Print Date & Time : 28 October 2026 Wednesday 08:57 am

মুসোলিনির ইতালির বিশ্বজয়ের নায়ক

image

১৯৩৪ সালের বিশ্বকাপ ছিল শুধু একটি ফুটবল টুর্নামেন্ট নয় বরং রাজনীতি, ক্ষমতা আর জাতীয় অহংকারের এক বিস্ফোরক মঞ্চ। সেই আসরের আয়োজক ছিল ইতালি। ক্ষমতায় তখন কুখ্যাত ফ্যাসিস্ট শাসক বেনিতো মুসোলিনি। বিশ্বমঞ্চে ইতালির শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে মরিয়া ছিলেন তিনি। আর সেই মঞ্চেই জন্ম নিয়েছিল ইতালির প্রথম বিশ্বজয়ের গল্প।

ফাইনালে সাবেক চেকোস্লাভাকিয়াকে ২-১ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জেতে ইতালি। ম্যাচ শেষে অধিনায়ক জিয়ানপিয়েরো কম্বির হাতে জুলে রিমে ট্রফি তুলে দেন স্বয়ং মুসোলিনি। ইতিহাসের সেই ছবি আজও বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম আলোচিত মুহূর্ত।

তবে এই গল্প মুসোলিনির নয়। এই গল্প এক গোলরক্ষকের— যিনি গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে ইতালিকে এনে দিয়েছিলেন প্রথম বিশ্বকাপ। যার নাম জিয়ানপিয়েরো কম্বি।

১৯৩০-এর দশকে বিশ্ব ফুটবলে গোলরক্ষকদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত নামগুলোর একটি ছিল কম্বি। ইতালির ফুটবল ইতিহাসেও তাকে ধরা হয় সর্বকালের অন্যতম সেরা গোলকিপার হিসেবে। গোলপোস্টের নিচে তিনি ছিলেন অবিশ্বাস্য ঠান্ডা মাথার, নির্ভরযোগ্য এবং দৃঢ়চেতা এক প্রহরী।

১৯০২ সালের ২০ নভেম্বর ইতালির তুরিন শহরে জন্ম নেন কম্বি। পুরো ক্লাব ক্যারিয়ার কাটিয়েছেন ইতালির ঐতিহ্যবাহী ক্লাব জুভেন্টাসে। এক ক্লাবেই নিজেকে কিংবদন্তিতে পরিণত করেছিলেন তিনি।

মাত্র ২১ বছর বয়সে জাতীয় দলে অভিষেক হয় কম্বির। ১৯২৪ সালের ৬ এপ্রিল বুদাপেস্টে হাঙ্গেরির বিপক্ষে মাঠে নামে ইতালি। কিন্তু অভিষেকটা ছিল ভয়াবহ। ইতালি হেরে যায় ৭-১ গোলে। সেই ম্যাচের পর জাতীয় দল থেকে বাদও পড়েন কম্বি।

একজন তরুণ গোলরক্ষকের জন্য এমন ধাক্কা ক্যারিয়ার শেষ করে দেওয়ার মতো ছিল। কিন্তু কম্বি ছিলেন ভিন্ন ধাতুর মানুষ। এক বছর পর আবার সুযোগ পান। এবার প্রতিপক্ষ ফ্রান্স। আর সেই ম্যাচেই বদলে যায় গল্প। ইতালি ৭-০ গোলে উড়িয়ে দেয় ফ্রান্সকে। কম্বিও বুঝিয়ে দেন, তিনি হারিয়ে যাওয়ার জন্য আসেননি।

এরপর ধীরে ধীরে ইতালির গোলবারের একচ্ছত্র মালিক হয়ে ওঠেন তিনি। ১৯২৮ সালের আমস্টারডাম অলিম্পিকে ইতালির হয়ে খেলেন এবং দলকে এনে দেন ব্রোঞ্জ পদক।

১৯৩১ সালের ১৫ নভেম্বর জাতীয় দলের অধিনায়কের দায়িত্ব পান কম্বি। তখন পর্যন্ত দেশের হয়ে ৩২ ম্যাচ খেলে ফেলেছেন তিনি। কিন্তু সময়টা ছিল তার ক্যারিয়ারের শেষভাগ। বয়স বাড়ছিল, অবসরের ভাবনাও উঁকি দিচ্ছিল মনে। অন্যদিকে তরুণ গোলরক্ষক কার্লো সেরেসোলি তখন ইতালিয়ান ফুটবলের নতুন আলোচিত নাম। বিশ্বকাপের বাছাই পর্বেও গোলবার সামলেছিলেন কার্লোই।

তবে বিশ্বকাপের মূল আসরে কোচ ভিত্তেরিও পাজোর অভিজ্ঞতার ওপরই ভরসা রাখেন। তিনি অধিনায়ক ও গোলরক্ষক হিসেবে বেছে নেন কম্বিকে। আর সেই সিদ্ধান্তই ইতিহাস হয়ে যায়।

বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে যুক্তরাষ্ট্রকে ৭-১ গোলে উড়িয়ে দেয় ইতালি। কোয়ার্টার ফাইনালে প্রতিপক্ষ ছিল স্পেন। প্রথম ম্যাচ অতিরিক্ত সময় শেষে ১-১ গোলে ড্র হয়। তখনও টাইব্রেকারের প্রচলন হয়নি। ফলে পরদিন আবার ম্যাচ আয়োজন করা হয়।

রিপ্লে ম্যাচে ইতালি চারজন এবং স্পেন সাতজন খেলোয়াড় বদল করে নামে। সেই হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে ১-০ গোলে জেতে ইতালি। এরপর সেমিফাইনালে শক্তিশালী অস্ট্রিয়াকে একই ব্যবধানে হারায় তারা। ওই ম্যাচে দুটি নিশ্চিত গোল বাঁচিয়ে ইতালির নায়ক হয়ে ওঠেন কম্বি।

ফাইনালে শুরুতে চাপে পড়ে যায় স্বাগতিকরা। ম্যাচের ৭১ মিনিটে গোল করে এগিয়ে যায় চেকোস্লোভাকিয়া। স্টেডিয়ামজুড়ে নেমে আসে নিস্তব্ধতা। কিন্তু মাত্র ১০ মিনিট পর সমতা ফেরায় ইতালি। এরপর অতিরিক্ত সময়ে অ্যাঞ্জেলো শিয়াভিওর গোলে বিশ্বকাপ নিশ্চিত হয় ইতালির।

সেই মুহূর্তে ফুটবল ইতিহাসের অংশ হয়ে যান কম্বি। ইতালির প্রথম বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক হিসেবে জুলে রিমে কাপ হাতে তোলেন তিনি।
জাতীয় দলের হয়ে মোট ৪৭ ম্যাচ খেলেছেন কম্বি। ক্লাব এবং জাতীয় দল মিলিয়ে এক দশকের বেশি সময় ইতালির ফুটবলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। ফুটবল ছাড়ার পরও প্রিয় ক্লাব জুভেন্টাসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কর্মকর্তা হিসেবে।

১৯৫৬ সালের ১২ আগস্ট, মাত্র ৫৪ বছর বয়সে মারা যান ইতালির এই কিংবদন্তি গোলরক্ষক। কিন্তু তার নাম আজও ইতিহাসে অমর। কারণ ইতালির প্রথম বিশ্বজয়ের পেছনে যে মানুষটি শেষ প্রহরী হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি ছিলেন জিয়ানপিয়েরো কম্বি।

একনজরে
* পূর্ণ নাম: জিয়ান পিয়েরো কম্বি
* জন্ম: ২০ নভেম্বর ১৯০২, তুরিন, ইতালি
* মৃত্যু: ১২ আগস্ট, ১৯৫৬
* উচ্চতা: ৫ ফুট সাড়ে ১১ ইঞ্চি
* পজিশন: গোলকিপার
* জাতীয় দল: ১৯২৪-১৯৩৪
* জাতীয় দলের ম্যাচ: ৪৭
* বিশ্বকাপ জয়: ১৯৩৪
* অলিম্পিক ব্রোঞ্জ: ১৯২৮, আমস্টারডাম অলিম্পিক।