Print Date & Time : 22 October 2026 Thursday 05:05 am

ডলারের বাজারে অস্থিরতার দায় মানি চেঞ্জারদের নয়: এমসিএবি

image

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক: বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে মানি চেঞ্জাররা এখনো বৈষম্যমূলক ও বিমাতাসুলভ আচরণের শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছে মানি চেঞ্জার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এমসিএবি)। 

সংগঠনটির নেতারা বলেছেন, বৈদেশিক মুদ্রার বাজার নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা মানি চেঞ্জারদের নেই। অথচ বাজারে অস্থিরতা দেখা দিলেই তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়।

সোমবার (২৪ আগস্ট) এক জরুরি মতবিনিময় সভায় এসব অভিযোগ করেন এমসিএবির সভাপতি এমএস জামান ও মহাসচিব প্রকৌশলী গৌতম দে।

সভায় এমএস জামান বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে আমরা এখনো বিমাতাসুলভ আচরণ পাচ্ছি। যে বৈষম্যের বিরুদ্ধে এত সংগ্রাম হয়েছে, সেই বৈষম্য এখনো রয়ে গেছে।’

তিনি বলেন, মানি চেঞ্জারদের জন্য এমন নিয়ম করা হয়েছে যে তারা ইনকামিং যাত্রীদের কাছ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা কিনবেন এবং আউটগোয়িং যাত্রীদের কাছে তা বিক্রি করবেন। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে তাদের কোনো বৈদেশিক মুদ্রা সরবরাহ করা হয় না। ফলে তাদের ব্যবসার অন্যতম প্রধান উৎস হলো বিদেশফেরত প্রবাসী ও বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের নিয়ে আসা নগদ বৈদেশিক মুদ্রা।

জুলাইয়ে এডিপি বাস্তবায়ন ১ শতাংশের কম

এমএস জামান বলেন, রেমিট্যান্স মূলত ইলেকট্রনিক বা ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশে আসে। আর মানি চেঞ্জারদের ব্যবসার মূল ক্ষেত্র হলো নগদ বৈদেশিক মুদ্রা। বিভিন্ন দেশে বৈদেশিক মুদ্রা বহনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সীমা থাকলেও প্রবাসীরা নিয়ম মেনে দেশে নগদ অর্থ নিয়ে আসেন এবং মানি চেঞ্জাররা তা ক্রয়-বিক্রয় করেন।

তার অভিযোগ, বাজারে অস্থিরতা তৈরি হলেই বাংলাদেশ ব্যাংক মানি চেঞ্জারদের দায়ী করে। ‘আমাদের দাগ নম্বর, খতিয়ান নম্বর, মৌজা নম্বর—সবই বাংলাদেশ ব্যাংকের জানা। বাজার অস্থিতিশীল হলেই আমাদের ওপর চাপ আসে। অথচ বৈদেশিক মুদ্রার বাজার নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা আমাদের নেই। 

তিনি বলেন, মুদ্রার বিনিময় হার, মুদ্রানীতি, মূল্যস্ফীতি ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকৌশল নির্ধারণের মূল দায়িত্ব কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। তাই ডলারের বাজারে বড় ধরনের ওঠানামার দায় শুধু মানি চেঞ্জারদের ওপর চাপানো যুক্তিসংগত নয়।

এমসিএবি সভাপতি আরও বলেন, বর্তমান প্রযুক্তির যুগে বিদেশে থাকা বাংলাদেশিরা আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের দর সম্পর্কে সহজেই জানতে পারেন। ফলে তারা তাদের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা কম দামে বিক্রি করতে চাইবেন—এমনটা আশা করা বাস্তবসম্মত নয়।

২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা অর্ধেকে নামাতে চায় সরকার

তিনি অভিযোগ করেন, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক আন্তঃব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনেছে এবং আবার বিভিন্ন ব্যাংকের কাছে ডলার বিক্রিও করেছে। অথচ মানি চেঞ্জারদের ক্ষেত্রে একই ধরনের সহযোগিতা বা সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২৪ আগস্ট ডলারের আন্তঃব্যাংক দর ছিল ১২২ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ১২২ টাকা ৫৮ পয়সার মধ্যে এবং ভারিত গড় দর ছিল ১২২ টাকা ৫২৭ পয়সা।

অন্যদিকে, এমসিএবির মহাসচিব প্রকৌশলী গৌতম দে বলেন, ডলারের দর ১২৮ টাকা ১০ পয়সা পর্যন্ত ওঠার পর মানি চেঞ্জারদের ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের চাপ শুরু হয়। লাইসেন্স বাতিলসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি।

তিনি বলেন, মানি চেঞ্জারদের সঙ্গে আলোচনা করে সংগঠনটি ডলারের নগদ ক্রয়মূল্য ১২৫ টাকা ১৮ আনা এবং বিক্রয়মূল্য ১২৬ টাকা ১৮ আনা নির্ধারণ করেছে। গত পাঁচ দিন ধরে সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলো এই সীমার মধ্যেই লেনদেন করছে বলে দাবি করেন তিনি।

গৌতম দে বলেন, ‘১২৮ টাকা ১০ পয়সা সৃষ্টিকারী কারা, রাষ্ট্রকে তা খুঁজে বের করতে হবে। মানি চেঞ্জার প্রতিষ্ঠানগুলো ঘোষণা দিয়ে নির্ধারিত দর অনুসরণ করছে।’

চালু হতে পারে ষষ্ঠ থেকে স্নাতক পর্যন্ত মেয়েদের উপবৃত্তি

তিনি আরও বলেন, এমসিএবির ওয়েবসাইটে রেট পোর্টাল সবার জন্য উন্মুক্ত। কোনো লাইসেন্সধারী মানি চেঞ্জারের রেট বোর্ডে ১২৮ টাকা বা ১২৮ টাকা ৪৪ পয়সা দর পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান তিনি।

মানি চেঞ্জারদের ওপর ‘চোরাকারবারি’ ধরনের নেতিবাচক তকমা দেওয়ার সমালোচনা করে গৌতম দে বলেন, ব্যাংক ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারাও প্রয়োজনে মানি চেঞ্জারদের কাছ থেকে নগদ ডলার এনডোর্স করান। অথচ বাজারে অস্থিরতা তৈরি হলে দায় চাপানো হয় মানি চেঞ্জারদের ওপর।

তিনি বলেন, ব্যাংকগুলো রেমিট্যান্সের দর এবং এলসি খোলার ক্ষেত্রে ডলারের দর নির্ধারণে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে কোথায় কী ধরনের লেনদেন হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

এমসিএবি মহাসচিব বলেন, গত দুই বছর ধরে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে একটি মনিটরিং টিম গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হলেও তা গ্রহণ করা হয়নি। সংগঠনটির প্রস্তাব অনুযায়ী, মানি চেঞ্জারদের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করে একটি মনিটরিং টিম গঠন করা হলে বাজারে অনিয়ম হলে তা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে।

তার দাবি, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় লাইসেন্সধারী মানি চেঞ্জারদের বাইরে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেন হচ্ছে। গুলশানসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক এলাকায় এসব লেনদেন কারা করছে, তা বাংলাদেশ ব্যাংক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর জানা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে চাপ তৈরি হওয়ার বিষয়টি নিয়ে ব্যাংকারদের মধ্যেও আলোচনা রয়েছে। জুলাইয়ের শেষ দিকে বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে ডলার কেনার ক্ষেত্রে একটি অনানুষ্ঠানিক সীমার মধ্যে থাকার নির্দেশনা দিয়েছিল বলে সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

ছয় মাসে কাজ হারিয়েছেন ৬২ হাজার মানুষ: ড. দেবপ্রিয়

গৌতম দে বলেন, মানি চেঞ্জাররা ডলারের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে—এমন ধারণা সঠিক নয়। তাদের মূলধন ও লেনদেনের সক্ষমতা ব্যাংকের তুলনায় অত্যন্ত সীমিত। বরং নগদ বৈদেশিক মুদ্রার বাজারকে আনুষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে রাখার ক্ষেত্রে মানি চেঞ্জারদের আরও কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করা উচিত।

তিনি বলেন, ‘আমরা চাই রাষ্ট্রকে কলঙ্কমুক্ত রাখতে। বাজারে যারা কারসাজি করছে তাদের চিহ্নিত করা হোক।’

সভায় এমসিএবির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংকগুলোর কাছে থাকা নগদ ডলারের একটি অংশ নির্ধারিত দরে লাইসেন্সধারী মানি চেঞ্জারদের সরবরাহের ব্যবস্থা করা হোক।

এ বিষয়ে গৌতম দে বলেন, কোনো মানি চেঞ্জার যদি এক দিনে ১০ হাজার ডলার বিক্রি করতে সক্ষম হয় এবং তার লেনদেনের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দিতে পারে, তাহলে চাহিদা অনুযায়ী আবারও ডলার সরবরাহ করা যেতে পারে। এতে রাষ্ট্রের বৈদেশিক মুদ্রা রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার মধ্যেই থাকবে এবং বৈধ চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে।

এমসিএবি নেতাদের দাবি, বাজারভিত্তিক বিনিময় হার ব্যবস্থা কার্যকর করতে হলে শুধু ব্যাংক নয়, বৈদেশিক মুদ্রার নগদ বাজারের বৈধ অংশীদার মানি চেঞ্জারদেরও নীতিনির্ধারণ ও বাজার পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থায় যুক্ত করতে হবে।

—জা. অর্থনীতি/এনজে