Print Date & Time : 21 October 2026 Wednesday 11:43 pm

ইউক্রেনকে পেছনে ফেলে বিশ্বে খেলাপি ঋণে শীর্ষে বাংলাদেশ

image

অনলাইন ডেস্ক: বাংলাদেশে এখন প্রতি ১০০ টাকা ঋণের প্রায় ৩৩ টাকাই খেলাপি। আর এর মাধ্যমে খেলাপি ঋণের হারের দিক থেকে বিশ্বে শীর্ষে চলে এসেছে বাংলাদেশে। এরপরই রয়েছে চাদ, ইকুয়েটোরিয়াল গিনি, আলজেরিয়া ও ঘানা।

এর আগে, বিশ্বে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণের দেশ ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেন। পরে পুরোনো খেলাপি ঋণ অবলোপন, ঋণ আদায় ও ভালো মানের নতুন ঋণ বাড়ানোর মাধ্যমে দেশটি এই হার দ্রুত কমিয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে আগে আড়ালে থাকা অনিয়মিত ও বেনামি ঋণ খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হওয়ায় প্রকৃত চিত্র প্রকাশ পেয়েছে। ফলে ইউক্রেন তালিকার বাইরে চলে গেছে এবং বাংলাদেশ উঠে এসেছে শীর্ষে।

১. বাংলাদেশ: খেলাপি ঋণ ৩২.৭৮%
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ২০২৬ সালের জুন শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। এটি ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ।

২০২৬ সালের মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। পরের তিন মাসেই তা ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা বেড়েছে। এর আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণ রেকর্ড ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকায় উঠেছিল।

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এই খেলাপি ঋণের বড় অংশ হঠাৎ সৃষ্টি হয়নি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দীর্ঘদিন ধরে ঋণ পুনঃতফসিল, বিশেষ ছাড় ও হিসাবগত পরিবর্তনের মাধ্যমে অনেক সমস্যাগ্রস্ত ঋণ নিয়মিত দেখানো হয়েছিল।

রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান পর্যালোচনা এবং দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষায় অনিয়ম, জালিয়াতি ও বেনামি ঋণের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে এসেছে। ফলে আগে আড়ালে থাকা বিপুল ঋণ এখন খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।

২. চাদ: খেলাপি ঋণ ৩১.৫১%
মধ্য আফ্রিকার দেশ চাদে খেলাপি ঋণের সর্বশেষ প্রাপ্ত হার ৩১ দশমিক ৫১ শতাংশ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ফাইন্যান্সিয়াল সাউন্ডনেস ইন্ডিকেটরস ডেটাবেজে থাকা প্রতিটি দেশের সর্বশেষ তথ্য তুলনা করলে এটি বাংলাদেশের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। তবে দেশটির এ তথ্য ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের। পরে দেশটি আর আইএমএফের এই সূচকে নতুন তথ্য দেয়নি।

৩. ইকুয়েটোরিয়াল গিনি: খেলাপি ঋণ ৩০%
তালিকার তৃতীয় স্থানে রয়েছে মধ্য আফ্রিকার আরেক দেশ ইকুয়েটোরিয়াল গিনি। আফ্রিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশটির ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার এখন ৩০ শতাংশ। ২০২৩ সালে এ হার ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ ছিল।

৪. আলজেরিয়া: খেলাপি ঋণের হার ২০.০৫%
উত্তর আফ্রিকার দেশ আলজেরিয়ায় ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের হার ছিল ২০ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। আইএমএফে প্রকাশিত দেশগুলোর সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য তুলনা করলে এটি চতুর্থ সর্বোচ্চ।

৫. ঘানা: খেলাপির হার ১৮.১১%
তালিকার পঞ্চম স্থানে রয়েছে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ ঘানা। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে দেশটির ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল ১৮ দশমিক ১১ শতাংশ। ২০২৩ সালে ঘানার খেলাপি ঋণের হার ছিল ২০ দশমিক ৬ শতাংশ।

এর আগে শীর্ষে ছিল ইউক্রেন
খেলাপি ঋণের তালিকায় দীর্ঘ সময় ধরে শীর্ষে ছিল ইউক্রেন। ২০২৩ সালের দেশটির খেলাপি ঋণের হার ছিল ৩৭ দশমিক ৪ শতাংশ। রাশিয়ার হামলার পরে অর্থনৈতিক ধাক্কায় তা প্রায় ৩৯ শতাংশে উঠেছিল।

তবে ২০২৪ সাল থেকে ইউক্রেনের ঋণ পরিস্থিতির উন্নতি হতে শুরু করে। ঋণ আদায়, পুনর্গঠন এবং তুলনামূলক ভালো মানের নতুন ঋণ বিতরণ বাড়ায় মোট ঋণের বিপরীতে খেলাপি ঋণের অনুপাত কমেছে। ইউক্রেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশটির ব্যাংক খাতে মোট ঋণ ১০ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছিল। একই সময়ে খেলাপি ঋণের হার নেমে আসে ২৭ শতাংশে।

বড় পরিবর্তনটি ঘটে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে। ইউক্রেনের সবচেয়ে বড় ব্যাংক প্রিভাতব্যাংকসহ কয়েকটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক বিপুল পরিমাণ পুরোনো খেলাপি ঋণ হিসাব থেকে অবলোপন করে। এর ফলে ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর ইউক্রেনের পুরো ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ২৩ দশমিক ৯১ শতাংশ থাকলেও ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি তা কমে ১৩ দশমিক ৯২ শতাংশে নেমে আসে।

তবে অবলোপনের অর্থ এসব ঋণ মাফ করে দেওয়া নয়। ঋণগুলো আগেই শতভাগ সঞ্চিতি দিয়ে সংরক্ষিত ছিল। অবলোপনের পর সেগুলো ব্যাংকের মূল ব্যালান্স শিট বা স্থিতিপত্র থেকে সরিয়ে বাইরের হিসাবে নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ঋণগ্রহীতাদের কাছে পাওনা আদায়ের অধিকার ব্যাংকের রয়েছে। প্রিভাতব্যাংক এসব অর্থ উদ্ধারে ইউক্রেনের পাশাপাশি লন্ডন, সাইপ্রাস ও ইসরায়েলে আইনি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

এরপরও ইউক্রেনে খেলাপি ঋণ কমার ধারা অব্যাহত রয়েছে। ইউক্রেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জুলাই দেশটির ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার আরও কমে ১২ দশমিক ৫ শতাংশে নেমেছে। প্রায় ১৭ বছরের মধ্যে এটি সর্বনিম্ন। ফলে দেশটি এখন সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণের পাঁচ দেশের তালিকার অনেক বাইরে।

বাংলাদেশ যেভাবে শীর্ষে উঠল
ইউক্রেন ও বাংলাদেশের গতিপথ প্রায় বিপরীত। ইউক্রেন পুরোনো ও সম্পূর্ণ সঞ্চিতি রাখা খেলাপি ঋণ ব্যালান্স শিট থেকে অবলোপন করেছে, ঋণ আদায় ও পুনর্গঠন করেছে এবং ভালো মানের নতুন ঋণ বাড়িয়েছে। এতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ও অনুপাত—দুটিই কমেছে।

বাংলাদেশে ঘটেছে উল্টোটি। ২০২৪ সালের জুনে দেশের ব্যাংক খাতে আনুষ্ঠানিকভাবে খেলাপি ঋণ ছিল ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। দুই বছরের মধ্যে তা বেড়ে ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। তবে এমন নয় যে পুরো খেলাপি ঋণ এই সময়ের মধ্যেই নতুন করে সৃষ্টি হয়েছে। বরং দীর্ঘদিন ধরে পুনঃ তফসিল, বিশেষ ছাড় ও হিসাবগত কৌশলে আড়াল করে রাখা বিপুল সমস্যাগ্রস্ত ঋণ এখন খেলাপি হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে।

—জা.অর্থনীতি/আইবিএম