শাওন রহমান: ফুটবল বিশ্বকাপ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ক্রীড়া উৎসব। কিন্তু আলো ঝলমলে স্টেডিয়াম, কোটি মানুষের উল্লাস আর বিলিয়ন ডলারের বিজ্ঞাপন যুদ্ধের আড়ালে প্রতি বিশ্বকাপেই গড়ে ওঠে অন্ধকার অর্থনীতির অদৃশ্য বাজার। সেখানে টিকিট কালোবাজারি, জার্সি নকল, অবৈধ বেটিং, অনলাইন প্রতারণা এবং ডেটা বাণিজ্যের মতো কর্মকাণ্ডে ঘুরে বেড়ায় কোটি কোটি ডলার।
বিশ্বকাপ যত বড় হয়েছে, এই গোপন অর্থনীতিও তত প্রযুক্তিনির্ভর ও আন্তর্জাতিক হয়ে উঠেছে। এখন আর স্টেডিয়ামের বাইরে কয়েকজন দালালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই কালোবাজার। এটি পরিণত হয়েছে বৈশ্বিক ডিজিটাল অপরাধ নেটওয়ার্কে।
টিকিট: ফুটবলের সবচেয়ে দামি কালোবাজার
বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় অবৈধ বাজার গড়ে ওঠে ম্যাচ টিকিটকে ঘিরে। ফিফার অফিসিয়াল টিকিট বিক্রি শুরু হওয়ার পর থেকেই হাজার হাজার টিকিট কয়েক মিনিটে শেষ হয়ে যায়। এরপরই সক্রিয় হয়ে ওঠে রিসেল নেটওয়ার্ক।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে উঠে আসে, ২০২২ ফুটবল বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা-সংক্রান্ত কিছু ম্যাচের টিকিট আসল মূল্যের ৯ থেকে ১০ গুণ বেশি দামে বিক্রি হয়েছে। লিওনেল মেসির খেলা দেখার আশায় মিসর থেকে যাওয়া এক সমর্থক ৫০০ ডলারে টিকিট কিনেছিলেন, যদিও শুরুতে তার কাছে ২ হাজার ডলারও চাওয়া হয়েছিল। প্রতিবেদনে এক ফরাসি টিকিট বিক্রেতা স্বীকার করেন, বিশ্বকাপের টিকিট বিক্রি করেই তিনি নিজের পুরো কাতার সফরের খরচ তুলে ফেলেছেন।
বিশ্বকাপ ম্যাচ টিকিট কেনার ক্ষেত্রে ফিফা বারবার সাবধানতা অবলম্বন করার কথা জানিয়েছে। ফিফা সতর্ক করেছে যে অননুমোদিত ওয়েবসাইট থেকে টিকিট কেনা ঝুঁকিপূর্ণ। তবুও বিশ্বকাপের আবেগকে কাজে লাগিয়ে কালোবাজারিরা অফিসিয়াল মূল্যের কয়েক গুণ দামে টিকিট বিক্রি করে। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের সময় কিছু ফাইনাল টিকিটের কালোবাজার মূল্য ২০ হাজার ডলার ছাড়িয়ে যায় বলে একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উঠে আসে।
২০২২ ফুটবল বিশ্বকাপে টিকিট কালোবাজারি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাতার সরকার বিশেষ আইন চালু করেছিল, যেখানে অবৈধভাবে টিকিট বিক্রি করলে আসল মূল্যের ১০ গুণ পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়। তবুও নকআউট পর্বে ম্যাচ সংখ্যা কমে যাওয়া এবং চাহিদা বেড়ে যাওয়ার কারণে কালোবাজার আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে। বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বকাপের টিকিট এখন শুধু খেলা দেখার মাধ্যম নয়, বরং উচ্চ মুনাফার ‘ডিজিটাল ব্ল্যাক মার্কেট অ্যাসেট’-এ পরিণত হয়েছে।
সমর্থকদের মনে ‘ফিয়ার অব মিসিং আউট অথবা খেলা মিস’ করার ভয়কে কাজে লাগাচ্ছে সংগঠিত চক্রগুলো। এই সুযোগে ভুয়া ওয়েবসাইট, নকল কিউ সিস্টেম এমনকি বট ব্যবহার করে টিকিট কিনে পুনরায় বিক্রি করে।
অনলাইন প্রতারণা: ডিজিটাল যুগের নতুন হুমকি
অতীতে বিশ্বকাপ ঘিরে প্রতারণা সীমাবদ্ধ ছিল ভুয়া কাগজের টিকিটে। এখন সেটি ডিজিটাল প্রতারণায় রূপ নিয়েছে। সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে, বড় ক্রীড়া আসরের সময় হাজার হাজার ভুয়া ওয়েবসাইট চালু হয়, যেগুলো দেখতে অফিসিয়াল টিকিট প্ল্যাটফর্মের মতো।
সাইবার সিকিউরিটি রিপোর্ট ও ইন্টারপোল অফিসিয়ালের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে ফিশিং লিংক, ভুয়া টিকিট অ্যাপ এবং অনলাইন পেমেন্ট প্রতারণা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। অপরাধীরা অনেক সময় ‘মাত্র কয়েকটি টিকিট বাকি’ ধরনের বার্তা ব্যবহার করে মানুষের আবেগকে কাজে লাগায়।
ফিফা বিশ্বকাপকে সামনে রেখে ফুটবল টিকিট প্রতারণা নিয়ে নতুন করে সতর্কতা দিয়েছে ব্রিটিশ ব্যাংক লয়েডস ব্যাংকিং গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি প্রিমিয়ার লিগ মৌসুমে ফুটবল টিকিট জালিয়াতি আগের বছরের তুলনায় ৩৬ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত হাজারো প্রতারণার ঘটনা বিশ্লেষণ করে তারা জানায়, প্রতিটি ভুক্তভোগী গড়ে প্রায় ২১৫ পাউন্ড (প্রায় ৩৬ হাজার টাকা) ক্ষতির মুখে পড়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে সমর্থকেরা হাজার পাউন্ড দিয়ে এমন ‘ভিআইপি টিকিট’ বা ‘সিজন টিকিট’ কিনেছেন, যেগুলোর বাস্তবে কোনো অস্তিত্বই ছিল না।
বেটিং বাজার: বৈধ উত্তেজনা থেকে অবৈধ জুয়া সাম্রাজ্য
বিশ্বকাপের সময় সবচেয়ে দ্রুত বাড়ে অনলাইন বেটিং বাজার। বৈধ স্পোর্টস বেটিংয়ের পাশাপাশি অবৈধ জুয়ার নেটওয়ার্কও সক্রিয় হয়ে ওঠে। ইন্টারপোল অতীতের একাধিক অভিযানে জানিয়েছে, বিশ্বকাপ চলাকালে এশিয়া ও ইউরোপজুড়ে শত শত মিলিয়ন ডলারের অবৈধ বেটিং চক্র সক্রিয় হয়।
বিশেষ করে এশিয়ার বাজারকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ধরা হয়। কারণ এখানে অনলাইন বেটিং নিয়ন্ত্রণ দুর্বল এবং অনেক দেশে বৈধ-অবৈধ প্ল্যাটফর্মের সীমারেখা অস্পষ্ট। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বকাপ এখন শুধু ফুটবল প্রতিযোগিতা নয়, এটি বৈশ্বিক জুয়া অর্থনীতির সবচেয়ে বড় ইভেন্টগুলোর একটি।
বিশ্বকাপ ম্যাচকে কেন্দ্র করে অবৈধ তথ্য বাণিজ্যের অভিযোগও অতীতে এসেছে। যদিও বিশ্বকাপে সরাসরি ম্যাচ ফিক্সিংয়ের প্রমাণ খুব কম। তবে বেটিং বিজ্ঞাপনের কারণে অনেকেই নতুন করে এই অর্থনীতির অংশ হয়ে পড়ে।
ইংল্যান্ডের শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা যায়, ২০২২ ফিফা বিশ্বকাপ চলাকালে টেলিভিশনে প্রচারিত জুয়ার বিজ্ঞাপন দর্শকদের বেটিং আচরণে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছিল। এবিআর জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব দর্শক জুয়ার বিজ্ঞাপনসহ খেলা সরাসরি দেখেছেন, তারা অন্যদের তুলনায় ২২ থেকে ৩৩ শতাংশ বেশি বেটিংয়ে অংশ নিয়েছেন। একই সঙ্গে তাদের বেটিংয়ের হারও ১৬ থেকে ২৪ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। গবেষকদের মতে, লাইভ ম্যাচ চলাকালে এসব বিজ্ঞাপন অনেক দর্শকের মধ্যে তাৎক্ষণিকভাবে জুয়া খেলার আগ্রহ তৈরি করেছে।
গবেষণার প্রধান লেখক এলেন ম্যাকগ্রেনের ভাষায়, ‘লাইভ ম্যাচের সময় এসব বিজ্ঞাপন শক্তিশালী ট্রিগারের মতো কাজ করে, এমনকি যাদের আগে জুয়া খেলার পরিকল্পনাও ছিল না, তাদের মধ্যেও বেটিংয়ের আগ্রহ তৈরি করে।’
জার্সি ব্যবসা: আবেগ থেকে নকল সাম্রাজ্য
বিশ্বকাপ এলেই জার্সি হয়ে ওঠে পরিচয়ের প্রতীক। কিন্তু এই আবেগকে কেন্দ্র করেই তৈরি হয় বিশাল নকল পণ্যের বাজার। অ্যাডিডাস, নাইকি এবং পুমার অফিসিয়াল জার্সির পাশাপাশি বাজারে ছড়িয়ে পড়ে অসংখ্য নকল সংস্করণ। অনেক সময় একই ডিজাইন, একই লোগো ব্যবহার করে কম দামে বিক্রি হয় এসব পণ্য।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিভিন্ন বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বড় ক্রীড়া আসরগুলোতে নকল জার্সির বাজার কয়েক বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
আসন্ন ফুটবল বিশ্বকাপকে সামনে রেখে নকল জার্সির বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযান শুরু করেছে যুক্তরাজ্যের পুলিশ। বিশ্বকাপ-পূর্ব অভিযানে দেশটির মিডল্যান্ডস অঞ্চলের একটি বড় মার্কেট থেকে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ ভুয়া ফুটবল জার্সি জব্দ করা হয়েছে।
জব্দ হওয়া জার্সিগুলোর মধ্যে ছিল আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স, পর্তুগাল ও ইংল্যান্ড ফুটবল টিমের জার্সি। পুলিশ জানিয়েছে, বাজারে ২০ পাউন্ডে বিক্রি হওয়া এসব জার্সির আসল সংস্করণের দাম প্রায় ৮০ পাউন্ড পর্যন্ত। জব্দ হওয়া পণ্যের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৪ লাখ পাউন্ড।
যুক্তরাজ্যের পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, নকল জার্সি ব্যবসাকে অনেকেই ছোটখাটো অপরাধ মনে করলেও এর পেছনে রয়েছে বড় ধরনের সংগঠিত অপরাধচক্র। তদন্ত কর্মকর্তাদের ভাষায়, ‘আসলের অবৈধ কপি’ পণ্যের ব্যবসা অনেক সময় অর্থ পাচার, মানব পাচার, জোরপূর্বক শ্রম ও মাদক সরবরাহের মতো অপরাধের অর্থায়নের সঙ্গে যুক্ত থাকে। একই সঙ্গে নিম্নমানের এসব পণ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক বা দাহ্য উপাদানও থাকতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বকাপ ঘিরে নকল জার্সির বাজার বড় হওয়ার অন্যতম কারণ আসল জার্সির উচ্চমূল্য। নাইকির কিছু অফিসিয়াল বিশ্বকাপ জার্সির দাম ১৩৫ পাউন্ড পর্যন্ত পৌঁছেছে, আর অ্যাডিডাস ও পুমার জার্সির দামও ৬০ থেকে ১২০ পাউন্ডের মধ্যে। দ্য অ্যাথলেটিক এর এক জরিপে দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারীদের ৭৮ শতাংশ অন্তত একবার নকল জার্সি কিনেছেন এবং ৮৯ শতাংশের মতে, উচ্চমূল্যই তাদের নকল পণ্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বিশ্বকাপ ঘিরে এই নকল জার্সির মার্কেট স্থানীয় দোকান থেকে অনলাইন মার্কেটপ্লেস ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন ও কাস্টম সংস্থা ইতোমধ্যে ‘ট্রু ফ্যানস্ কিপ ইট রিয়াল’ নামে সচেতনতামূলক প্রচারণা শুরু করেছে।
সংস্থাটি জানিয়েছে, শুধু গত বছরেই প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার মূল্যের নকল ক্রীড়া পণ্য জব্দ করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বকাপ যত বড় হচ্ছে, ফুটবল আবেগকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই অন্ধকার জার্সি অর্থনীতিও তত বিস্তৃত হচ্ছে।
বাংলাদেশেও বিশ্বকাপ এলেই আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল জার্সির বাজার গরম হয়ে ওঠে। রাজধানী থেকে শুরু করে ইউনিয়ন শহর পর্যন্ত অসংখ্য দোকানে বিক্রি হয় অননুমোদিত জার্সি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এগুলোর কোনো লাইসেন্স বা রয়্যালটি থাকে না। কিন্তু কম দামের কারণে সাধারণ সমর্থকদের বড় অংশ সেদিকেই ঝুঁকে পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন বিশ্বকাপ শুধু টিকিট বা জার্সির বাজার নয় এটি ডেটার বাজারও। সমর্থকের সার্চ, কেনাকাটা, পছন্দের দল, অনলাইন আচরণ সবকিছু বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞাপন ও বেটিং প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন ব্যবসায়িক মডেল তৈরি করছে।
বিশ্বকাপ সবসময়ই মানুষের আবেগের সবচেয়ে বড় উৎসব। কিন্তু সেই আবেগই এখন সবচেয়ে বড় ব্যবসায়িক অস্ত্র। মানুষ প্রিয় দলের খেলা দেখতে চায়, প্রিয় খেলোয়াড়ের জার্সি পরতে চায়, ফাইনালের টিকিট হাতে পেতে চায়। আর সেই আবেগকে কাজে লাগিয়েই গড়ে উঠছে এই অন্ধকার অর্থনীতি।