শেরপুর প্রতিনিধি: ময়মনসিংহ বিভাগের বিস্তীর্ণ গারো পাহাড়ি অঞ্চলে বিচরণ রয়েছে বন্যহাতির। বন্যহাতির আক্রমণে নষ্ট হচ্ছে ফসল, আহত ও নিহত হচ্ছে মানুষ। আবার ফসল ও জানমাল রক্ষায় মানুষের পাতা বৈদ্যুতিক তারে জড়িয়ে মারা পড়ছে হাতি। গারো পাহাড়ে হাতি-মানুষের এই দ্বন্দ্ব আজকের নয়। দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে হাতি ও মানুষের মধ্যে সংঘাত চললেও আজও হয়নি স্থায়ী সমাধান।
১৯৯৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত সীমান্তবর্তী শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ী, শ্রীবরদী ও ঝিনাইগাতী উপজেলার পাহাড়ি এলাকায় বন্যহাতির তাণ্ডব বেড়েই চলেছে। ৩১ বছরে ২৫-৩০টি হাতির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় দুই শতাধিক। হাতিগুলো একসময় পাহাড়ে থাকলেও এখন প্রতিনিয়ত লোকালয়ে চলে আসছে। হাতির পায়ের তলায় বলি দিতে হচ্ছে স্থানীয়দের উৎপাদিত ধান, সবজিসহ নানা ধরনের ফসল।
তবে সমস্যার এই হাতিকেই সম্পদে রূপান্তরের সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এই হাতির মাঝেই লুকিয়ে আছে অপার সম্ভাবনা। সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি বন্যহাতিকে ঘিরে অর্থনৈতিক উন্নয়নও সম্ভব।
হাতি তৃণভোজী প্রাণীদের মধ্যে সবচেয়ে বড়। একটি হাতি দিনে প্রায় ১৫০ কেজি ঘাস এবং ১৯০ লিটার পানি পান করে। এ কারণে খাদ্য ও পানির সন্ধানে হাতিকে বড় একটি এলাকায় বিচরণ করতে হয়। হাতিকে রক্ষা করা না গেলে ধীর প্রজননশীল এই প্রাণীটির অস্তিত্ব একসময় বিলীন হয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অনেকের মতে, গারো পাহাড় সীমান্তে অবস্থানরত দলবদ্ধ হাতিগুলোকে একটি সীমানাপ্রাচীরের মধ্যে রেখে সরকারি উদ্যোগে খাবার ও পানির ব্যবস্থা করা হলে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব। পাশাপাশি স্থানীয় কৃষকেরা জমিতে উৎপাদিত ফসলের শতভাগ ঘরে তুলতে পারবেন।
পাহাড়ি অঞ্চলে থাকা খাস ও বন বিভাগের জমিতে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করা হলে একদিকে যেমন হাতি-মানুষের সংঘাত কমবে, অন্যদিকে তৈরি হবে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা।
বিস্তীর্ণ এলাকা ঘিরে দেয়াল নির্মাণের পাশাপাশি প্রবেশপথ ও পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলা যেতে পারে। এমন পরিবেশ তৈরি করা গেলে দূর-দূরান্ত থেকে হাতি দেখতে গারো পাহাড়ে আসবেন প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসুরা।
দর্শনার্থীদের জন্য হাতিবেষ্টিত এলাকায় সরকারি ইজারার মাধ্যমে নির্ধারিত প্রবেশমূল্য চালু করা যেতে পারে। পাশাপাশি হাতির রক্ষণাবেক্ষণে লোকবল নিয়োগ করা হলে একদিকে যেমন রাজস্ব আয় হবে, অন্যদিকে সৃষ্টি হবে নতুন কর্মসংস্থান। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করা গেলে স্থানীয় সমস্যা সমাধান, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধির পাশাপাশি বছরের পর বছর ধরে চলা হাতি-মানুষের সংঘাতেও টানা যেতে পারে ইতি।
তবে এই পরিকল্পনাকে সংশ্লিষ্ট অনেকেই কার্যকরী ব্যবস্থা মনে করছেন না। শুধু তাই নয় এটা বাস্তবায়নে প্রচুর পরিমান অর্থের বরাদ্দ প্রয়োজন, যা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্তি নিয়েও রয়েছে ধোঁয়াশা।
বন্য হাতির আক্রমণকবলিত এলাকার বাসিন্দা রবিউল ইসলাম মন্ডল বলেন, জনগণের জানমাল ও ফসল রক্ষার্থে গারো পাহাড় অঞ্চলের বন্য হাতিগুলোকে বন বিভাগের জমিতে অভয়ারণ্য পদ্ধতিতে সীমানা থেকে এক-দের কিলোমিটার দূরে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া যেতে পারে। এর জন্য বিস্তীর্ণ জায়গার প্রয়োজন, যাতে হাতির চলাচল ও খাদ্য সংগ্রহে বাধা সৃষ্টি না হয়। প্রয়োজনে বনায়নের জন্য আঞ্চলিক মানুষ নিয়োগ করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও নির্দিষ্ট দূরত্বে পর্যটকেরা যেন হাতি দেখতে পারেন,সে জন্য টাওয়ার নির্মাণ করা যেতে পারে। টাওয়ারে উঠে হাতির সৌন্দর্য উপভোগের জন্য সরকার নির্ধারিত ফি চালু করলে আরও ভালো হবে। এতে একদিকে যেমন হাতি-মানুষের দ্বন্দ্বের অবসান হবে, অন্যদিকে সরকারি রাজস্বে বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা হবে।
কারিতাসের হাতি নিরাপত্তা কমিটির সদস্য সামুয়েল চাম্বুগং বলেন, ‘বিস্তীর্ণ বনভূমিতে হাতির জন্য অভয়ারণ্য তৈরি করা গেলে মানুষ ও হাতি—উভয়েরই কল্যাণ হবে। তবে অভয়ারণ্যে পর্যাপ্ত খাবারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। হাতির খাবার উপযোগী গাছপালা বেশি করে রোপণ করতে হবে। পর্যাপ্ত খাদ্য ও চলাচলের জায়গা রেখে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া গেলে মানুষ-হাতির দ্বন্দ্ব কমানো সম্ভব।’
ময়মনসিংহ বনবিভাগের মধুটিলা রেঞ্জ কর্মকর্তা দেওয়ান আলী বলেন, ‘হাতির জন্য অভয়ারণ্যের প্রস্তাব আমরা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়েছি। এটার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তবে অভয়ারণ্য এলাকাকে পর্যটনশিল্পে নিয়ে যাওয়া মনে হয় না ইতিবাচক হবে, কারণ সেটা করলে পর্যটকরা হাতিকে বিরক্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে। এ বিষয়ে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ভালো বলতে পারবেন।’
শেরপুর জেলা বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ বিভাগ জানায়, ময়মনসিংহের গারো পাহাড়ে ২০১৪ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত হাতির আক্রমণে ৪২ জন মানুষ মারা গেছেন। আহত হয়েছেন কয়েক’শ মানুষ। একই সময়ে বিভিন্ন কারণে ৩৩টি বন্যহাতির মৃত্যু হয়েছে।
এ বিষয়ে হালনাগাদ তথ্য জানতে শেরপুর বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কাজী মুহাম্মদ নূরুল করিমকে ফোন দিলে তিনি বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা সুমন সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। সুমন সরকারের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন দিলেও রিসিভ করেননি তিনি।
বন বিভাগ জানায়, হাতি-মানুষের দ্বন্দ্বে জানমালের ক্ষতি কমিয়ে আনতে নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছে তারা। ১০ জন করে সদস্য নিয়ে ২৫টি এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম (ইআরটি) গঠন করেছে বন বিভাগ। হাতির আক্রমণে কেউ নিহত হলে ৩ লাখ, আহত হলে ১ লাখ এবং ফসল নষ্ট হলে ৫০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়।
বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু ক্ষতিপূরণ দিয়ে এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের সমাধান সম্ভব নয়। হাতির আবাসস্থল পুনরুদ্ধার, পর্যাপ্ত খাবার ও পানির ব্যবস্থা, নিরাপদ বিচরণক্ষেত্র এবং স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেই স্থায়ী সমাধানের দিকে এগোতে হবে। আর সেই সংরক্ষণব্যবস্থার সঙ্গে পরিবেশবান্ধব পর্যটন ও স্থানীয় অর্থনীতিকে যুক্ত করা গেলে ‘সমস্যার হাতি’ই হয়ে উঠতে পারে সম্ভাবনার নতুন দ্বার।