Print Date & Time : 28 October 2026 Wednesday 05:16 am

পেলেই কি সর্বকালের সেরা?

image

মশিউর রহমান শাওন: ১৯৭০ বিশ্বকাপের ফাইনালে ইতালির বিপক্ষে গোল করে ব্রাজিলকে এগিয়ে দিয়েছিলেন পেলে। বিশ্বকাপ মঞ্চে সেটিই হয়ে থাকে ফুটবল সম্রাটের শেষ গোল, শেষ মহাকাব্য। বিশ্বকাপ ফাইনাল শেষে মাত্র ২৯ বছর বয়সে বিশ্বকাপ ফুটবলকে বিদায় বলেন এই ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি। অবশ্য সমর্থকদের ভালোবাসা না থাকলে বিদায় নিতে পারতেন আরও তিন বছর আগে। 

মাত্র ১৫ বছর বয়সে ক্লাব ফুটবলে নিজের জানান দেন পেলে। এরপর সুযোগ পান ১৯৫৮ সালে ব্রাজিল বিশ্বকাপ দলে। মাত্র ১৭ বছর বয়সে ফুটবল বিশ্বকে নিজের পায়ের নিচে এনে ফেলেছিলেন তিনি। ওয়েলসের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে করেন নিজের প্রথম বিশ্বকাপ গোল। এরপর ফ্রান্সের বিপক্ষে সেমিফাইনালে হ্যাটট্রিক ও ফাইনালে সুইডেনের বিপক্ষে করেন জোড়া গোল। তরুণ পেলের হাত ধরেই ইতিহাসে প্রথমবার বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পায় ব্রাজিল। 

শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখার মিশনে ১৯৬২ বিশ্বকাপে সফল হয় ব্রাজিল। তবে আসরটি পেলের জন্য ছিল হতাশার। গ্রুপ পর্বের ম্যাচের ইনজুরিতে বিশ্বকাপ দল থেকে ছিটকে পড়েন তিনি। ফলে ব্রাজিলের সেই বিশ্বকাপ জয়ী দলের সদস্য হিসেবে পেলেকে ধরা হবে কিনা এ নিয়ে বিতর্ক চলে প্রায় ৪৫ বছর। অবশেষে ১৯৯৭ সালে ফিফা তাকে বিশ্বকাপ জয়ী দলের সদস্য হিসেবে ঘোষণা করে এ বিতর্কের ইতি টানে। 

বিশ্বকাপ ইতিহাসে পেলে ও গারিঞ্চা জুটিকে সেরা মনে করা হয়। পেলে ছিলেন গোল, গতি ও ফুটবল বুদ্ধিমত্তার প্রতীক। অন্যদিকে গারিঞ্চা ছিলেন ড্রিবলিংয়ের জাদুকর। তার পায়ের মুভমেন্ট এতটাই অপ্রত্যাশিত ছিল যে ডিফেন্ডাররা বুঝতেই পারত না তিনি কোন দিকে যাবেন। 

১৯৫৮ ও ১৯৬২ বিশ্বকাপে এই জুটি ‘সাম্বা ফুটবল’ উপহার দেয় বিশ্বকে। বিশেষ করে ১৯৫৮ বিশ্বকাপে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপক্ষে ম্যাচে তাদের আক্রমণকে অনেক ইতিহাসবিদ “ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর শুরুগুলোর একটি” বলে বর্ণনা করেন। সবচেয়ে অবিশ্বাস্য তথ্য হলো এ দুজন একসঙ্গে খেললে ব্রাজিল কখনও হারেনি।

ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপ পেলের ক্যারিয়ারে ভয়ংকর অধ্যায়গুলোর একটি। সে আসরে তাকে বারবার নির্মম ফাউলের শিকার হতে হয়। পর্তুগালের বিপক্ষে ম্যাচে ইনজুরি নিয়েও খেলা চালিয়ে যেতে হয়েছিল। কেননা তখনও বিশ্বকাপে বদলি খেলোয়াড় নিয়ম চালু হয়নি। বিশ্বকাপ শেষে হতাশা থেকে আর কখনও বিশ্বকাপ না খেলার ঘোষণা দেন তিনি। পেলে মনে করেছিলেন, বিশ্ব ফুটবল অতিরিক্ত সহিংস হয়ে উঠেছে। 

১৯৬৭ সালে পেলের ক্যারিয়ারে আসে নাটকীয় মোড়। সেসময় ব্রাজিলে চলছিল সামরিক শাসন। দেশটির সরকার তাকে পরের বিশ্বকাপে ফেরানোর ব্যাপারে আগ্রহ দেখায়। পরবর্তীকালে সমর্থক, কোচ ও সতীর্থদের অনুরোধে নিজের অবসরের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন তিনি। 

১৯৭০ বিশ্বকাপে ব্রাজিল দলটিকে সর্বকালের সেরা দল মনে করা হয়। সে আসরে ইতালির বিপক্ষে ফাইনালে পেলের গোল ও কার্লোস আলবার্তোকে দেওয়া অ্যাসিস্ট এখনও ফুটবল সৌন্দর্যের প্রতীক হয়ে আছে। মেক্সিকো সিটির বিখ্যাত এস্তাদিও আজতেকা মাঠে ইতালিকে ৪-১ ব্যবধানে হারানোর পর আবারও বিশ্বকাপ থেকে অবসরের ঘোষণা দেন পেলে। 

ফুটবল বিশ্বকাপে নিজের খেলা ১৪টি ম্যাচে ১২ গোল করেছেন পেলে। এখনও একমাত্র ফুটবলার হিসেবে তিনটি বিশ্বকাপ জয়ের কীর্তি আছে তার নামের পাশে। এছাড়াও মাত্র ১৭ বছর বয়সে বিশ্বকাপে গোলের রেকর্ড এখনও পেলের নামে।

কেন মাত্র ২৯ বছর বয়সেই শেষ বিশ্বকাপ খেললেন পেলে?

বর্তমান সময়ে ২৯ বছরকে একজন খেলোয়াড়ের ‘প্রাইম’ ধরা হয়। ৪৫ বছর বয়সে বিশ্বকাপ খেলার রেকর্ড গড়েছেন মিসরের এল হাদারি। আসন্ন ২০২৬ বিশ্বকাপে কাতারের প্রাথমিক দলে রয়েছেন ৪২ বছর বয়সি সেবাস্টিয়ান সোরিয়া। এখানেই প্রশ্ন থাকে, মাত্র ২৯ বছর বয়সে বিশ্বকাপ থেকে পেলের অবসরের ঘোষণা যৌক্তিক কিনা। 

পেলের অবসরের সিদ্ধান্তকে বরাবরই যৌক্তিক হিসেবে দেখেছে ফুটবল বিশ্ব। কেননা ১৯৬০ ও ৭০ দশকের ফুটবল ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। বর্তমানের মতো আধুনিক স্পোর্টস সায়েন্স, উন্নত রিকভারি সিস্টেম কিংবা খেলোয়াড় সুরক্ষার কড়া নিয়ম তখন ছিল না। মাত্র ১৫ বছর বয়সে পেশাদার ফুটবলে অভিষেকের পর প্রায় দেড় দশকের অবিরাম ধকল বহন করেছে পেলের শরীর। 

পেলেকে মানসিকভাবে সবচেয়ে ক্লান্ত করে তুলেছিল ১৯৬৬ বিশ্বকাপের নির্মম অভিজ্ঞতা। পেলে অনুভব করেছিলেন, বিশ্বকাপের চাপ ও সহিংসতা তার শরীর আর নিতে পারছে না। একইসঙ্গে তৃতীয় বিশ্বকাপ জয়ের পর ‘পারফেক্ট বিদায়’ বলার সবচেয়ে সেরা সময় নষ্ট করতে চাননি তিনি। 
পেলের জীবনের শুরু

ব্রাজিলের ছোট শহর ত্রেস কোরাকোয়েস শহরে জন্ম পেলের। যদিও এই নামটি তার আসল নাম নয়। ব্রাজিলিয়ান ক্লাব গোলরক্ষক বিলের নাম ভুল উচ্চারণ করায় বন্ধুরা তাকে পেলে নামে ডাকত। মজার বিষয়, পেলে নামের নির্দিষ্ট কোনো অর্থ নেই। ত্রেসে বড় হওয়া পেলের মূল নাম এডসন আরান্তেস দো নাসিমেন্তো। বিখ্যাত উদ্ভাবক ও বিজ্ঞানী থমাস এডিসনের নাম থেকে পেলের নামকরণ করা হয়। 

পেলের বাবা দোনদিনহোও ফুটবলার ছিলেন। তবে ইনজুরির কারণে ক্যারিয়ার দীর্ঘ করতে পারেননি। দারিদ্র্যের মধ্যে পরিবার দিন পার করায় কাপড় গুটিয়ে ফুটবল তৈরি করে খেলতেন ছোট্ট পেলে। মাত্র ৬ বছর বয়সে পেলের প্রতিভা বুঝতে পারেন দোনদিনহোর ফুটবলার বন্ধু সোসা। পেলের জন্মদিনে তাকে চামড়ার তৈরি বল উপহার দেন তিনি। পরের কয়েক বছরে পেলে হয়ে উঠেন সম্ভাবনাময় তারকা ফুটবলার। 

ব্রাজিলে সেসময় ইনডোর ফুটবল জনপ্রিয় হতে শুরু করেছে। স্কুলে পড়াকালীন সময়ে কোচের নজরে আসেন পেলে। মাত্র ১৫ বছর বয়সে ব্রাজিলিয়ান ক্লাব সান্তোসে যোগ দেওয়ার সুযোগ আসে। অভিষেক ম্যাচেই ভবিষ্যতের ছাপ রাখেন পেলে। গোল, গতি, ড্রিবলিং ও খেলার বুদ্ধিমত্তায় দ্রুত ক্লাবটির প্রাণভোমরা হয়ে ওঠেন তিনি। অল্প সময়ে সান্তোস ব্রাজিলের বাইরে গিয়ে দক্ষিণ আমেরিকার অন্যতম সেরা দলে পরিণত হয়। প্রচলিত আছে পেলের খেলা দেখার জন্য নাইজেরিয়াতে দুই বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধ সাময়িক বন্ধ রাখা হয়েছিল।

সান্তোসের হয়ে ছয়টি ব্রাজিলিয়ান লিগ শিরোপা ও দুটি কোপা লিবার্তাদোরেস জেতেন পেলে। পেলের সময়ের সান্তোস দলকে ‘ভ্রাম্যমাণ ফুটবল সার্কাস’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়। সান্তোসের ম্যাচ মানে শুধু ফুটবল নয়, মানুষ দেখতে আসত পেলের জাদুময় ফুটবল। 

পেলের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো তার গোলসংখ্যা। বিভিন্ন পরিসংখ্যানে পার্থক্য থাকলেও ফিফা ও ব্রাজিলিয়ান সূত্র অনুযায়ী তিনি ১,২৮১টির বেশি গোল করেছিলেন। 

১৯৭১ সালে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানান পেলে। তবে ক্লাব ফুটবল চালিয়ে যান আরও কয়েক বছর। ১৯৭৪ সালে সান্তোস ছাড়ার পর আর্থিক সংকটেও পড়েছিলেন তিনি। পরবর্তীকালে ফুটবলকে আমেরিকায় জনপ্রিয় করার প্রকল্পের অংশ হিসেবে যোগ দেন নিউইয়র্ক কসমস ক্লাবে। 

যুক্তরাষ্ট্রে পা রেখে সেখানকার সংস্কৃতি বদলে দেন পেলে। তিনবারের বিশ্বকাপজয়ী এই ফুটবলারের হাত ধরে আমেরিকায় ফুটবল নতুনভাবে জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে। ১৯৭৭ সালে সান্তোসের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ফুটবল ক্যারিয়ারের ইতি টানেন তিনি। 

১৯৯৯ সালে পেলেকে ‘অ্যাথলিট অব দ্য সেঞ্চুরি’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি। এক বছর বাদেই তাকে বিংশ শতাব্দীর সেরা ফুটবলার স্বীকৃতি দেয় ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব ফুটবল হিস্ট্রি অ্যান্ড স্ট্যাটিসটিকস (আইএফএফএইচএস)। ২০২২ সালের ২৯ ডিসেম্বর সাও পাওলোর আলবার্ট আইনস্টাইন হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। এই পেলেই কি সর্বকালের সেরা?