Print Date & Time : 20 October 2026 Tuesday 06:46 am

দেশের উন্নয়নে ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়াকে একে অপরের পরিপূরক হতে হবে

image

কৃষিবিজ্ঞানী, অধ্যাপক ও অনুষদ প্রধান, কৃষি অনুষদ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি। এর আগে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। তার প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় বাউ-জার্মপ্লাজম। প্রায় ১৭ বছর গবেষণা করে উদ্ভাবন করেন ‘বাউকুল-১’। কৃষিতে অবদানের জন্য তিনি ‘হুজ হু বাংলাদেশে ২০১৭’ পদক, বৃক্ষরোপণে অবদানের জন্য ২০০৪, ২০১২ ও ২০১৩ সালে প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় পুরস্কার, নোবেল বিজয়ী ড. নরম্যান ই. বোরলগ আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্মাননা-২০০৮, বঙ্গবন্ধু কৃষি পদক-২০১৪, বাংলাদেশ একাডেমি অব এগ্রিকালচার স্বর্ণপদক-২০১৬ এবং বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্স স্বর্ণপদক-২০১২ সহ দেশি-বিদেশি নানা সম্মাননা অর্জন করেছেন। কৃষি গবেষণায় অবদানের জন্য সরকার ২০২৬ সালে তাকে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করে। খাদ্য নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন চ্যালেঞ্জ, কৃষি ও শিল্পের সম্পর্ক জোরদারে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর করণীয়, যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম, মাঠপর্যায়ে নতুন জাতের ব্যবহারসহ নানা ইস্যুতে কথা বলেছেন জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গে।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দিদারুল হক

 

জাতীয় অর্থনীতি: আপনি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে দেশের বৃহত্তম ও আন্তর্জাতিকভাবে দ্বিতীয় ফলের জার্মপ্লাজম প্রতিষ্ঠা করেছেন। এ জার্মপ্লাজমের মাধ্যমে দেশে কতকগুলো ফলের জাত উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ করতে সক্ষম হয়েছেন?

এম এ রহিম:বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৯২ সালে এসডিজির অর্থায়নে জার্মপ্লাজম সেন্টারটির কার্যক্রম শুরু হয়। সেসময় আমার সঙ্গে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক সম্পৃক্ত ছিলেন। এই সেন্টারে আমি শুরু থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত সম্পৃক্ত ছিলাম। এই জার্মপ্লাজম সেন্টারে ১১ হাজারের বেশি জাত সংরক্ষণ করা আছে। এসব সংরক্ষিত জাত কৃষি খাতের উন্নয়নে বিশাল ভূমিকা রাখছে। ইতোমধ্যে ১২৮টি জাত নিবন্ধন করা হয়েছে। এসব জাত কৃষি উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা ও আর্থিক সামাজিক প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

 

জাতীয় অর্থনীতি: আপনার কর্মকাণ্ড ভবিষ্যতে এগিয়ে নেওয়ার জন্য তরুণ বিজ্ঞানীদের কতটুকু তৈরি করতে পেরেছেন? এ বিষয়ে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

এম এ রহিম:এটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তরুণ বিজ্ঞানী আছে। কিন্তু সবাই উদ্যম নিয়ে এগিয়ে আসে না। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সঙ্গে আমার অনেক সহকর্মী ছিলেন। বর্তমান কর্মস্থল ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতেও অনেকেই আছেন। কিছু কিছু সহকর্মী কাজ করছেন। আমাকে অনুসরণ করছেন। কিন্তু সার্বক্ষণিক মাঠে ঘাটে কৃষক-উদ্যোক্তাদের সঙ্গে সময় দেওয়ার মতো তরুণ কৃষি বিজ্ঞানী নেই। এখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তারা টেবিল ওয়ার্ক বা শহরে বসে বা অফিসে বসে কাজ করছে। এর মধ্যে অনেকে আছে, যারা মাঠে কাজ করছে; আমার শতাধিক পিএইচডি ছাত্রের অনেকেই ভালো গবেষণা করছে এবং ভালো জাত উৎপাদন করছে।

 

জাতীয় অর্থনীতি: খাদ্যনিরাপত্তাসহ একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারে?

এম এ রহিম:অবশ্যই এক্ষেত্রে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভূমিকা রাখছে। স্বাধীনতা-উত্তর দেশে সাড়ে সাত কোটি মানুষ ছিল তখন খাদ্য সংকট ছিল। ১৯৭৪-৭৫ সালে দুর্ভিক্ষ ছিল ও খাদ্যের অভাব ছিল। এখন ১৮ কোটির বেশি মানুষ। জমি কমে গেছে। জমি কিন্তু বাড়েনি। এই সীমিত জমির ভেতরে বর্ধিত জনগোষ্ঠীর খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে ফসলের বিভিন্ন জাত ও প্রযুক্তি ভূমিকা রাখছে। আমাদের কৃষিবিদরা ফসল, প্রাণিসম্পদ ও মৎস্যসম্পদে ভূমিকা রাখছে। তাদের অবদানের কারণেই মৎস্য ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বে চতুর্থ অবস্থানে এবং সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশ অষ্টম অবস্থানে। ছোট একটি দেশ অর্থনৈতিকভাবে তেমন শক্তিশালী না হলেও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও বিজ্ঞানীরা অক্লান্ত পরিশ্রমে খাদ্য নিরাপত্তায় ভূমিকা রাখছে। কোভিড-১৯ মহামারির সময়ে বিশ্বের অনেক দেশেই খাদ্য সংকট দেখা গিয়েছিল। আমদানি সমস্যা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে খাদ্য সংকট দেখা যায়নি। আমাদের কৃষিবিদরা মাঠে ছিল। অন্যান্য খাতের মতো কোভিডের ভয়ে তারা ঘরে বসে থাকেনি। প্রাকৃতিক দুর্যোগে হাওড় অঞ্চলে অনেক ধান নষ্ট হয়। যখন ৮০ শতাংশ ধান পেকে যায় তখন যদি আমরা ধান কেটে ফেলতে পারতাম তাহলে বড় ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হতো। যা-ই হোক, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষের নিয়ন্ত্রণে নেই। কিন্তু এ ব্যাপারে এখান থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে ৮০ শতাংশ ধান পেকে গেলে কেটে ফেলতে হবে। কারণ যে কোনো সময় ঢালের পানি, অতিবৃষ্টি বা বন্যা আসতে পারে। তাই আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে রাখা উচিত। আগাম উদ্যোগ নেওয়া হলে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।

 

জাতীয় অর্থনীতি: কৃষি ও শিল্পের সম্পর্ক জোরদারে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর করণীয় কী?

এম এ রহিম:এখন সারা বিশ্বে কৃষিকে শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। পৃথিবী যতই উন্নত হোক যতই সুপারসনিক হোক না কেন— মানুষকে খাবার খেতেই হবে। সেটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প থেকে শুরু করে আমার দেশে বস্তিবাসী হোক না কেন, তাদের খাবার গ্রহণ করতেই হবে। মানুষ না খেয়ে থাকতে পারবে না। ভাত, রুটি বা সবজি যা-ই হোক, মানুষকে খেতে হবে। কাজেই খাদ্য উৎপাদনে কৃষির ভূমিকা অপরিসীম। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ কৃষিপণ্যগুলো বিভিন্ন ফর্মে প্রক্রিয়াজাত করে নিয়ে আসছে। কৃষিপণ্য থেকে প্রক্রিয়াজাত পণ্য তৈরি করছে শিল্প। আম জেলি বা ম্যাংগো বার তৈরি করছে দেশের বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান। আমাদের কোম্পানিগুলো ম্যাংগো বার দিয়ে বিরাট ব্যবসা করছে। থাইল্যান্ডে আনারস ও আম স্লাইস করে ভ্যাকুয়াম ড্রয়ারে রাখছে। এমনকি ভিয়েতনামে কচু বা বড় কচু স্লাইস করে তা থেকে চিপস বা ফ্রাইড করছে। এভাবে তারা কোটি কোটি টাকার ব্যবসা করছে। কাজেই খাদ্যনিরাপত্তায় ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া যদি পাশাপাশি না আসে আর একটা আরেকটার পরিপূরক না হয়, তাহলে কিন্তু এদেশে উন্নয়ন হবে না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় অনেক পণ্য, সবজি বা ফল অতিরিক্ত যখন হয় তখন সেগুলো নষ্ট হয়। আমরা প্রক্রিয়াকরণে গেলে সেগুলো অফসিজনে ব্যবহার করা সম্ভব। বিদেশে রপ্তানি করতে পারি। এর মাধ্যমে উদ্যোক্তা তৈরি হতে পারে। এক্ষেত্রে কৃষি শিল্প বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে।

 

জাতীয় অর্থনীতি: দেশের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠ্যক্রম অনেক পুরোনো। বর্তমান যুগের সঙ্গে তালমিলিয়ে পাঠ্যক্রম কোনো সংস্কার করা দরকার আছে কি না?

এম এ রহিম:হ্যাঁ, অবশ্যই। যুগের চাহিদার সঙ্গে তালমিলিয়ে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠ্যক্রমে পরিবর্তন আনা জরুরি। কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, তারা পাঠ্যক্রমে হাত দেয় না। তবে বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) হেকেপ প্রজেক্টের অধীনে পাঠ্যক্রমে পরিবর্তন আসছে। এখন পাঠ্যক্রমে আউটকাম বেজড এডুকেশন গুরুত্ব পাচ্ছে। বেশিরভাগ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্যক্রম পরিবর্তন হয়েছে। তবে আমাদের থেমে থাকলে চলবে না। যুগের চাহিদা অনুযায়ী পাঠ্যক্রমকে সময়ে সময়ে পরিবর্তন করতে হবে। শিল্প ও জনগণের চাহিদা এবং খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তার চাহিদা অনুযায়ী পাঠ্যক্রমকে বাস্তবমুখী করতে হবে। এ ব্যাপারে সরকারকে অর্থনৈতিক সুবিধা দিতে হবে।

 

 

জাতীয় অর্থনীতি: বাংলাদেশে অনেক ফসলের নতুন জাতের উদ্ভাবন হয়েছে। এগুলোর মাঠপর্যায়ে ব্যবহার কেমন হচ্ছে?

এম এ রহিম:আমাদের ১২৮টি জাতের কথাই বলছি। এসব জাত কিন্তু মাঠে যায়। এখন বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাসে বাড়ির সবাই আম খাবে, লিচু খাবে। কিন্তু ডায়াবেটিক রোগী খেতে পারবে না বা খেতে দেওয়া হয় না। সে ক্ষেত্রে আমরা একটা ডায়াবেটিক ম্যাঙ্গোর জাত উন্নয়ন করেছি। সুগার ফ্রি। ডায়াবেটিক রোগীরা এটা খেতে পারবে। আমরা কিছু নাভি জাত করেছি। কিছু আগাম জাত করেছি। যাতে মানুষ নাভি বা আগাম খেতে পারে। তারপর আমরা সিডলেস ভ্যারাইটি করেছি, যাতে আবালবৃদ্ধবণিতা সবাই খেতে পারে। আমরা টক পেয়ারা ডেভেলপ করেছি। যেটা দিয়ে আমরা জেলি বানাতে পারি। কাজেই আমরা বিভিন্ন জাত বিভিন্ন উদ্দেশ্য নিয়ে করেছি। যেমন আমরা ২০০৬ সালে প্রথম বাউকুল জাত করেছি। যেটি আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে ভূমিকা রাখছে। হতদরিদ্র বা গ্রামীণ জনপদে তারা বাউকুল চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছে। এর মাধ্যমে পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর গ্রহণ করার পর ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেছি। এখানে এসেও কাঁঠালের নতুন জাত তৈরি করেছি। ইতোমধ্যে চারটি জাতের নিবন্ধন নিয়েছি। চারটি জাতকে বিভিন্ন নাম দিয়েছি। প্রধানমন্ত্রী যে ২৫ কোটি চারা লাগানোর ঘোষণা দিয়েছেন সেখানে আমরা অংশ নিব। আশা করছি বিভিন্ন জাতের প্রায় ১০ লাখ চারা কৃষকের মাঝে বিতরণ করব। ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি কৃষি ক্ষেত্র নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। আশা করছি, মাঠপর্যায়ে আরও ভালো জাতের ব্যবহার হবে। ১৯৭৫-৭৬ সালের পর ধানের শতাধিক জাত এসেছে এবং সেগুলো মাঠপর্যায়ে ব্যবহার হচ্ছে। তবে সব জাত মাঠে যায় না। কৃষকদের জন্য যেসব জাত অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক সেগুলোই মাঠে যায়। আবার কিছু জাত আছে; যেগুলোর ফলন কম হয় কিন্তু এর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি। তখন সেটি নিরাপদ ফসল হিসেবে চাষ করতে বলা হয়। আবার কয়েকটি জাত আছে, সেগুলোয় পুষ্টি অনেক গুণ বেশি। বিভিন্ন উদ্দেশ্য সামনে নিয়ে আমরা নতুন জাত করি। সেই অনুযায়ী সম্প্রসারণের চেষ্টা করা হয়। এ ব্যাপারে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন, সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ফসলের বিভিন্ন জাত সম্প্রসারণে এগিয়ে আসতে হবে। জাত বা প্রযুক্তিগুলো সম্পর্কে সংবাদ মাধ্যমে প্রচার করতে হবে, যাতে ফসলের এসব জাত চাষে সাধারণ কৃষক উদ্বুদ্ধ হয়।

 

[প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, অনুবাদ, প্রতিক্রিয়া ও চিঠিপত্রে প্রকাশিত মতামত, উপস্থাপিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের যথার্থতা ও মতামতের দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব। এগুলোর সঙ্গে জাতীয় অর্থনীতির সম্পাদকীয় নীতি বা অবস্থানের সর্বদা মিল না-ও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখার বিষয়ে জাতীয় অর্থনীতি কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিরপেক্ষ]