মান নিশ্চিত করতে হবে।

বিনিয়োগ বাড়লেই আর্থিক সুস্থতা নিশ্চিত হয় না

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্টে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৪২ হাজার ১০৭ কোটি টাকা। আগের বছরের একই সময়ে তা ছিল ৫ লাখ ২৪ হাজার ৪৯৩ কোটি টাকা। এক বছরে বিনিয়োগ বেড়েছে ১৭ হাজার ৬১৪ কোটি টাকা বা প্রায় ৩.৩৬ শতাংশ। তবে জুলাই থেকে আগস্টে বেড়েছে মাত্র ৭৯ কোটি টাকা।

বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি এককভাবে কোনো ব্যাংকের আর্থিক সুস্থতার প্রমাণ নয়। বিনিয়োগ থেকে আয় আদায়, উৎপাদনশীল খাতে অর্থের ব্যবহার, গ্রাহকের পরিশোধ সক্ষমতা এবং খেলাপি বিনিয়োগের ঝুঁকি মূল্যায়ন জরুরি।

ইসলামী ব্যাংকিংয়ের লক্ষ্য শুধু সুদভিত্তিক অর্থায়নের বিকল্প তৈরি নয়; বৈধ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন, ন্যায়সংগত লেনদেন ও কল্যাণে ভূমিকা রাখাও এর উদ্দেশ্য। এজন্য খেলাপি বিনিয়োগ আদায়, দুর্বল হিসাব পুনর্মূল্যায়ন, প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ এবং অনিয়মের জন্য দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। বিনিয়োগের পরিমাণের চেয়ে তার গুণগত মান ও আদায়যোগ্যতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

রেমিট্যান্সে প্রবৃদ্ধির সুযোগ

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্টে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে প্রায় ৬২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা জুলাইয়ের ৫৩৮ মিলিয়ন ডলারের তুলনায় প্রায় ১৬.২ শতাংশ বেশি।

সহজ ও দ্রুত সেবা, প্রতিযোগিতামূলক বিনিময়ব্যবস্থা এবং নিরাপদ লেনদেন নিশ্চিত করতে পারলে এ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা সম্ভব। তবে এক মাসের বৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের প্রমাণ নয়। ধারাবাহিক রেমিট্যান্স প্রবাহের পাশাপাশি সেবার মান ও লেনদেনের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে।

সম্প্রসারণের সঙ্গে শরিয়াহ পরিপালন জরুরি

প্রচলিত ব্যাংকগুলোর ইসলামী শাখা ও উইন্ডোতে আমানত বৃদ্ধি শরিয়াহভিত্তিক সেবার সম্প্রসারণের সম্ভাবনা দেখায়। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায় যে, প্রচলিত ধারার কয়েকটি ব্যাংক পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকে রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে। এদের মধ্যে এনসিসি ব্যাংকের ইসলামী ব্যাংকিংয়ে রূপান্তরের উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

তবে এ রূপান্তর শুধু পণ্যের নাম বা চুক্তিপত্র পরিবর্তনের বিষয় নয়। অর্থায়ন, সম্পদ ও দায় ব্যবস্থাপনা, হিসাবরক্ষণ, তহবিলের ব্যবহার এবং কর্মীদের দক্ষতার সঙ্গে শরিয়াহ পরিপালনের সামঞ্জস্য নিশ্চিত করতে হয়।

এ জন্য প্রশিক্ষিত জনবল, কার্যকর শরিয়াহ তদারকি, স্বাধীন শরিয়াহ নিরীক্ষা ও নিয়মিত পর্যালোচনা প্রয়োজন। ইসলামী ব্যাংকিংয়ের সাফল্য শাখা বা উইন্ডোর সংখ্যা দিয়ে নয়, বরং সেবার মান, শরিয়াহ পরিপালন ও গ্রাহকের স্বার্থ সুরক্ষার মাধ্যমে বিচার করতে হবে।

পাঁচ ব্যাংকের একীভূতকরণ: আস্থা পুনর্গঠনের পরীক্ষা

পাঁচটি দুর্বল ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন দেশের ব্যাংকিং খাতের একটি বড় প্রাতিষ্ঠানিক পরীক্ষা। এ উদ্যোগে মূলধন, প্রযুক্তি, মানবসম্পদ ও ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে একীভূতকরণ নিজে থেকেই পুরোনো অনিয়ম, দুর্বল বিনিয়োগ ও সুশাসনের ঘাটতি দূর করে না।

সফল একীভূতকরণের জন্য সময়সীমাভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা, দায়িত্বের স্পষ্ট বণ্টন এবং সমন্বিত রোডম্যাপ প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে একটি নিবেদিত মার্জার ইন্টিগ্রেশন ম্যানেজমেন্ট অফিস (আইএমও) গঠন করে প্রধান নির্বাহী, প্রধান ঝুঁকি কর্মকর্তা ও প্রধান অর্থ কর্মকর্তার কার্যালয়ের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে অগ্রাধিকার নির্ধারণ ও অগ্রগতি তদারকি করা যেতে পারে।
একই সঙ্গে আমানতকারীদের স্বার্থ, স্বাভাবিক ব্যাংকিং সেবা এবং আর্থিক তথ্যের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে। পুরোনো অনিয়ম ও আর্থিক দুর্বলতা চিহ্নিত করে সমাধান করতে হবে; নতুন কাঠামোর আড়ালে সেগুলো আড়াল করা যাবে না। গ্রাহকদের সঙ্গে স্বচ্ছ যোগাযোগও জরুরি।

ইসলামী ব্যাংকিংয়ে আস্থা পুনরুদ্ধারে পাঁচটি অগ্রাধিকার

প্রথমত, সুশাসন ও জবাবদিহি: বিনিয়োগ অনুমোদনে অনিয়ম, স্বার্থের সংঘাত ও ক্ষমতার অপব্যবহার প্রতিরোধ করতে হবে। পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব স্পষ্ট করে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি: বাংলাদেশ ব্যাংককে মূলধন, তারল্য, খেলাপি বিনিয়োগ, প্রভিশন ঘাটতি ও সুশাসনের দুর্বলতা পৃথকভাবে মূল্যায়ন করে সময়সীমাভিত্তিক সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।

তৃতীয়ত, খেলাপি বিনিয়োগ আদায়: প্রকৃত ঝুঁকির চিত্র প্রকাশ, ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং আদায়যোগ্য অর্থ উদ্ধারে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা নিতে হবে।

চতুর্থত, শরিয়াহ পরিপালন: কার্যকর শরিয়াহ তদারকি, স্বাধীন নিরীক্ষা এবং চুক্তির যথার্থতা নিশ্চিত করতে হবে। পরিপালন যেন শুধু আনুষ্ঠানিক অনুমোদনে সীমাবদ্ধ না থাকে।

পঞ্চমত, গ্রাহকের স্বার্থ ও স্বচ্ছতা: আমানত উত্তোলন, মুনাফা প্রদান, সেবার শর্ত ও অভিযোগ নিষ্পত্তি সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য দিতে হবে। অতিরঞ্জিত আশ্বাসের বদলে যাচাইযোগ্য তথ্য ও দৃশ্যমান অগ্রগতি তুলে ধরতে হবে।

চাহিদাকে স্থায়ী আস্থায় রূপ দিতে হবে

ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সামগ্রিক আমানত বৃদ্ধি এবং প্রচলিত ব্যাংকগুলোর ইসলামী শাখা ও উইন্ডোর সম্প্রসারণ সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকগুলোর আমানত এখনো আগের বছরের তুলনায় কম। এ ব্যবধান কমাতে আর্থিক সক্ষমতা, সুশাসন, বিনিয়োগের গুণগত মান ও গ্রাহকসেবায় দৃশ্যমান উন্নতি প্রয়োজন। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যকর তদারকি ও ব্যাংকগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

ইসলামী ব্যাংকিংয়ের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য শুধু আমানতের প্রবৃদ্ধিতে নয়; আমানতকারীর অর্থের নিরাপত্তা, দায়িত্বশীল বিনিয়োগ, সময়মতো সেবা, শরিয়াহ পরিপালন ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতায়। চাহিদাকে স্থায়ী আস্থায় রূপ দিতে হলে ব্যাংকগুলোকে এসব ক্ষেত্রেই নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রমাণ করতে হবে।

মো. খায়রুল হাসান সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসির ব্র্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট, আওফি-সনদপ্রাপ্ত শরিয়াহ উপদেষ্টা ও নিরীক্ষক (সিএসএএ) এবং আর্থিক খাতের বিশ্লেষক।