Print Date & Time : 21 October 2026 Wednesday 04:38 pm

বাজার তদারকি ও প্রতিযোগিতার অভাবে ভোক্তারা প্রকৃত সুবিধা পান না

image

এ এইচ এম সফিকুজ্জামান কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) বর্তমান সভাপতি এবং সাবেক সচিব। দেশের বর্তমান বাজার পরিস্থিতি, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও জ্বালানি সংকট নিয়ে কথা বলেছেন ‘জাতীয় অর্থনীতি’র সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সানজিদ সকাল 


জাতীয় অর্থনীতি:  বাজারে সবজির আমদানি থাকলেও দাম কেন এত বেশি? নিম্ন ও মধ্যবিত্তের কাছে নিত্যপণ্যের দাম ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে— এর কারণ কী বলে মনে করেন?


এ এইচ এম সফিকুজ্জামান: নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের কাছে নিত্যপণ্যের দাম ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাওয়ার পেছনে একক কোনো কারণ নেই; বরং এটি অর্থনীতি, বাজারব্যবস্থা, জ্বালানি খাত, বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের ভারসাম্যহীনতার সমন্বিত ফল। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে দ্রব্যমূল্য যেভাবে বেড়েছে, মানুষের আয় সেই অনুপাতে বাড়েনি। ফলে বাস্তব আয় বা প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলের চাকরিজীবী, নিম্নআয়ের শ্রমজীবী এবং সীমিত আয়ের মধ্যবিত্ত পরিবার সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে।

সবচেয়ে বড় চাপ তৈরি হয়েছে খাদ্যপণ্যে। চাল, ডাল, তেল, সবজি, মাছ, মাংস, ডিম— প্রায় প্রতিটি পণ্যের দাম গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে কৃষক মাঠে টমেটো বা বেগুন ২০ থেকে ৩০ টাকা কেজিতে বিক্রি করছেন, কিন্তু শহরের খুচরা বাজারে সেই একই পণ্য ৮০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যে বিশাল মূল্য ব্যবধান তৈরি হচ্ছে, যার বড় অংশ চলে যাচ্ছে পরিবহন ব্যয়, আড়তদার, মধ্যস্বত্বভোগী এবং খুচরা পর্যায়ের অতিরিক্ত মুনাফায়।

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পুরো বাজারব্যবস্থার ওপর বড় প্রভাব ফেলেছে। ডিজেলের দাম বাড়লে কৃষিপণ্য পরিবহন ব্যয় বাড়ে, ট্রাক ভাড়া বাড়ে, সেচ ব্যয় বাড়ে, এমনকি বাজারে পণ্য সংরক্ষণের খরচও বেড়ে যায়। একইসঙ্গে বিদ্যুতের সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধি উৎপাদন, কোল্ড স্টোরেজ ও সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যয় আরও বাড়তে পারে। ফলে এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত নিত্যপণ্যের বাজারমূল্যের ওপর গিয়ে পড়বে।

বৈশ্বিক পরিস্থিতিও বাংলাদেশের বাজারে চাপ তৈরি করছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক খাদ্য ও জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে আমদানিনির্ভর পণ্যগুলোর ব্যয়ও বেড়েছে। বাংলাদেশ যেহেতু ভোজ্যতেল, জ্বালানি, গমসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভর, তাই আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব সরাসরি স্থানীয় বাজারে পড়ছে।

এ ছাড়া বাজার ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, কৃত্রিম সংকট, অতিরিক্ত মজুদ এবং সিন্ডিকেট প্রবণতার অভিযোগও দীর্ঘদিনের। অনেক সময় বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও উচ্চ মুনাফার কারণে দাম কমানো হয় না। কার্যকর বাজার তদারকি ও প্রতিযোগিতার অভাবের ফলে ভোক্তারা প্রকৃত সুবিধা পান না।

বর্তমানে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় অংশকে আয় ও ব্যয়ের মধ্যে কঠিন সমন্বয় করতে হচ্ছে। অনেক পরিবার আগের মতো মাছ, মাংস বা পুষ্টিকর খাবার কিনতে পারছেন না। কেউ সঞ্চয় ভাঙছে, কেউ ঋণ করছে, আবার কেউ চিকিৎসা বা শিক্ষার ব্যয় কমিয়ে দিচ্ছে। এটি শুধু অর্থনৈতিক সংকট নয়; এটি মানুষের জীবনমান, পুষ্টি ও ভবিষ্যৎ সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও একটি বড় উদ্বেগের বিষয়।


জাতীয় অর্থনীতি: এলপি গ্যাসের দাম নির্ধারণ করে দিলেও বাজারে দাম অনেক বেশি। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযান কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন?


এ এইচ এম সফিকুজ্জামান: বাংলাদেশে বর্তমানে এলপি গ্যাসের ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। শিল্প খাতের হিসাব অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ১৭ থেকে ১৮ লাখ টন এলপিজি ব্যবহার হয়, যার প্রায় ৮০ শতাংশই গৃহস্থালি খাতে ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে যেসব এলাকায় পাইপলাইনের গ্যাস নেই, সেখানে রান্নার কাজে এলপিজির ওপর নির্ভরতা দ্রুত বেড়েছে। 

কিন্তু বাস্তবে সরকার বা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত দাম অনুযায়ী অধিকাংশ ভোক্তা গ্যাস কিনতে পারছেন না। বিইআরসি মে মাসে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৯৪০ টাকা নির্ধারণ করলেও দেশের বিভিন্ন এলাকায় সে দামে সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে না। কোথাও কোথাও ভোক্তাদের আরও বেশি মূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে।

এখানে মূল সমস্যা হলো বাজার তদারকির দুর্বলতা এবং ডিলার পর্যায়ে জবাবদিহির অভাব। অনেক ব্যবসায়ী পরিবহন ব্যয়, সরবরাহ সংকট বা অতিরিক্ত চাহিদার অজুহাতে বাড়তি দাম আদায় করেন। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে এটি অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের কৌশলে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বাজার তদারকি তুলনামূলক কম থাকায় ভোক্তাদের বেশি ক্ষতির মুখে পড়তে হয়।

বাংলাদেশের এলপিজি বাজার পুরোপুরি আমদানিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতাও সরাসরি প্রভাব ফেলছে। দেশের অধিকাংশ এলপিজি মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করা হয় এবং এর দাম আন্তর্জাতিক বাজারের দামের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা, জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বা সরবরাহ ব্যাহত হলে তার প্রভাব সরাসরি বাংলাদেশের বাজারে পড়ে। 

জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযান এই পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিভিন্ন সময়ে অধিদপ্তরের অভিযানে অতিরিক্ত দামে গ্যাস বিক্রির অভিযোগে জরিমানা করা হয়েছে। এসব অভিযান ব্যবসায়ীদের মধ্যে কিছুটা হলেও সতর্কতা তৈরি করে এবং বাজারে একটি নিয়ন্ত্রণমূলক বার্তা দেয়। তবে শুধু মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার সমাধান করা কঠিন।

এক্ষেত্রে নিয়মিত বাজার তদারকি আরও জোরদার করতে হবে। প্রতিটি দোকানে সরকার নির্ধারিত মূল্য দৃশ্যমান স্থানে টাঙিয়ে রাখা বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন, যাতে ভোক্তারা সহজেই নির্ধারিত দাম জানতে পারেন। একইসঙ্গে ডিলার ও পরিবেশক পর্যায়ে ডিজিটাল নজরদারি ব্যবস্থা চালু করা গেলে অতিরিক্ত মূল্য আদায় অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।


জাতীয় অর্থনীতি: হাওড়াঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় ধান বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে। এতে চালের দাম বাড়বে। দেশে চালের দাম স্বাভাবিক রাখা ও কৃষকদের উন্নয়নে কী উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে বলে মনে করেন?


এ এইচ এম সফিকুজ্জামান: বাংলাদেশে চাল শুধু একটি খাদ্যপণ্য নয়; এটি দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। দেশের মোট চাল উৎপাদনের ৬০ শতাংশের বেশি আসে বোরো মৌসুম থেকে এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি হাওড় জেলা একাই প্রায় ২০ শতাংশ বোরো উৎপাদন করে। ফলে হাওড়াঞ্চলের সামান্য ক্ষতিও জাতীয় খাদ্য সরবরাহে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

এবার টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে হাওড়াঞ্চলের বিস্তীর্ণ জমির ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। সরকারি হিসাবে প্রায় ৫০ হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যদিও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার মতে ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে। এতে প্রায় আড়াই লাখ কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন এবং দুই লাখ ৫০ হাজার টনের মতো বোরো উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের চালের বাজার অত্যন্ত সংবেদনশীল। কারণ হাওড়ের চাল মৌসুমের শুরুতেই বাজারে আসে এবং সরবরাহ বাড়ায়। এই অংশে ঘাটতি তৈরি হলে প্রথমে স্থানীয় বাজারে এবং পরে জাতীয় পর্যায়ে চালের দাম বাড়ার চাপ সৃষ্টি হতে পারে। অতীতেও এমন উদাহরণ দেখা গেছে। ২০১৭ সালের আগাম বন্যায় প্রায় দুই লাখ হেক্টর জমির বোরো ধান নষ্ট হয়েছিল এবং ওই বছর চালের দাম রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছিল।

বর্তমানে দেশের খাদ্য মজুদ কিছুটা স্বস্তিদায়ক অবস্থায় থাকলেও পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বাজারে চাপ বাড়তে পারে। বিশেষ করে অনেক সাধারণ মানুষ চালের দাম বাড়ার আশঙ্কায় অতিরিক্ত মজুদ করতে শুরু করলে বাজার আরও অস্থির হয়ে উঠতে পারে। একইসঙ্গে আমদানি-নির্ভরতার চাপও বাড়তে পারে। চলতি অর্থবছরেই বাংলাদেশকে প্রায় ১২ লাখ টন চাল আমদানি করতে হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দ্রুত সহায়তা দেওয়া। শুধু ত্রাণ দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়; কৃষকদের জন্য সহজশর্তে ঋণ, ক্ষতিপূরণ, কৃষি বিমা এবং সরাসরি সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা প্রয়োজন। থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও ভারতের মতো দেশগুলোয় কৃষিবিমা ও সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা তুলনামূলক শক্তিশালী হওয়ায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় কৃষকরা কিছুটা সুরক্ষা পান। বাংলাদেশেও শস্যবিমা সম্প্রসারণ এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। একইসঙ্গে জলবায়ু সহনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন, টেকসই বাঁধ নির্মাণ, আধুনিক পানি ব্যবস্থাপনা এবং কৃষকদের সরাসরি সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার আওতায় আনার মাধ্যমে কৃষিকে আরও সুরক্ষিত ও স্থিতিশীল করা প্রয়োজন।

দীর্ঘমেয়াদে হাওড়াঞ্চলের জন্য টেকসই বাঁধ, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা, যান্ত্রিক হারভেস্টার সম্প্রসারণ এবং জলবায়ু সহনশীল ধানের জাত উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। একইসঙ্গে অঞ্চলভিত্তিক কৃষি পরিকল্পনা, ফসল বহুমুখীকরণ এবং আমন মৌসুমে উৎপাদন বাড়ানোর দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। খাদ্য নিরাপত্তা এখন শুধু উৎপাদনের বিষয় নয়; এটি জলবায়ু পরিবর্তন, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং কৃষকের টিকে থাকার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।


জাতীয় অর্থনীতি:  বাজারের ফার্মাসিতে ওষুধের দাম অনেক বেশি নেওয়া হয়। অনেক ওষুধ মেয়াদোত্তীর্ণ পাওয়া যায়। ভোক্তা অধিকার অভিযান থাকলেও তা দূর হচ্ছে না। এ ব্যাপারে আপনার অভিমত কী?


এ এইচ এম সফিকুজ্জামান: বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উল্লেখ্যযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। দেশের প্রায় ৯৮ শতাংশ ওষুধ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয় এবং বিশ্বের অনেক দেশে রপ্তানি করা হয়। এটি দেশের জন্য একটি বড় অর্জন। কিন্তু খুচরা বাজারে এখনও অতিরিক্ত দাম আদায়, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রি এবং অনিয়মের অভিযোগ উদ্বেগজনকভাবে রয়ে গেছে। ফলে একদিকে ওষুধ শিল্পের অগ্রগতি রয়েছে, অন্যদিকে সাধারণ ভোক্তা ও রোগীদের মধ্যে আস্থার সংকটও তৈরি হচ্ছে।

বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমে দেখা গেছে, রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলার ফার্মেসিতে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ উদ্ধার করা হচ্ছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের চেয়ে বেশি দাম নেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। বিশেষ করে সংকটকালীন কিছু জীবনরক্ষাকারী ওষুধের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। অনেক ক্ষেত্রে রোগীরা জরুরি প্রয়োজনের কারণে অতিরিক্ত দাম দিয়েও ওষুধ কিনতে বাধ্য হন।

জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করলেও সমস্যার মূল কারণগুলো পুরোপুরি দূর করা যাচ্ছে না। কারণ দেশের অসংখ্য ফার্মাসির তুলনায় তদারকি সক্ষমতা এখনও সীমিত। এছাড়া লাইসেন্সবিহীন বা অপ্রশিক্ষিত ব্যক্তির মাধ্যমে পরিচালিত ফার্মাসির সংখ্যাও কম নয়। ফলে অনেক ক্ষেত্রে ওষুধ সংরক্ষণ, বিক্রি ও মেয়াদ নিয়ন্ত্রণের নিয়ম যথাযথভাবে মানা হয় না।

এ ছাড়া ভোক্তাদের সচেতনতার অভাবও একটি বড় কারণ। এখনও অনেক মানুষ ওষুধ কেনার সময় রসিদ নেন না, মেয়াদ যাচাই করেন না বা নির্ধারিত মূল্য সম্পর্কে খোঁজ নেন না। ফলে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়। ভারতের কিছু অঞ্চলে এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও বারকোড স্ক্যানিংয়ের মাধ্যমে ওষুধের মেয়াদ ও সরবরাহ পর্যবেক্ষণ করা হয়। বাংলাদেশেও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির ব্যবস্থা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

স্বাস্থ্যসেবা খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে ওষুধের বাজারে কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। একইসঙ্গে নিয়মিত বাজার তদারকি, লাইসেন্সিং ব্যবস্থার কঠোর প্রয়োগ এবং ভোক্তাদের সচেতনতা বৃদ্ধি-এই তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে গুরুত্ব দিতে হবে।


জাতীয় অর্থনীতি:  তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। তার পরও ফিলিং স্টেশনে তেল পাওয়া যাচ্ছে না। এর কারণ কী? বাংলাদেশের তেলের সংকট কাটাতে সরকার কী পদক্ষেপ নিতে পারে?


এ এইচ এম সফিকুজ্জামান: বাংলাদেশের জ্বালানি খাত দীর্ঘদিন ধরেই বৈশ্বিক বাজারের ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি, ডলারের সংকট এবং আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি দেশের বাজারে পড়ে। কিন্তু শুধু বৈশ্বিক কারণ দিয়েই বর্তমান পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করা যাবে না।

অতীতে একাধিকবার দেখা গেছে, দাম সমন্বয়ের আগেই বাজারে তেল সংকট তৈরি হয়েছে। কিছু ফিলিং স্টেশনে সরবরাহ কমে গেছে, আবার কোথাও সীমিত বিক্রি করা হয়েছে। বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা ভবিষ্যৎ মূল্যবৃদ্ধির আশায় মজুদ বাড়ান বা সরবরাহ কমিয়ে দেন। এতে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়।

২০২২ সালে শ্রীলঙ্কার জ্বালানি সংকট পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা ছিল। সেখানে বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, দুর্বল জ্বালানি পরিকল্পনা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার সমস্যা দেশের অর্থনীতিকে বড় সংকটে ফেলে দেয়। বাংলাদেশ এখনও সেই পর্যায়ে না গেলেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশে বর্তমানে জ্বালানি আমদানির জন্য বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়। তাই কৌশলগত জ্বালানি মজুদ গড়ে তোলা, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং সরবরাহ ব্যবস্থাকে ডিজিটাল মনিটরিংয়ের আওতায় আনা জরুরি। একইসঙ্গে বাজারে কোথায় কত তেল মজুদ আছে এবং কোথায় সরবরাহ কম—এসব তথ্য রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণ করতে পারলে সংকট অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।


জাতীয় অর্থনীতি: তেল ও গ্যাস খাতে দুর্নীতি রোধ ও সুশাসন কতটুকু দরকার বলে মনে করেন? কীভাবে সম্ভব?


এ এইচ এম সফিকুজ্জামান: তেল ও গ্যাস খাত একটি দেশের অর্থনীতি, শিল্পায়ন ও জ্বালানি নিরাপত্তার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খাত। এই খাতে দুর্নীতি, লুণ্ঠন ও অনিয়ম হলে তার প্রভাব শুধু সরকারের আর্থিক ক্ষতিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন ব্যয়, শিল্প উৎপাদন এবং সামগ্রিক দ্রব্যমূল্যের ওপরও এর সরাসরি প্রভাব পড়ে। শেষ পর্যন্ত এর চাপ বহন করতে হয় সাধারণ ভোক্তাকে।

বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি খাতে অস্বচ্ছতা, অতিরিক্ত ব্যয়, অযৌক্তিক মুনাফা এবং লুণ্ঠনমূলক ব্যয়ের অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমলেও দেশের বাজারে সেই সুবিধা পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি— এমন প্রশ্নও উঠেছে। আবার অনেক প্রকল্পে ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিয়ম এবং প্রতিযোগিতাহীন বাজার কাঠামোর কারণেও ভোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত মূল্য চাপ সৃষ্টি হয়েছে।

সুশাসন নিশ্চিত করতে হলে প্রথমেই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতে হবে। জ্বালানি খাতে বিভিন্ন চুক্তি, আমদানি ব্যয়, মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়া এবং ভর্তুকি ব্যবস্থার তথ্য আরও উন্মুক্তভাবে প্রকাশ করা জরুরি। একইসঙ্গে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের মতো নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে আরও কার্যকর, স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলকভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। জ্বালানি খাতে লুণ্ঠনমূলক ব্যয়, অযৌক্তিক খরচ এবং অপচয়ের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন নিশ্চিত না করলে শুধু দাম বাড়িয়ে সংকট সমাধান সম্ভব নয়।

পাশাপাশি আমদানি, সংরক্ষণ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, নিয়মিত অডিট এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজারব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। কারণ জ্বালানি খাতে সুশাসন শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়; এটি ভোক্তার অধিকার, ন্যায্যমূল্য এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।


[প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, অনুবাদ, প্রতিক্রিয়া ও চিঠিপত্রে প্রকাশিত মতামত, উপস্থাপিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের যথার্থতা ও মতামতের দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব। এগুলোর সঙ্গে জাতীয় অর্থনীতির সম্পাদকীয় নীতি বা অবস্থানের সর্বদা মিল না-ও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখার বিষয়ে জাতীয় অর্থনীতি কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিরপেক্ষ]