Print Date & Time : 27 October 2026 Tuesday 09:09 am

সাবেক ‘গণভবন’ এখন ‘জুলাই ৩৬ গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’

image

অনলাইন ডেস্ক: দুই বছর আগেও যে ভবনটিতে ছিল না সর্ব সাধারণের প্রবেশের অনুমতি। চাইলেও যেখানে প্রবেশ করা যেত না এখন সেই ভবনটিই সবার জন্য উন্মুক্ত। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে ১৭ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা এই ভবনটির নাম ছিল ‘গণভবন’ সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন। ছাত্র-জনতার প্রবল আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই বাসভবন ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান। এর পরপরই হাজারো বিক্ষুব্ধ জনতা ভবনটিতে ঢুকে তছনছ করে দেন। সেই ভবনই এখন রূপ নিয়েছে ‘জুলাই ৩৬ গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরে’।

বুধবার জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে এই জাদুঘরের উদ্বোধন করেন। বৃহস্পতিবার সাপ্তাহিক ছুটি ও অন্যান্য সরকারি ছুটি ছাড়া প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জন্য খোলা থাকবে জাদুঘরটি।

ভেতরে ঢুকলে লাল ইট বিছানো পথ ধরে দেখা যাবে নানা প্রজাতির ফলের গাছ। এই পথের পাশে তৈরি করা হয়েছে ‘গণতন্ত্রের পথে দীর্ঘ যাত্রা’ নামে একটি দীর্ঘ প্যানেল, যেখানে স্বাধীনতার পর থেকে দেশে গণতন্ত্র ও স্বৈরাচারের দ্বন্দ্বের ইতিহাস এবং চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান পর্যন্ত আন্দোলন-সংগ্রামের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

আরও পড়ুন: জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী

প্রধান ফটকসংলগ্ন পথের দক্ষিণ পাশে আছে সবুজ ঘাসে ঢাকা একটি বিশাল মাঠ। এর একাংশে তৈরি করা হয়েছে ‘জুলাই মেমোরিয়াল’, সাদা মার্বেল পাথর দিয়ে বৃত্তাকারে ঘেরা এই স্মৃতিসৌধে খোদাই করা আছে হাজার হাজার শহীদের নাম, শেখ হাসিনার দেড় দশকের শাসনামলে নিহত প্রায় চার হাজার মানুষের নাম এখানে লেখা। ভেতরের জায়গাটি সবুজ ঘাসে ঢাকা সারি সারি কবরের মতো দেখতে। সামনে একটি বড় পাথরফলকে লেখা আছে একটি কবিতার লাইন, যাতে বলা হয়েছে—যাঁর সিংহাসন দেশপ্রেমীদের রক্তের বিনিময়ে টিকে থাকত, আজ সেই ক্ষমতাধরের বাসভবনই শহীদদের দখলে।

মূল জাদুঘরের চারপাশের সবুজ মাঠজুড়ে জুলাই অভ্যুত্থানের আলোচিত কিছু ঘটনা নিয়ে তৈরি হয়েছে একাধিক ভাস্কর্য, রিকশার ওপর গুলিবিদ্ধ লাশ, পুলিশের সাঁজোয়া যানে ঝুলে থাকা আন্দোলনকারীর মরদেহ, সাইকেলে মিছিলে যাওয়া স্কুলছাত্রী—এমন নানা দৃশ্য। এ ছাড়া মাঠে দেখা যাবে পিলখানা হত্যাকাণ্ড, জুলাইয়ের নারী যোদ্ধা, পুকুরপাড়ে গুমের শিকার মানুষদের মরদেহ, গুমে জড়িত বাহিনীর তৎপরতা এবং শাপলা চত্বরের হত্যা-নির্যাতনসহ নানা ঘটনার স্মারক ভাস্কর্য। গুমের শিকার মানুষদের যেসব গোপন বন্দিশালায় (কুখ্যাত ‘আয়নাঘর’) রাখা হতো, মাঠের দক্ষিণ অংশে সেই আদলেই তৈরি করা হয়েছে একটি প্রতীকী আয়নাঘর।

ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনটিকেই মূল জাদুঘর হিসেবে সাজানো হয়েছে। উত্তর দিকের পথ দিয়ে দোতলা এই ভবনে ঢুকতে হবে। প্রথমেই দর্শকেরা একটি বড় কক্ষে ঢুকবেন, যার মেঝের মাঝখানে রাখা আছে কাচের গ্লোবের মতো একটি টিভি প্রদর্শনী, যাতে অবিরাম চলছে শেখ হাসিনা ও তাঁর সহযোগীদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ভিডিও।

যে বড় কক্ষে (‘কল রুম’ নামে পরিচিত) শেখ হাসিনা বিভিন্ন দূতাবাসের কর্মকর্তা, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও তিন বাহিনীর প্রধানদের নিয়ে বৈঠক করতেন, সেই ঘরের মেঝে ঢেকে রাখা হয়েছে বিশেষ পুরু কাচ দিয়ে। 

নিচতলার অন্য কক্ষগুলোতে রাখা আছে আয়নাঘরে বন্দীদের নির্যাতনে ব্যবহৃত চাবুক, বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার যন্ত্র, বৈদ্যুতিক চেয়ারসহ নানা নির্যাতন-সরঞ্জাম। এ ছাড়া আছে বিভিন্ন আন্দোলনের ভিডিও চিত্র, প্রামাণ্যচিত্র, সাক্ষাৎকার ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নানা নিদর্শন।

দোতলায় শেখ হাসিনার প্রশস্ত শয়নকক্ষটি বিক্ষুব্ধ জনতা ভাঙচুর করেছিলেন। তাঁর বিছানায় বিছানো আছে শহীদের নাম লেখা একটি আচ্ছাদন, তার ওপর রাখা শহীদ আবু ইসাহাকের রক্তমাখা শার্ট, গেঞ্জি ও প্যান্ট। সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠলেই দেখা যাবে একটি লম্বা প্যাসেজ, যেখানে জুলাই আন্দোলনের দিনভিত্তিক টাইমলাইন সাজানো হয়েছে, প্রতিদিনের ঘটনার বর্ণনার সঙ্গে আছে আলোকচিত্র, ভিডিও ও চিত্রকর্ম।

দোতলায় ‘ইমার্সিভ প্রজেক্ট’ নামে একটি কক্ষের চার দেয়ালে ছাদ থেকে মেঝে পর্যন্ত বসানো হয়েছে ডিজিটাল পর্দা, যেখানে ১০টি প্রজেক্টরে ৩৬০ ডিগ্রি কোণ থেকে দেখানো হচ্ছে জুলাই আন্দোলনের নানা দৃশ্য। মেঝেতে দর্শকদের বসার আসন পাতা আছে, যাতে মনে হয় দর্শক নিজেই সেই ঘটনার মধ্যে প্রবেশ করেছেন। আলাদা কক্ষে তুলে ধরা হয়েছে মিছিলে উত্তাল রাজধানীর দৃশ্য এবং নারীশিক্ষার্থীদের আন্দোলনে অংশগ্রহণের চিত্র। কোথাও কোথাও ছাদ থেকে ঝুলছে সূচিকর্মে তৈরি আন্দোলনের দৃশ্যখচিত স্ক্রল, আর বিভিন্ন প্যাসেজে আছে চিত্রকর্ম, ডিজিটাল পোস্টার ও ভাস্কর্যসহ নানা শিল্পকর্ম। কক্ষ, বারান্দা ও প্যাসেজজুড়ে সাজানো আছে শহীদদের ব্যবহৃত পোশাক, বই, খাতা ও খেলার সামগ্রী।

তবে মূল জাদুঘরের জায়গা তুলনামূলক ছোট হওয়ায় একসঙ্গে অনেক দর্শক ঢুকতে পারবেন না। তাই তিনটি পর্বে দর্শক প্রবেশের ব্যবস্থা করা হয়েছে, সকাল ১১টা থেকে ১টা, দুপুর ১টা থেকে ৩টা এবং শেষ পর্ব বেলা ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত। 

তবে জাদুঘর থেকে বের হয়ে মাঠে ঘুরে বেড়ানো, পুকুরপাড়ে বসা বা ক্যাফেটেরিয়ায় আড্ডা দেওয়ার জন্য সময়ের কোনো বাঁধাধরা সীমা নেই। টিকিটের দাম বড়দের জন্য ৫০ টাকা আর শিশুদের জন্য ২০ টাকা। জুলাই ৩৬ স্মৃতি জাদুঘরের ওয়েবসাইট থেকে অনলাইনে বা সরাসরি জাদুঘরে গিয়েও টিকিট সংগ্রহ করা যাবে।

—জা.অর্থনীতি/আরএস