Print Date & Time : 07 November 2026 Saturday 02:55 pm

সব কেড়ে নিলেও ঠোঁট নড়ছিল সেই একটি শব্দে

image

দুপুরের মক্কা। সূর্য যেন আগুন ঢালছে আকাশ থেকে। উত্তপ্ত বালুর ওপর শুইয়ে রাখা হয়েছে এক হাবশি ক্রীতদাসকে। তার মালিক উমাইয়া ইবনে খালাফের নির্দেশে চলছে অমানুষিক নির্যাতন শুধু একটি অপরাধে, তিনি ঘোষণা করেছেন, আমার রব আল্লাহ।

নির্যাতনকারীরা শর্ত দিল লাত-উজ্জার নাম নিলেই মিলবে মুক্তি। জ্বলন্ত শরীর, ফেটে যাওয়া ঠোঁট তবু সেই ঠোঁট নড়ে উঠল একটিই শব্দে আহাদ! আহাদ! আল্লাহ এক! আল্লাহ এক! তিনি বিলাল ইবনে রাবাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু।

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণ ঘোষণাকারী প্রথম সাতজনের একজন ছিলেন বিলাল। মুশরিকরা তাঁদের লোহার বর্ম পরিয়ে কাঠফাটা রোদে ফেলে রাখত নির্যাতনের জন্য। অন্যদের কোনো না কোনো গোত্র বা পরিবারের সুরক্ষা ছিল, কিন্তু বিলালের পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ ছিল না। শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তিনি সব নির্যাতন তুচ্ছ জ্ঞান করে নিয়েছিলেন।

নির্যাতন যখন চরমে পৌঁছাল, তখন তাঁকে তুলে দেওয়া হলো শিশু-কিশোরদের হাতে। তারা তাঁকে মক্কার অলিগলিতে টেনে বেড়াত, আর তিনি অবিচল কণ্ঠে বলতেই থাকতেন: আহাদ! আহাদ! (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ১৫০)

সিরাতগ্রন্থগুলোতে, বিশেষত ইবনে হিশামের বর্ণনায় আরও এসেছে তাঁর বুকের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হতো বিশাল পাথর। এই বিবরণটি ঐতিহাসিক সূত্র হিসেবেই উল্লেখযোগ্য। এই অসহনীয় নির্যাতনের শেষে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে কিনে নিয়ে মুক্ত করে দেন।

তারপর ইতিহাস রচনা করল এক মধুর প্রতিদান। যে কণ্ঠকে মক্কার নির্যাতনকারীদের চাবুক স্তব্ধ করতে পারেনি, সেই কণ্ঠই হয়ে উঠল ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জিনের কণ্ঠ। যে মানুষটিকে একদিন বালুতে টেনে-হিঁচড়ে অপমান করা হয়েছিল, মক্কা বিজয়ের দিন তিনিই কাবার ছাদে দাঁড়িয়ে দিলেন আজান।

আমাদের ঈমানের পরীক্ষা হয়তো আজ জ্বলন্ত বালুতে হয় না। আমাদের পরীক্ষা হয় অফিসে, বন্ধুমহলে, সোশ্যাল মিডিয়ায় যেখানে দ্বীন মেনে চলতে গেলে কখনো উপহাস শুনতে হয়, কখনো সুবিধা হারাতে হয়। বিলাল রাদিয়াল্লাহু আনহু আমাদের শিখিয়ে গেছেন পরিচয়, পদমর্যাদা, অর্থ সবকিছু কেড়ে নেওয়া যায়; কিন্তু আহাদ বলা অন্তরকে কেউ কখনো পরাজিত করতে পারে না।

হে আল্লাহ, আমাদের ঈমানকে বিলালের ঈমানের মতো অটল করে দিন যাকে কোনো লোভ কিনতে পারে না, কোনো ভয় ভাঙতে পারে না। আমিন।