Print Date & Time : 22 October 2026 Thursday 02:50 am

কিশোর অপরাধের ভয়াবহতা ও করণীয়

image

মো. সাখাওয়াত হোসেন: বাংলাদেশে সমসাময়িককালে কিশোরদের অপরাধের দিকে ঝুঁকে পড়ার একটি প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। এ বিষয়টি অত্যন্ত দুশ্চিন্তার ও দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের পথে হুমকিস্বরূপ। বাংলাদেশ পিস অবজারভেটরির (বিপিও) তথ্য অনুযায়ী ২০১৯ সাল থেকে তরুণদের সহিংস প্রবণতা বেড়েছে। ২০১৯ সালে ২ হাজার ৪১১টি যুব সহিংস ঘটনা, ২০২০ সালে ২ হাজার ৩৬৩টি ঘটনা এবং ২০২১ সালে তা কিছুটা কমে ১ হাজার ৮৯৬টি সহিংস ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনাগুলো ২০১২ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত কখনও কমেছে এবং কখনও বেড়েছে। তবে তা কখনই ১ হাজার ৫০০ ছাড়ায়নি, কিন্তু ২০১৯ সালে হঠাৎ বেড়ে যায়। তিন বছরে দেশে অন্তত ৩ হাজার ৯২২ কিশোর-কিশোরীকে হিংসাত্মক ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। উল্লেখ করার মতো বিষয় হচ্ছে— করোনাকালে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বাধ্যতামূলকভাবে ছুটি থাকায় তরুণদের মধ্যে অপরাধের প্রবণতা লক্ষ করা যায়। 

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যৌন নিপীড়নের ঘটনায় তরুণদের সম্পৃক্ততা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ২০২১ সালে তরুণ জনগোষ্ঠী সংশ্লিষ্ট সহিংসতার বেশিরভাগই ছিল লাঞ্ছনা যা ৫৪ দশমিক ৭ শতাংশ এবং যৌন নিপীড়নের ঘটনা ৩০ দশমিক ৮ শতাংশ। এছাড়া অপহরণ বা জিম্মি ৫ দশমিক ৭ শতাংশ, সংঘর্ষ ২ শতাংশ, মারামারি শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ, দল বেঁধে সহিংসতা (মব ভায়োলেন্স) শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ, সম্পদের ক্ষতিসাধন শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ রয়েছে। উন্নত দেশগুলোর তরুণ জনগোষ্ঠীর অপরাধচিত্রে দেখা যায় সেখানে প্রধানত ভাঙচুর বা সম্পত্তির ক্ষতি করার জন্য কিশোর ও তরুণরা গ্রেপ্তার হয়ে থাকেন, কিন্তু বাংলাদেশে এটা খুব কম। ২০২১ সালে বাংলাদেশে তরুণদের সহিংস ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ২ হাজার ১৬৪ জনকে। এছাড়া নিহত ১ হাজার ৯৭, আহত ১ হাজার ৫৯৩, যৌন নিপীড়ন ৭৩০ এবং অপহরণের ১৩৬টি ঘটনা ঘটেছে। কাজেই তরুণ প্রজন্মের অপরাধপ্রবণতার দিকে আসক্ত হওয়া একটি হুমকি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে এবং এ থেকে উত্তরণে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ গ্রহণ করা উচিত। 

দেশের প্রায় অর্ধেক জনশক্তি তারুণ্যে ভরপুর। সে কারণেই কিশোরদের নিয়ে ব্যাপক কর্মযজ্ঞের আয়োজন জরুরি হয়ে পড়েছে যাতে তাদের উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহার করে দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখা যায়। অন্যদিকে সার্কভুক্ত দেশ ভুটানে ২৪ বছরের নিচে তরুণের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ৫০ শতাংশ এবং তরুণদের মধ্যে শিক্ষিতের হার তুলনামূলকভাবে বেশি। ভুটানে সাধারণত তরুণরা হত্যা, ধর্ষণ, ডাকাতি, অপহরণ ও মাদক সংক্রান্ত অপরাধের সঙ্গে জড়িত। পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার সময় অপরাধীরা জানিয়েছে, সহযোগীদের চাপ ও সাহচর্যে ৫৬ দশমিক ৮ শতাংশ অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকে। ১২ শতাংশ জানায় নিম্ন আর্থ-সামাজিক অবস্থানের কারণে তারা অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে। বেকারত্ব থেকে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে ৭ শতাংশ তরুণ।

ভারতে ১৬ থেকে ২৫ বছরের ছেলেমেয়েদের কিশোর হিসেবে ধরা হয়। কিশোরদের অপরাধে সম্পৃক্ত হওয়ার পেছনে পরিবার, বন্ধুদের সাহচর্য ও সংঘ, হতাশা ও বঞ্চনা, গণমাধ্যম, ব্যক্তিত্বের সংকট, ঝুঁকিপূর্ণ কাজের প্রতি আগ্রহ ইত্যাদি কারণে কিশোররা অপরাধী হয়ে উঠছে। ভারতে অধিকাংশ অপরাধী (৫৫ শতাংশ) নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসে, নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে আসে ৪০ শতাংশ। এছাড়া শহর এলাকায় তরুণরা তুলনামূলকভাবে বেশি অপরাধ করে। যেসব তরুণ অপরাধে জড়াচ্ছে তাদের অধিকাংশই অশিক্ষিত এবং অপরাধী যাদের শিক্ষা রয়েছে তারা মাধ্যমিক লেভেল পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে। 

অপরাধ একটি সামাজিক প্রপঞ্চ। সৃষ্টির শুরু হতে অদ্যাবধি বিভিন্ন রকমের অপরাধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে আমাদের পরিচয় ঘটেছে। কালের পরিক্রমায়, প্রযুক্তির যোগসাজশে অপরাধের ধরন ও সহিংসতায় বৈচিত্র্য এসেছে তথাপি অপরাধের ক্রমবর্ধমান হার জাতীয় জীবনে অত্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলাকে বিপর্যস্ত করেছে। 

কিশোররা সাধারণত সমাজবদ্ধ অন্যান্য মানুষের সঙ্গে মেলামেশার মিথষ্ক্রিয়ায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড শেখা হয়, কিশোর তার ঘনিষ্ঠ মানুষের সংস্পর্শে থেকেই অপরাধমূলক আচরণে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। কিশোর যখন অপরাধমূলক আচরণ শিখে তখন (ক) অপরাধের কলাকৌশল শিখে যা জটিল ও সহজও হয়ে থাকে (খ) অপরাধের ধরন, উদ্দেশ্য, যৌক্তিকতা এবং এ-সংক্রান্ত মনোভাব ও ব্যবহারবিধি সম্বন্ধে জানতে পারে। এছাড়া সংশ্লিষ্ট দেশের আইন, বিধি বিধান ইত্যাদিও ওপর নির্ভর করেই কোনো ব্যক্তি অপরাধমূলক কাজের প্রেরণা বা তাগাদা পায়। একজন মানুষ তখনই আইন অমান্য করে যখন তার সামনে আইন মান্য করার চেয়ে অমান্য করার মতো যুক্তি ও ব্যাখ্যা থাকে। অপরাধপ্রবণ ব্যক্তি ও অপরাধবিমুখ ব্যক্তিদের মধ্যকার পারস্পারিক মেলামেশার ক্ষেত্রে তারতম্য লক্ষ করা যায় অর্থাৎ স্থিতিকাল, অগ্রগামিতা ও গভীরতার দিক হতে মেলামেশা বাড়ে বা কমে। পঠন পাঠনের বিষয়াবলি মানুষ যে প্রক্রিয়ায় শিখে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড শেখার বিষয়ে শিক্ষার সবগুলো কৌশল রপ্ত করতে হয়। যদিও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড হচ্ছে সাধারণ প্রয়োজন ও অপরাধীর মূল্যবোধের বহিঃপ্রকাশ, এটি কিন্তু অন্যান্য প্রয়োজন ও মূল্যবোধের সঙ্গে তুলনীয় নয় তথাপি এ ধরনের প্রয়োজন ও মূল্যবোধ নিরপরাধ ব্যক্তির মধ্যেও বিদ্যমান থাকে। অর্থাৎ আমরা যেটিকে বলে থাকি সঙ্গদোষে লোহা ভাসে। মানুষের জীবনাচরণে তার নিকটজন বিশেষ করে পিয়ার গ্রুপের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। সে কারণেই পিয়ার গ্রুপের প্রেসার কিংবা অনুপ্রেরণায় কিশোররা ক্রমান্বয়ে অপরাধী হয়ে ওঠে। 

কিশোরদের অপরাধপ্রবণতার জন্য বেশ কিছু কারণকে দায়ী করা যায়, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কারণের একটি হচ্ছে ব্যক্তিগত ইস্যু ও অন্যটি হচ্ছে সমসাময়িক পরিস্থিতি/পরিস্থিতিগত কারণ। ব্যক্তিগত ইস্যুর মধ্যে রয়েছে অনিরাপত্তায় ভোগা, ভয়, আবেগময় দ্বন্ধ, নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা, শত্রুতা, অবজ্ঞা, আবেগপ্রবণতা, বশ্যতা ইত্যাদি। অন্যদিকে পিয়ার গ্রুপের সঙ্গে সম্পর্ক, বিদ্যালয়ের পরিবেশ (সহপাঠীদের সঙ্গে মেলামেশা, স্কুলের প্রতি আগ্রহ, একাডেমিক অনাগ্রহের ফলে পাস করতে ব্যর্থ হওয়া), সিনেমা/নাটক, কাজের পরিবেশ, পরিবার (মা-বাবার মধ্যে বিশৃঙ্খলা, পিতার পেশা, বিচ্ছিন্ন পরিবার, গৃহস্থালি কর্মকাণ্ড) প্রভূত কারণে কিশোররা অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে।   

কিশোররা বিভিন্ন উপায়ে অপরাধে যুক্ত হতে পারে। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে: প্রথমত- ক্রোধ, ঘৃণা, ভয় ইত্যাদিতে আবেগের বশবর্তী হয়ে অনেকেই অপরাধে জড়িয়ে পড়ে, দ্বিতীয়ত- পরিচয়গত সমস্যাজনিত কারণে কিশোররা অনেকেই আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটিয়ে অন্যের ক্ষতিসাধন করে,  তৃতীয়ত- কিছু কিশোর রয়েছে যারা বন্ধুদের সহযোগিতা করতে যেয়ে ফাঁদে পড়ে অপরাধে আসক্ত হয়), চতুর্থত- প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে অনেকেই অপরাধী না হয়েও পরিচিতি পাওয়ার লোভে অপরাধে যুক্ত হয়, পঞ্চমত- নিম্নবিত্ত কিশোর অনেকটা নিরুপায় হয়েই পরিবার-পরিজনের ভরণপোষণের নিমিত্তে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে।   

কিশোর অপরাধের প্রবণতা থেকে কিশোরদের দূরে রাখার উদ্যোগ হিসেবে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। নজরদারি বৃদ্ধি করা (রাস্তায় ল্যাম্প পোস্ট ও লাইটের সংখ্যা বৃদ্ধি করা, সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক জায়গায়, নিরাপত্তা প্রহরীর ব্যবস্থা রাখা), অভিভাবকদের অভিভাবকত্বের যথার্থ বহিঃপ্রকাশ ঘটানো, প্রতিষ্ঠিত নিয়ম-নীতির ওপর ভিত্তি করে চলতে বাধ্য করা, স্কুল-কলেজ নিয়মিত মনিটরিং করা, বন্ধুদের বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া, অ্যালকোহলমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করা ইত্যাদি। 
বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে, কিশোর অপরাধের অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো অচল হয়ে পড়া। সামাজিক প্রতিষ্ঠান বলতে মূলত পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনকে বোঝানো হয়ে থাকে। এ প্রতিষ্ঠানগুলোকে সচল করার মাধ্যমে কিশোর অপরাধ, সামাজিক বিশৃঙ্খলা, অনাচার, নৈরাজ্য কমিয়ে নিয়ে আসা যায়। 

একজন তরুণের মধ্যে সমাজের প্রচলিত রীতিনীতি, নিয়মকানুন যথাযথভাবে প্রতিপালন হলে তরুণদের অপরাধপ্রবণতা থেকে দূরে রাখা যায়। অন্যদিকে তরুণরা যদি বাবা-মা, ভাইবোন, সহপাঠী ও বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে সবসময় সাবলীল ও ইতিবাচক পরিবেশের দ্বারা পরিচালিত হয়ে থাকে সেক্ষেত্রেও তাদের দ্বারা অপকর্ম সংঘটিত হওয়ার কোনোরূপ সুযোগ নেই। তাছাড়া প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রের উন্নতিকল্পে কেউ যদি দায়বদ্ধতার জায়গায় নিজেকে দাঁড় করায় তাহলে তার দ্বারাও কোনো অপরাধকর্ম সংঘটিত হওয়ার সুযোগ নেই। কাজেই তরুণরা যদি পারিবারিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করে, প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরি করে, পড়াশোনার পাশাপাশি অন্যান্য শিক্ষা সহায়ক কার্যক্রমে সম্পৃক্ত থাকে তাহলে তাদের কিশোর অপরাধ থেকে দূরে রাখা যাবে।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়