Print Date & Time : 21 October 2026 Wednesday 12:18 am

শব্দ দূষণ মোকাবিলায় প্রয়োজন নাগরিক সচেতনতা

image

ড. মো. ইকবাল সরোয়ার: শব্দ এক ধরনের শক্তি, যা বাতাসের তরঙ্গের মাধ্যমে প্রবাহিত হয়। মানুষের মনের ভাব প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম এই শব্দ। কোনো একটি উৎস থেকে শব্দ তৈরি হয়ে বায়ু, পানি বা কঠিন বস্তুর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। শব্দ মানুষের কানের শ্রুতি-গ্রাহক পর্দায় আঘাত করে মস্তিষ্কে বিশেষ অনুভূতির জন্ম দেয়। এভাবেই তৈরি হয় যোগাযোগ, এভাবেই মানুষ শুনতে পায়। শব্দ যখন দৈহিক ও মানসিক যন্ত্রণার সৃষ্টি করে তখন দূষণ সৃষ্টি করে। কোনো কিছু থেকে সৃষ্ট তীব্র শব্দ যখন অস্বাভাবিক মাত্রায় প্রবাহিত হয়ে শ্রবণশক্তির ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে তাকেই শব্দ দূষণ বলা হয়। অর্থাৎ শব্দ দূষণ হলো অনাকাঙ্ক্ষিত বা অতিরিক্ত শব্দ, যা মানব স্বাস্থ্য, বন্যপ্রাণী ও পরিবেশের স্বাভাবিক মানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অন্যভাবে বলা যায়, শব্দ দূষণ হলো মানব বা অন্যান্য প্রাণীর শ্রুতিসীমা অতিক্রমকারী, অস্বস্তিকর ও ক্ষতিকর শব্দ যা পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করে। 

শব্দ দূষণকে বলা হয় নীরব ঘাতক। শব্দ দূষণের সাথে বধিরতার সম্পর্ক রয়েছে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, প্রতি ১ হাজার জনের মধ্যে একজন জীবনে কোনো না কোনো এক সময়ে বধির হয়ে যেতে পারে। তাছাড়া প্রতি ১ হাজার জনের মধ্যে একজন বধিরতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। শব্দ পরিমাপের মূল একক হলো ডেসিবেল (dB)। এটি মূলত শব্দের তীব্রতা, প্রাবল্য বা জোরে হওয়ার মাত্রা প্রকাশ করে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ৬৫ ডেসিবেলের ওপরের শব্দকে শব্দ দূষণ হিসেবে গণ্য করা হয় এবং ৭৫ ডেসিবেলের ওপরের শব্দ মানুষের শরীরের জন্য ক্ষতিকর। 

শব্দ দূষণ পরিবেশ বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ। মানুষকে যদি ১০০ ডেসিবেল শব্দের মধ্যে ১৫ মিনিটের বেশি সময় রাখা হয় তবে তার শ্রবণশক্তি একেবারে হারিয়ে যেতে পারে। আবার একজন মানুষ যদি আট ঘণ্টা করে ক্রমাগত ৬০ থেকে ৮০ ডেসিবেল শব্দের মধ্যে এক বছর অবস্থান করে, তবে তার পূর্ণাঙ্গ বধির হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, ৩০টি কঠিন রোগের কারণ ১২ রকমের পরিবেশ দূষণ যার মধ্যে শব্দ দূষণ অন্যতম। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অনুন্নত সড়ক ব্যবস্থা, অনিয়ন্ত্রিত শিল্পায়ন ও যানবাহন, প্রযুক্তির যথেচ্ছ ব্যবহার ও মানুষের জীবনধারণের প্রেক্ষাপট পরিবর্তন ইত্যাদি শব্দ দূষণের মূল কারণ। শব্দ দূষণের কারণে রক্তচাপ বৃদ্ধি, হৃৎপিণ্ড ও মস্তিষ্কে অক্সিজেন হ্রাস পেতে পারে, পরিবর্তন দেখা দিতে পারে হৃৎস্পন্দনে। এর ফলে শ্বাসকষ্ট, মাথাঘোরা, বমি বমি ভাব, দেহের নিয়ন্ত্রণ হারানোসহ মানসিক বিভিন্ন অসুস্থতা তৈরি করে। শব্দ দূষণ শুধু নাগরিক জীবনের সমস্যা নয়, এটি এখন সমগ্র বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সংকট। শব্দ দূষণের ফলে বাংলাদেশের সর্বস্তরের নাগরিক সাময়িক বা স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর মধ্যে ছাত্র-ছাত্রী, শিশু, হাসপাতালের রোগী, ট্রাফিক পুলিশ, পথচারী ও গাড়ির চালক ও হেলপার শব্দ দূষণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গর্ভবতী মায়েরা দীর্ঘ সময় উচ্চ শব্দপ্রবণ স্থানে অবস্থান করলে গর্ভস্থ শিশুর শ্রবণশক্তি ও স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে। শব্দদূষণ শিক্ষার্থীদের পরিপূর্ণ মেধার বিকাশে বাধা সৃষ্টি করছে। ফলে দেশ ও জাতি বঞ্চিত হচ্ছে মেধাবী প্রজন্মের প্রকৃত সেবা থেকে। শব্দ দূষণ মানুষের কাজের মনোযোগে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে এবং অনেক সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। পশুপাখিরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য শব্দের ওপর নির্ভর করে, যা শব্দ দূষণের কারণে ব্যাহত হয়। অনেক সময় দেখা যায়, তীব্র শব্দ দূষণের কারণে পাখিরা শহর ছেড়ে দূরবর্তী স্থানে আশ্রয় নেয়। 

শব্দ দূষণের প্রধান উৎস হলো: গাড়ি, বাস, ট্রাক, মোটরসাইকেলের হর্ন; শিল্প-কলকারখানার, নির্মাণ কাজের বিভিন্ন মেশিনের ড্রিলিং ও ইটভাঙার মেশিনের উচ্চশব্দ; রাজনৈতিক, ধর্মীয় এবং সামাজিক অনুষ্ঠানে বাজানো অতি উচ্চ-স্বরে বাজানো মাইক; বিমান ও রেলের তীব্র শব্দ, গৃহস্থালি কাজে ব্যবহারকৃত ব্লেন্ডার, ভ্যাকুয়াম ক্লিনার, জেনারেটর; মিউজিক ও কনসার্ট অনুষ্ঠান ইত্যাদি। শব্দদূষণ বর্তমানে একটি বৈশ্বিক সমস্যা। শব্দদূষণ ব্যবস্থাপনায় বর্তমানে অনেক কাজ হচ্ছে। বিশেষ করে শব্দের মানমাত্রা নির্ধারণের মাধ্যমে তা বজায় রাখতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। শব্দের মাত্রা কোন পর্যায়ে সহনীয় বা অসহনীয় এই বিষয়ে দুটি আন্তর্জাতিক সংস্থা (আমেরিকান স্পিচ এন্ড হেয়ারিং অ্যাসোসিয়েশন (ASHA) এবং বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) কর্তৃক নির্ধারিত মানমাত্রা এবং বাংলাদেশের মানমাত্রা নিম্নে উপস্থাপন করা হলো:

 ক্র. নং    মাত্রা    ASHA(dB)    WHO(dB)     বাংলাদেশ শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা ২০০৬
১    স্বাভাবিক     ০-২৫    ০-২০    এলাকা     দিন (dB)    রাত (dB)
২    হালকা     ২৬-৪০    ২১-৪০    নীরব    ৫০    ৪০
৩    মধ্যম     81-55    41-70    আবাসিক    55    45
৪.    মধ্যম থেকে তীব্র     56-70        মিশ্র    60    50
৫    তীব্রতর    71-91    71-90    বাণিজ্যিক    70    60
৬.    অসহনীয়     91 এর  ঊর্ধ্বে     91-120    শিল্প    75    70

শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণে যথাযথ আইন, বিধিমালা, নীতিমালা এবং পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ রকম কিছু আইন ও বিধিমালা রয়েছে যেমন: বাংলাদেশ সরকার সম্প্রতি ‘শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা-২০২৫’ জারি করেছে যা মূলত বাংলাদেশ শব্দ দূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা ২০০৬-কে হালনাগাদ করে তৈরি করা। এই বিধিমালায় প্রধান পরিবর্তন হলো ট্রাফিক পুলিশকে জরিমানা করার ক্ষমতা প্রদান, নিষিদ্ধ হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহারের জন্য সুস্পষ্ট শাস্তির বিধান যুক্ত এবং প্রথমবার অপরাধে ৫০০ টাকা জরিমানা ইত্যাদি। এছাড়া রয়েছে আমদানি নীতি আদেশ (২০১৫-২০১৮)। এখানে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে ৭৫ ডেসিবেলের অধিক মাত্রার হর্ন আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (চ) অনুযায়ী পরিবেশ দূষণ সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ, প্রকাশ ও প্রচারের কথা বলা আছে। স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন-২০০৯ এর (ঝ) তে পরিবেশ উন্নয়ন কমিটির কথা বলা আছে। মোটরযান আইন, ১৯৮৮ অনুযায়ী আইন মোতাবেক নিষিদ্ধ হর্ন ব্যবহারে জরিমানা করার কথা উল্লেখ আছে। ঢাকা ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০০৮ অনুযায়ী আবাসিক এলাকায় সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত কোনো যন্ত্রপাতি ব্যবহার এবং প্রকল্প স্থলে বিরক্তিকর শব্দ করা যাবে না বলে বলা আছে।

বাংলাদেশ সরকার পূর্বের শব্দ দূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালায় একাধিক সীমাবদ্ধতা থাকায় ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের লক্ষ্যে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় শব্দ দূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা-২০০৬ হালনাগাদ করে শব্দ দূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা-২০২৫ এর প্রজ্ঞাপন জারি করে। এই বিধি লঙ্ঘনে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। এই বিধিমালায় এলাকাভিত্তিক শব্দের মানমাত্রা নির্ধারণসহ দিনে ও রাতে এলাকাভিত্তিক শব্দের মানমাত্রা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। বিধিমালায় ভোর ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত সময়কে দিবাকালীন এবং রাত ৯টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত সময়কে রাত্রিকালীন সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। শব্দ দূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা-২০২৫ এ নীরব এলাকায় দিনে ৫০ এবং রাতে ৪০ ডেসিবেল; আবাসিক এলাকায় দিনে ৫৫ এবং রাতে ৪৫ ডেসিবেল; মিশ্র এলাকায় দিনে ৬০ এবং রাতে ৫০ ডেসিবেল; বাণিজ্যিক এলাকায় দিনে ৭০ এবং রাতে ৬০ ডেসিবেল এবং শিল্প এলাকায় দিনে ৭৫ এবং রাতে ৭০ ডেসিবেল পর্যন্ত নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। 

বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস)-এর এক গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকা ট্রাফিক বিভাগে কর্মরতদের ৫৬ দশমিক ৪ শতাংশ পুলিশ কানে কম শোনেন এর মধ্যে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ পুলিশ স্থায়ীভাবে শ্রবণশক্তি হারানোর পথে রয়েছে। অন্য আরেকটি গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকাসহ দেশের পাঁচটি সিটি করপোরেশন এলাকার প্রায় ৪২ শতাংশ রিকশাচালক শব্দ দূষণের শিকার। এছাড়া প্রায় ৩১ শতাংশ ট্রাফিক পুলিশ, ২৪ শতাংশ সিএনজি চালক, ২৪ শতাংশ মুদি দোকানদার, ১৬ শতাংশ বাসচালক, ১৫ শতাংশ প্রাইভেট গাড়িচালক এবং ১৩ শতাংশ মোটরসাইকেল চালক শব্দ দূষণে আক্রান্ত। সম্প্রতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগে আমি এবং আমার এমএস ছাত্র শাহেদ আলমের মাস্টার্স পর্যায়ের এক যৌথ গবেষণায় দেখা যায়, চট্টগ্রাম মহানগরীর শব্দ দূষণের মাত্রা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানের চেয়ে অনেক বেশি। এই অতিরিক্ত শব্দ প্রতিনিয়ত নগরবাসীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রার মান ব্যাহত করার পাশাপাশি স্বাস্থ্যঝুঁকি হুমকিতে পড়ছে। এই গবেষণায় দেখা যায়, কর্মদিবসে শিল্প এলাকায় শব্দ দূষণের মাত্রা ৮৭ দশমিক ২৩ ডেসিবেল এবং সাপ্তাহিক ছুটির দিনে শিল্প এলাকায় শব্দ দূষণের মাত্রা ৭৮ দশমিক ৮ ডেসিবেল। অন্যদিকে চট্টগ্রাম মহানগরীর আবাসিক এলাকায় কর্মদিবসে শব্দ দূষণের মাত্রা ৬১ দশমিক ২৫ ডেসিবেল এবং সাপ্তাহিক ছুটির দিনে ৬১ দশমিক ২৫ ডেসিবেল।

শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণে ব্যক্তিগত সচেতনতা বৃদ্ধিসহ সরকারি আইন প্রয়োগে সর্বত্র সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা একান্ত প্রয়োজন। শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে যেমন: শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা-২০২৫ কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে; নীরব এলাকায় হর্ন বাজানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে; হাইড্রোলিক হর্ন আমদানি, বিক্রি, ব্যবহারকারীদের উচ্চ জরিমানা ও লাইসেন্স বাতিল করতে হবে; আবাসিক এলাকা থেকে শিল্পকারখানা দূরবর্তী স্থানে সরিয়ে নিতে হবে; সড়কে উভয় পার্শ্বের ও আবাসিক এলাকায় বেশি পরিমাণে গাছ লাগাতে হবে, কারণ গাছ প্রাকৃতিকভাবে শব্দ শোষণ করে; ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে উচ্চ শব্দে ও গভীর রাত পর্যন্ত মাইকের ব্যবহার হ্রাস করতে হবে; নির্মাণ এলাকায় শ্রমিকদের জন্য এয়ার প্লাগ নিশ্চিত করতে হবে; সর্বোপরি গাড়ি চালানোর সময় অযথা হর্ন দেওয়া পরিহার করে শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণে ব্যক্তিগত সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।

অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম