Print Date & Time : 25 October 2026 Sunday 06:34 pm

চট্টগ্রামে পানিবন্দি লাখো মানুষ, সংকট বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের

image

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি: টানা পাঁচ দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রাম জেলার অন্তত সাড়ে চার লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে সাতকানিয়া উপজেলায়, যার প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এছাড়া বাঁশখালী, চন্দনাইশ, লোহাগাড়া ও বোয়ালখালীসহ কয়েকটি উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। দুর্গত এলাকায় দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানি, খাদ্য ও বিদ্যুতের তীব্র সংকট। অনেক স্থানে মোবাইল নেটওয়ার্কও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সব ধরনের ছুটি বাতিল করে ২৪ ঘণ্টার নিয়ন্ত্রণকক্ষ চালু করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।

সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খোন্দকার মাহমুদুল হাসান জানান, উপজেলার ১৭টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার প্রায় সব গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। ডলু নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে পৌরসভা ও রামপুর এলাকায় পানি প্রবেশ করায় দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। উপজেলাটিতে প্রায় তিন লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। দুর্গতদের জন্য ৮৯টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হলেও নেটওয়ার্ক বিপর্যয়ের কারণে সঠিক সংখ্যা জানা যাচ্ছে না। জেলা প্রশাসক জানান, সাতকানিয়ার দুর্গত এলাকায় উদ্ধারকাজ দ্রুততর করতে ১০টি স্পিডবোট চেয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে নৌকার মাধ্যমে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরানো হচ্ছে।

বাঁশখালীতেও বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ওমর সানি আঁকন জানান, ১৪টি ইউনিয়নের প্রায় সব এলাকাই প্লাবিত হয়েছে এবং অন্তত ৩৮ হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। বুধবার রাতে বৈলছড়ি এলাকায় প্রধান সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় চট্টগ্রাম শহরের সঙ্গে বাঁশখালীর সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বন্যার পানিতে ইতিমধ্যে পাঁচ শতাধিক মাটির ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। বাঁশখালী ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা মিজানুর রহমান জানান, বৈলছড়ি এলাকা থেকে একটি পরিবারের সাত সদস্যকে উদ্ধার করাসহ তাদের উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

চন্দনাইশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুর রহমান জানান, চন্দনাইশের দুটি পৌরসভা ও আটটি ইউনিয়নের হাশিমপুর ও জোয়ারা ছাড়া প্রায় সব এলাকাই প্লাবিত হয়েছে। এতে প্রায় ১৪ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় ২৭টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এদিকে শঙ্খ, সাঙ্গু ও ডলু নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। দোহাজারী সংলগ্ন চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক এবং কেরানীহাট-বান্দরবান সড়কের ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ায় দক্ষিণবঙ্গের প্রধান সড়কগুলোতে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে এবং দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়েছে।

লোহাগাড়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বায়েজিদ বিন আখন্দ জানান, সাঙ্গু ও ডলু নদী সংলগ্ন হওয়ায় আমিরাবাদ, আধুনগর, পদুয়া ও লোহাগাড়া ইউনিয়নে পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে সবচেয়ে বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়েছেন।

ত্রাণ কার্যক্রমের বিষয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, "ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় থেকে ২০০ মেট্রিক টন চাল ও ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্রধান উপদেষ্টার ত্রাণ তহবিল থেকে আরও ২০ লাখ টাকা পাওয়া গেছে, যা উপজেলা প্রশাসনের চাহিদা অনুযায়ী দুর্গত এলাকায় বিতরণ করা হচ্ছে।"

এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তর উত্তর বঙ্গোপসাগরে বৈরী আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রামসহ সব সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল রাখতে বলেছে। একই সঙ্গে আগামী ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামসহ দেশের আট বিভাগে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। অতি ভারী বৃষ্টির কারণে চট্টগ্রামে সাময়িক জলাবদ্ধতা এবং পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের আশঙ্কা থাকায় নদী ও পাহাড়ের পাদদেশে থাকা বাসিন্দাদের স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

—জা. অর্থনীতি/এলএটি