Print Date & Time : 21 October 2026 Wednesday 10:05 am

বন্দর-কাস্টমসের জট কাটাতে যৌথ কমিটি, সময় বেঁধে দিলেন অর্থমন্ত্রী

image

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম: ব্যবসা-বাণিজ্যের বাধা দূর করে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম আরও সহজ, দ্রুত ও ব্যয় সাশ্রয়ী করতে চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টমসের মধ্যে সমন্বয় জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে বন্দর ও কাস্টমসের সমন্বয়ে একটি যৌথ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। একই সঙ্গে দুই প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে প্রতিটির সমাধান নির্ধারণ এবং তা বাস্তবায়নের সময়সীমাও বেঁধে দেওয়া হয়েছে।

চট্টগ্রামের স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে বন্দর ভবনে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষে এসব তথ্য জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বৈঠকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানসহ বন্দর, কাস্টমস ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর সরকার প্রথমে ভঙ্গুর অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার উদ্যোগ নিয়েছে। এখন লক্ষ্য অর্থনীতিকে ‘টেক অফ’ করানো। এ জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রপ্তানি বাড়ানো, শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করা এবং ব্যবসার পরিবেশ সহজ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, ব্যবসার ক্ষেত্রে অতীতে তৈরি হওয়া বিভিন্ন রেগুলেশন ও জটিলতা দূর করতে ডিরেগুলেশনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রামের এই বৈঠকও সেই প্রক্রিয়ার অংশ। ব্যবসায়ীরা যাতে কোনো অপ্রয়োজনীয় বাধা ছাড়াই কাজ করতে পারেন, সে ব্যবস্থা করা হলে তাদের খরচ কমবে এবং অর্থনীতিতে এর সরাসরি প্রভাব পড়বে।

পোর্ট-কাস্টমসের সমন্বয়হীনতায় বাড়ছে পণ্যের দাম
অর্থমন্ত্রী বলেন, সাধারণ মানুষের উচ্চ দ্রব্যমূল্যের অন্যতম কারণ পোর্টে অতিরিক্ত খরচ এবং কাস্টমসের দীর্ঘসূত্রিতা। পণ্য খালাসে সময় বেশি লাগলে ব্যবসায়ীদের খরচ বাড়ে। সেই বাড়তি খরচ শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামের ওপর গিয়ে পড়ে।

তিনি বলেন, বৈঠকে এনবিআর ও বন্দর কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে প্রতিটি সমস্যা চিহ্নিত করা হয়েছে। শুধু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি, কোন সিদ্ধান্ত কত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করতে হবে, সেটিও লিখিতভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী জানান, বন্দর ও কাস্টমস যাতে সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারে, সে জন্য যৌথ কমিটি গঠন করা হচ্ছে। উদ্ভূত সমস্যা দ্রুত সমাধানের পাশাপাশি দুই প্রতিষ্ঠানের কাজের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোই হবে এই কমিটির অন্যতম লক্ষ্য।

তার মতে, দ্রুত পণ্য খালাস ও রপ্তানি সম্পন্ন করা গেলে ব্যবসায়ীদের পরিচালন ব্যয় কমবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে। এতে বিদেশি বিনিয়োগকারী ও আমদানিকারকদের কাছে বাংলাদেশের প্রতি আস্থাও বাড়বে।

২০৩৪ সালের ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য
আমির খসরু বলেন, সাপ্লাই চেইন বাধাগ্রস্ত হলে কিংবা বন্দরে খরচ বেড়ে গেলে এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপর পড়ে। তাই বন্দর ও কাস্টমসের দক্ষতা বাড়িয়ে খরচ কমানোকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের সঙ্গেও যুক্ত করে দেখছে সরকার।

আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়া দ্রুত ও ব্যয় সাশ্রয়ী হলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর মাধ্যমে ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছানোর পথও সহজ হবে।

১০ হাজার কনটেইনার নিলাম, খালি কনটেইনার সরানোর উদ্যোগ
বৈঠকে বন্দরে দীর্ঘদিন পড়ে থাকা পণ্য ও কনটেইনার নিয়েও আলোচনা হয়েছে। চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক জানান, বন্দরে পড়ে থাকা প্রায় ১০ হাজার কনটেইনারের নিলাম প্রক্রিয়া দ্রুত করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি খালি কনটেইনার দ্রুত বন্দর থেকে বের করে দেওয়ার বিষয়েও সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

কাস্টমস ও বন্দরের কার্যক্রম অনলাইন ও সিঙ্গেল উইন্ডোর আওতায় এনে পেপারলেস ডকুমেন্টেশনের বিষয়েও সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে আইসিডি পরিচালনার নীতিমালা সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে দ্রুত অনুমতি নিয়ে নতুন প্রতিষ্ঠানও আইসিডি সেবা দিতে পারবে। বন্ডের আওতায় এক্সপোর্ট আইসিডির সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।

প্রতিদিনের সমস্যা প্রতিদিন সমাধানের দাবি
চট্টগ্রাম কাস্টমস সিএন্ডএফ এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এস এম সাইফুল আলম বৈঠকটিকে ‘মাইলফলক’ ও ‘ঐতিহাসিক’ হিসেবে উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের প্রতিদিনের সমস্যা যাতে প্রতিদিনই সমাধান করা যায়, সে জন্য একটি আলাদা টিম গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কোনো ফাইল বা কনটেইনার যাতে অহেতুক আটকে না থাকে, সেটিই হবে এর উদ্দেশ্য।

নিলাম প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতার কারণে ব্যবসায়ীরা যাতে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ব্যাংকঋণ পরিশোধে ব্যর্থ না হন এবং কেউ দেশ ছাড়তে বাধ্য না হন, সে বিষয়েও মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

চট্টগ্রামের গার্মেন্টস কমেছে ৭০০ থেকে ৩০০-এর নিচে
বৈঠকে চট্টগ্রামের শিল্প পরিস্থিতির চিত্রও তুলে ধরেন বিজিএমইএর পরিচালক মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ মনসুর। তিনি বলেন, একসময় চট্টগ্রামে প্রায় ৭০০টি গার্মেন্টস কারখানা ছিল। বর্তমানে তা ৩০০টির নিচে নেমে এসেছে। দীর্ঘদিনের নীতিগত সমস্যা ও ব্যবসায়িক প্রতিবন্ধকতাকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, ২০০০ সাল থেকে কিছু বিদেশি শিপিং লাইন ব্যাংক ডকুমেন্ট ছাড়াই পণ্য ডেলিভারি দিয়ে আসছে। এর ফলে হাজার হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসছে না। বিষয়টি তদন্তে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের উদ্যোগের কথা জানানো হয়েছে।

আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টিকারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি।

রাজনৈতিক পরিচয়ে ব্যবসায় সুবিধা নয়
ব্যবসায় রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও দুর্নীতির বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, সরকারের অধীনে কে কার পরিচিত, সেটি বিবেচনায় নেওয়া হবে না। কোনো রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার ব্যবসা চলবে না। কেউ যত বড় মন্ত্রী বা ক্ষমতাবান ব্যক্তিই হোক, বিশেষ সুবিধা পাওয়ার সুযোগ থাকবে না।

শিল্প পুনরুজ্জীবনে সরকার ইতোমধ্যে কর কমানো এবং ডিরেগুলেশনের মাধ্যমে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে বলেও জানান তিনি। এসব উদ্যোগের ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ছে বলে দাবি করেন অর্থমন্ত্রী।

এনসিটি পরিচালনা নিয়ে অবস্থান
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বা এনসিটি কে পরিচালনা করবে, সে বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে অর্থমন্ত্রী বিষয়টিকে বৈঠকের আলোচনার বাইরে বলে উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, বন্দর দেশি বা বিদেশি যে-ই পরিচালনা করুক, জনগণ, ব্যবসা ও দেশের অর্থনীতির স্বার্থে নির্ধারিত বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হবে। অর্থাৎ অপারেটর কে, তার চেয়ে বন্দরের কার্যক্রম কতটা দক্ষ ও ব্যবসাবান্ধব হচ্ছে, সেটিকেই গুরুত্ব দেওয়া হবে।

বন্ধ শিল্প চালু করাই লক্ষ্য
দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ বা সংকটে থাকা শিল্পকারখানাগুলো পুনরায় চালু করার ক্ষেত্রেও বন্দর-কাস্টমসের সংস্কারকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন অর্থমন্ত্রী।

তিনি বলেন, শিল্পকারখানাগুলো যাতে কম খরচে এবং কোনো বাধা ছাড়া পরিচালিত হতে পারে, সে পরিবেশ তৈরি করাই সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। বন্দর ও কাস্টমসের দীর্ঘসূত্রতা কমানো গেলে শিল্পের ব্যয় কমবে এবং কর্মসংস্থান বাড়বে।

চট্টগ্রাম নিয়ে এডিবির বড় পরিকল্পনা
চট্টগ্রাম সফরে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ভাইস প্রেসিডেন্টের উপস্থিতিকেও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, এডিবির ভাইস প্রেসিডেন্টের চট্টগ্রাম সফর থেকে বোঝা যায়, চট্টগ্রামকে ঘিরে তাদের বড় পরিকল্পনা রয়েছে।

তার মতে, এডিবি চট্টগ্রামকে শুধু একটি লজিস্টিক হাব হিসেবে দেখতে চায় না। বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের অগ্রদূত হিসেবে চট্টগ্রামকে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে চট্টগ্রামের সার্বিক উন্নয়ন কর্মসূচি ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

সব মিলিয়ে, সরকারের বর্তমান উদ্যোগের কেন্দ্রে রয়েছে বন্দর-কাস্টমসের দীর্ঘসূত্রতা কমানো, ব্যবসার খরচ কমানো, শিল্প পুনরুজ্জীবিত করা এবং আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়াকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করা। এখন এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবে কত দ্রুত এবং কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হয়, সেটিই হবে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

—জা.অর্থনীতি/আইবিএম