সাজ্জাদুল আলম খান, ভালুকা (ময়মনসিংহ): ময়মনসিংহের ভালুকা সরকারি কলেজে একাদশ শ্রেণির ভর্তি কার্যক্রম ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে ভর্তি বিজ্ঞপ্তির ভুল তারিখ, বিভাগভিত্তিক ন্যূনতম জিপিএর অস্পষ্টতা, ভর্তি ফির পার্থক্য এবং শিক্ষক ও শ্রেণিকক্ষের সংকট নিয়ে। কলেজটির অনুমোদিত আসনসংখ্যা ১ হাজার ১০০ হলেও প্রয়োজনীয় শিক্ষক, অবকাঠামো ও প্রশাসনিক জনবলের ঘাটতির কথা স্বীকার করেছে কর্তৃপক্ষ।
বিজ্ঞপ্তিতে ভুল তারিখ, জিপিএ নিয়ে অস্পষ্টতা: কলেজের ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি বিজ্ঞপ্তিতে প্রকাশের তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫। সংশ্লিষ্ট শিক্ষাবর্ষ বিবেচনায় তারিখটি ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ হওয়ার কথা। গুরুত্বপূর্ণ দাপ্তরিক নথিতে এমন ভুলের কারণে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আগে যথাযথ যাচাই-বাছাই করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিভাবকরা। তারা দ্রুত সংশোধনী প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন।
বিভাগভিত্তিক ন্যূনতম জিপিএ বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ না থাকার অভিযোগও উঠেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভালুকা সরকারি কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ন্যূনতম জিপিএ ৩.০০ এবং মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ২.৫০। অন্যদিকে, ত্রিশালের সরকারি নজরুল কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ৪.২৫ এবং মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ৪.০০ নির্ধারণ করা হয়েছে বলে তারা জানিয়েছেন।
কলেজের উপাধ্যক্ষ মো. কামরুজ্জামান তুহিন বলেন, অনলাইন ভর্তি ব্যবস্থায় নির্ধারিত জিপিএর নিচে থাকা শিক্ষার্থীরা আবেদন করতে পারে না। এ ক্ষেত্রে কলেজ কর্তৃপক্ষের সরাসরি নিয়ন্ত্রণের সুযোগ নেই।
তিনি জানান, কলেজের অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের সভায় ভবিষ্যতে সব বিভাগে ন্যূনতম জিপিএ বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। জিপিএ বাড়ালে শিক্ষার্থীদের মান বিবেচনায় সুবিধা হতে পারে, তবে আসন খালি থাকার আশঙ্কাও রয়েছে। অন্যদিকে, জিপিএ কম থাকলে এলাকার অধিকসংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ পায়। আগামী শিক্ষাবর্ষের আগে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. শহিদুল্লাহ বলেন, ভর্তি বিজ্ঞপ্তিতে ন্যূনতম জিপিএ উল্লেখ করা প্রয়োজন এবং নীতিমালাতেও এ বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে। ভালুকা সরকারি কলেজের বিজ্ঞপ্তিতে তা উল্লেখ না করা হয়ে থাকলে সেটি ভুল হয়েছে। তবে অনলাইন ভর্তি ব্যবস্থায় নির্ধারিত জিপিএর নিচে থাকা শিক্ষার্থীদের আবেদনের সুযোগ নেই বলে জানান তিনি।
ভর্তি ফি নিয়ে প্রশ্ন: কলেজের ভর্তি বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির ফি ৪ হাজার ৩৩০ টাকা। অন্যদিকে, ত্রিশালের সরকারি নজরুল কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ৩ হাজার ৫০০ টাকা এবং মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ৩ হাজার ১০০ টাকা নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। সে হিসাবে ভালুকা সরকারি কলেজের ভর্তি ফি বিজ্ঞান বিভাগের তুলনায় ৮৩০ টাকা এবং মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের তুলনায় ১ হাজার ২৩০ টাকা বেশি। তবে দুই কলেজের ফি নির্ধারণের খাত ও অন্যান্য চার্জের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ পাওয়া যায়নি। ফলে এই পার্থক্যের কারণ এবং ফি নির্ধারণে প্রযোজ্য নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এ বিষয়ে কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক আনম শাহাদাৎ হোসেন বলেন, বিস্তারিত তথ্য ভর্তি কমিটি ও উপাধ্যক্ষের কাছ থেকে নেওয়া যেতে পারে। তার দাবি, ভর্তি বাবদ নেওয়া অর্থ ব্যাংকের মাধ্যমে জমা হয় এবং কলেজ কর্তৃপক্ষ ব্যক্তিগতভাবে ওই অর্থের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখে না।
শিক্ষক ও অবকাঠামোগত সংকট: কলেজ কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, একাদশ শ্রেণিতে অনুমোদিত আসনসংখ্যা ১ হাজার ১০০। বর্তমানে সরকারি শিক্ষক রয়েছেন প্রায় ২৪ থেকে ৩০ জন। অতিথি ও খণ্ডকালীন শিক্ষক যুক্ত করলে এ সংখ্যা প্রায় ৩৫ জনে দাঁড়ায়। পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, অফিস সুবিধা ও প্রশাসনিক জনবলের ঘাটতির কথাও স্বীকার করেছেন অধ্যক্ষ। অধ্যাপক আনম শাহাদাৎ হোসেন বলেন, শিক্ষক সংকটের বিষয়টি জানিয়ে নিয়মিত সংশ্লিষ্ট দপ্তরে তালিকা ও চিঠি পাঠানো হচ্ছে। কলেজটি সরকারি হওয়ার পর ধীরে ধীরে ক্যাডার শিক্ষক দেওয়া শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকজন শিক্ষক পাওয়া গেছে এবং আরও শিক্ষক দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। তিনি বলেন, পাঠদান চালু রাখতে সরকারি শিক্ষকদের পাশাপাশি অতিথি ও খণ্ডকালীন শিক্ষক দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। নতুন সরকারি হওয়া অনেক কলেজেই শিক্ষক ও জনবল সংকট রয়েছে। এটি জাতীয় পর্যায়ের সমস্যা, যার সমাধানে মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। অধ্যক্ষ আরও জানান, কলেজের শিক্ষক সরকারি হলেও সব কর্মচারী এখনও সরকারি কাঠামোর আওতায় আসেননি। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। পর্যাপ্ত অফিসকক্ষ ও প্রশাসনিক কর্মচারী না থাকায় শিক্ষকদেরই বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজ সামলাতে হচ্ছে। কলেজে আবাসিক হোস্টেলও নেই। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কলেজে নিয়মিত ক্লাস না হওয়ার অভিযোগ সংক্রান্ত একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। এ বিষয়ে অধ্যক্ষ বলেন, শিক্ষক ও শ্রেণিকক্ষের সংকট রয়েছে। তবে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ নিয়মিত ক্লাসে আসে না বলেও দাবি করেন তিনি।
আসনসংখ্যা ও নতুন কোর্স নিয়ে উদ্বেগ: শিক্ষক ও শ্রেণিকক্ষের ঘাটতির মধ্যে ১ হাজার ১০০ আসন নির্ধারণের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিভাবকরা। তাদের মতে, আসনসংখ্যা নির্ধারণের ক্ষেত্রে শিক্ষক, শ্রেণিকক্ষের ধারণক্ষমতা, বিভাগভিত্তিক চাহিদা ও প্রশাসনিক সক্ষমতা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. শহিদুল্লাহ বলেন, আসনসংখ্যা বাড়ানো বা কমানোর ক্ষেত্রে শিক্ষক, শ্রেণিকক্ষ ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বিবেচনা করা উচিত। অতীতে বিভিন্ন সময়ে কলেজগুলোর আসনসংখ্যা বাড়ানো হয়ে থাকতে পারে। বর্তমানে আসন সমন্বয়ের বিষয়টি নিয়ে কাজ চলছে। শিক্ষক ও শ্রেণিকক্ষের সংকটের কথা উল্লেখ করে কোনো কলেজ আসন কমানোর আবেদন করলে তা বিবেচনা করা যেতে পারে। ভালুকা সরকারি কলেজের পক্ষ থেকে এ ধরনের আবেদন এসেছে কি না, তা খোঁজ নিয়ে দেখবেন বলেও জানান তিনি। এদিকে কলেজটিতে নতুন কয়েকটি বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) কোর্স চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন অধ্যক্ষ। তবে নতুন কোর্স চালু হলে প্রয়োজনীয় শিক্ষক, শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষা-উপকরণ কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অধ্যক্ষ জানান, শিক্ষক নিয়োগ ও প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।