Print Date & Time : 07 November 2026 Saturday 04:51 pm

দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে বাসডুবি: আমাদের দায় কতটুকু?

image

শফিকুল ইসলাম শামীম

পদ্মার বুক চিরে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে প্রতিদিন হাজারো মানুষের যাতায়াত। একসময় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষের রাজধানীর সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান সেতুবন্ধন ছিল এই নৌপথ। পদ্মা সেতু চালুর পর সেই চাপ অনেকটাই কমেছে। কিন্তু গুরুত্ব কি কমেছে মানুষের জীবনের? নিরাপত্তার প্রশ্ন কি গুরুত্ব হারিয়েছে? সাম্প্রতিক একের পর এক দুর্ঘটনা আমাদের সামনে সেই প্রশ্নই নতুন করে তুলে ধরছে।

শুক্রবার (৫ জুন) দৌলতদিয়া ৭ নম্বর ফেরিঘাটে যাত্রীবাহী একটি বাস নদীতে ডুবে যায়। এর মাত্র আড়াই মাস আগে ২৫ মার্চ দৌলতদিয়া ৩ নম্বর ফেরিঘাটে যাত্রীবাহী বাস সৌহাদ্য পরিবহন নদীতে পড়ে প্রাণ হারান ২৬ জন মানুষ।

এরও আগে ২০২৪ সালের ১৭ জানুয়ারি ঘন কুয়াশায় বাল্কহেডের ধাক্কায় ডুবে যায় ইউটিলিটি ফেরি রজনীগন্ধা। আর ২০১৫ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি এমভি মোস্তফা লঞ্চডুবিতে ১৫ শিশুসহ প্রায় ৭০ জন নারী-পুরুষের প্রাণহানি ঘটে।

প্রতিটি দুর্ঘটনার পর একই দৃশ্য। শোক, আহাজারি, উদ্ধার অভিযান, তদন্ত কমিটি গঠন, কিছুদিন আলোচনা-সমালোচনা। তারপর সবকিছু আবার আগের মতো। যেন মানুষের জীবন এখানে পরিসংখ্যানের একটি সংখ্যা মাত্র। প্রশ্ন হলো, এই মৃত্যুর দায় কার? কেবল চালকের? ঘাট কর্তৃপক্ষের? নৌপরিবহন সংশ্লিষ্টদের? নাকি আমাদের সবার?

বাংলাদেশে বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলেই তদন্ত কমিটি গঠনের একটি সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। কিন্তু সেই তদন্তের ফলাফল কতটুকু জনসম্মুখে আসে? কতজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়? কতজন প্রকৃত অপরাধী শাস্তি পায়? এর উত্তর খুঁজতে গেলে হতাশ হতে হয়। কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তদন্ত প্রতিবেদন ফাইলের স্তপে চাপা পড়ে যায়। দায় নির্ধারণের চেয়ে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাকে ভুলে যাওয়ার প্রবণতাই যেন বেশি শক্তিশালী।

দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে দুর্ঘটনার ইতিহাস নতুন নয়। বছরের পর বছর ধরে একই ধরনের সমস্যা চলে আসছে। ঘাট ব্যবস্থাপনায় অব্যবস্থা, নিরাপত্তা ঘাটতি, পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব, নাব্যতা সংকট, ঘন কুয়াশায় ঝুঁকিপূর্ণ চলাচল, যানবাহন ওঠানামায় সমন্বয়হীনতা সবকিছুই বারবার সামনে এসেছে। কিন্তু স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ খুব কমই চোখে পড়ে।

প্রশ্ন হলো, একটি বাস কীভাবে ফেরিঘাট থেকে নদীতে পড়ে যায়? এটি কি শুধুই দুর্ঘটনা? নাকি নিরাপত্তা ব্যবস্থার চরম ব্যর্থতা? একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাটে যদি পর্যাপ্ত ব্যারিয়ার, সতর্কতামূলক ব্যবস্থা, প্রশিক্ষিত কর্মী, ফিটনেস ফেরি ও নৌযান এবং আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তি থাকত, তাহলে কি এমন ঘটনা ঘটত ? এই যাত্রায় একটু বাড়তি সতর্কতার কারণে যাত্রীবাহী বাসে থাকা ৩৮জন যাত্রী প্রাণে বেঁচে যায়। 

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নদীপথ ও ফেরিঘাট ব্যবস্থাপনায় কঠোর নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়। যাত্রী ও যানবাহনের প্রতিটি চলাচল নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে থাকে। কিন্তু আমাদের দেশে অনেক ক্ষেত্রেই নিয়মের চেয়ে অভ্যাস বেশি শক্তিশালী। আর সেই অভ্যাসের মূল্য দিতে হয় সাধারণ মানুষকে।

সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, নিহতদের অধিকাংশই সাধারণ মানুষ। কেউ কর্মস্থলে যাচ্ছিলেন, কেউ বাড়ি ফিরছিলেন, কেউ পরিবারের জন্য জীবিকার সন্ধানে পথে নেমেছিলেন। তাদের কেউই জানতেন না, একটি যাত্রাই হবে জীবনের শেষ যাত্রা। একটি দুর্ঘটনা কেবল কয়েকজন মানুষের মৃত্যু নয়। এর সঙ্গে ধ্বংস হয়ে যায় বহু পরিবারের স্বপ্ন, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ।

যে শিশুটি বাবাকে হারায়, যে মা সন্তানকে হারান, যে স্ত্রী স্বামীকে হারান কিংবা যে বৃদ্ধ পুত্রের লাশের অপেক্ষায় থাকেন। তাদের ক্ষতির পরিমাণ কোনো ক্ষতিপূরণ দিয়ে পূরণ করা যায় না। সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংখ্যা হয়তো কয়েকদিন আলোচনায় থাকে, কিন্তু স্বজন হারানো পরিবারের কান্না বহু বছর ধরে চলতে থাকে।

দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুট থেকে সরকার প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আয় করে। যানবাহন পারাপার, টোল, বিভিন্ন ফি সব মিলিয়ে এটি এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক করিডর। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সেই আয়ের কতটুকু নিরাপত্তা উন্নয়নে ব্যয় করা হয়? কতটুকু অবকাঠামো আধুনিকীকরণে বিনিয়োগ করা হয়? যাত্রী নিরাপত্তাকে কতটা অগ্রাধিকার দেওয়া হয়?

রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু রাজস্ব আদায় নয়। মানুষের জীবন রক্ষা করাও রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। একটি দুর্ঘটনার পর ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করা সহজ। কিন্তু দুর্ঘটনা প্রতিরোধের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা অনেক বেশি জরুরি।

আমরা প্রায়ই বলি, দুর্ঘটনা বলে কয়ে আসে না। কথাটি আংশিক সত্য। কিন্তু অধিকাংশ দুর্ঘটনার পেছনে কিছু না কিছু অবহেলা, গাফিলতি বা ত্রুটি থাকে। নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা, দায়িত্বে অবহেলা কিংবা তদারকির অভাব অনেক সময় দুর্ঘটনাকে অবশ্যম্ভাবী করে তোলে। তাই সব দুর্ঘটনাকে ভাগ্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া দায়িত্ব এড়ানোর একটি সহজ উপায় মাত্র।

দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে এখন সময় এসেছে নতুন করে ভাবার। প্রয়োজন আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, কার্যকর তদারকি, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং দায়বদ্ধ প্রশাসনিক কাঠামো। দুর্ঘটনার পর তদন্ত নয়, দুর্ঘটনার আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। ঘাট পরিচালনায় জবাবদিহিতা বাড়াতে হবে। অবহেলার প্রমাণ মিললে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জনসচেতনতা। চালক, ঘাটকর্মী, যাত্রীসহ সবারই দায়িত্ব রয়েছে। নিয়ম মেনে চলা, ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ এড়িয়ে যাওয়া এবং নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কারণ নিরাপদ যাত্রা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়। এটি একটি সম্মিলিত দায়িত্ব।

আজ দৌলতদিয়ায় যে পরিবার স্বজন হারিয়েছে, আগামীকাল সেই জায়গায় অন্য কোনো পরিবারও দাঁড়িয়ে যেতে পারে। তাই এই মৃত্যুগুলোকে কেবল সংবাদ শিরোনাম হিসেবে দেখলে চলবে না। এগুলো আমাদের রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা, প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা এবং মানবিক বিবেকের পরীক্ষাও।

দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটের প্রতিটি দুর্ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অবহেলারও মূল্য আছে। আর সেই মূল্য সবচেয়ে বেশি দেয় সাধারণ মানুষ। প্রশ্ন হলো, আর কত মৃত্যু হলে আমরা শিক্ষা নেব? আর কত তদন্ত কমিটি হলে আমরা দায় নির্ধারণ করব? আর কত পরিবার স্বজন হারালে আমরা নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেব?

পদ্মার বুকে হারিয়ে যাওয়া প্রতিটি প্রাণ আজ আমাদের কাছে জবাব চাইছে। সেই জবাব শুধু সরকারের নয়, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নয়, আমাদের সবার। কারণ নীরবতা কখনো কখনো দায়মুক্তি নয়। নীরবতাও এক ধরনের দায়।

দৌলতদিয়ার সাম্প্রতিক বাসডুবির ঘটনা তাই শুধু একটি দুর্ঘটনার সংবাদ নয়। এটি আমাদের দায়িত্ববোধ, জবাবদিহিতা এবং মানবিকতার আয়নায় নিজেদের মুখ দেখার একটি সুযোগ। এখন সিদ্ধান্ত আমাদের। আমরা কি আবারও কয়েকদিন আলোচনা করে সব ভুলে যাব, নাকি এবার সত্যিই পরিবর্তনের পথে হাঁটব?

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী