Print Date & Time : 28 October 2026 Wednesday 05:43 am

জলাবদ্ধ কুমিল্লায়: বেঞ্চে পা তুলে লিখলো এসএসসি পরীক্ষার্থীরা

image

কুমিল্লা প্রতিনিধি: কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের বিপরীতেই কুমিল্লা ঈশ্বর পাঠশালার (উচ্চবিদ্যালয়) অবস্থান। এ বিদ্যালয়টি চলমান এসএসসি পরীক্ষার একটি কেন্দ্র।

মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) দুপুর ১২টা ১৫ মিনিটে কুমিল্লা ঈশ্বর পাঠশালায় (উচ্চবিদ্যালয়) জলাবদ্ধতার কারণে বেঞ্চে পা তুলে পরীক্ষা দিয়েছে এসএসসি পরীক্ষার্থীরা।

এ সময় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পুরো বিদ্যালয় আঙিনা পানিতে তলিয়ে রয়েছে। পানি প্রবেশ করেছে পরীক্ষার কক্ষেও। মাঠের পশ্চিম পাশের পুরোনো একতলা টিনশেড ভবনটির পুরোটাতেই পানি ঢুকেছে। ভবনটির প্রতিটি কক্ষে বসার বেঞ্চে পা তুলে লিখছে শিক্ষার্থীরা। হল পর্যবেক্ষকের দায়িত্বে থাকা শিক্ষকেরাও চেয়ারে পা তুলে বসে আছে। এসব পানিতে নালার ময়লা ভাসতে দেখা গেছে।

দেড় ঘণ্টার বৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় কুমিল্লা নগরের প্রায় সবখানে এমন অবস্থা দেখা গেছে। সকাল ১০টা থেকে বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত হওয়া বৃষ্টির পানি সড়ক ছাপিয়ে ঢুকেছে মানুষের বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমনকি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও। এতে নগরবাসীর দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। বিশেষ করে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার্থীরা চরম দুর্ভোগে পড়ে।

বছরের পর বছর ধরেই কুমিল্লা নগরবাসীর অন্যতম প্রধান সমস্যা জলাবদ্ধতা। সামান্য বৃষ্টিতেও তলিয়ে যায় নগরের বিভিন্ন এলাকার সড়কগুলো। এই সমস্যা থেকে যেন কিছুতেই মুক্তি মিলছে না।

নগরের বাসিন্দারা বলছেন, ২০১১ সালে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। এরপর থেকে অনুষ্ঠিত প্রতিটি নির্বাচনে প্রার্থীদের প্রধান ইশতেহার ছিল জলাবদ্ধতা আর যানজটমুক্ত কুমিল্লা গড়ার। কিন্তু জলাবদ্ধতার সমস্যা নিরসন শুধু প্রতিশ্রুতিতেই সীমাবদ্ধ ছিল। দুর্ভোগ শেষ হয়নি মানুষের।

নগরের নজরুল অ্যাভিনিউ এলাকার একটি দোকানের মালিক বলেন, সবেমাত্র গ্রীষ্মের শুরুর দিক। এখনই এই অবস্থা হলে আগামী বর্ষায় মানুষের দুর্ভোগ আর কষ্ট কোথায় পৌঁছাবে, সেটি আজকের বৃষ্টি বুঝিয়ে দিয়েছে। নগরের অনত্যম প্রধান নজরুল অ্যাভিনিউ সড়ক যদি এক-দেড় ঘণ্টার বৃষ্টিতে তলিয়ে যায়, তাহলে অন্য সড়কগুলোর কী অবস্থা, সেটি বোঝাই যায়।

কুমিল্লা নগরের কান্দিরপাড়-ঈদগাহ সড়কে বৃষ্টির পানি জমে সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা। সেখানে বিকল হয়ে পড়ে আছে একটি অ্যাম্বুলেন্স। 

গতকাল দুপুর ১২টার দিকে সরেজমিনে কুমিল্লা নগর ঘুরে দেখা গেছে, নজরুল অ্যাভিনিউ এলাকায় কান্দিরপাড়-ধর্মপুর সড়কে হাঁটুপানি। এই সড়ক দিয়ে চলাচলের সময় পানির উচ্চতা বেশি হওয়ায় অটোরিকশা বিকল হয়ে যায়; যার কারণে চালকেরা সড়কটি দিয়ে অটো চলাতে রাজি হন না।

একই অবস্থা নগরের কান্দিরপাড়-ঈদগাহ সড়কে। সড়কটির স্টেডিয়াম ও পুলিশ সুপারের বাসভবনের সামনেও হাঁটুর ওপর পর্যন্ত পানি। পুলিশ সুপারের বাসভবনের সামনে ফায়ার সার্ভিসের একটি গাড়ি ও বুড়িচং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অ্যাম্বুলেন্সসহ কয়েকটি গাড়ি বিকল হয়ে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। পাশের পুরো স্টেডিয়াম মার্কেটে জলাবদ্ধতার পানি। মার্কেটের অনেক দোকানে পানি ঢুকে পড়তে দেখা গেছে।

নগরের সালাউদ্দিন মোড় থেকে টমছমব্রিজ এলাকার গুরুত্বপূর্ণ সড়টিতেও দেখা গেছে জলাবদ্ধতা। সেখানেও বিকল হওয়ার ভয়ে খুব বেশি যান চলাচল করছে না। জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে ছোটরা সড়কেরও একই অবস্থা। খোদ সিটি করপোরেশনের নগর ভবনের সামনের সড়কও তলিয়ে গেছে পানিতে। প্রতিটি স্থানেই পানি সঙ্গে নালার ময়লা ভাসতে দেখা গেছে।

এছাড়া নগরের চকবাজার, রেসকোর্স, শাসনগাছা, ঠাকুরপাড়া, দ্বিতীয় মুরাদপুর, কাশারিপট্টি, চর্থাসহ অধিকাংশ এলাকার সড়কগুলোতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে বলে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে।

পুলিশ সুপারের বাসভবনের সামনে বিকল হওয়া বুড়িচং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অ্যাম্বুলেন্সের চালক মো. সাগর হোসেন বলেন, ‘কান্দিরপাড় থেকে ঈদগাহর দিকে যাচ্ছিলাম। এই স্থানে পানির পরিমাণ অনেক বেশি। হঠাৎ গাড়ি বন্ধ হয়ে যায়। এর পর থেকে বারবার চেষ্টা করেও স্টার্ট করতে পারিনি। বাধ্য হয়ে গাড়ির ভেতরে বসে আছি। পানি কমলে পরে ঠিক করার চেষ্টা করব।’

পাশেই বিকল সিএনজিচালিত অটোরিকশা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা চালক জহিরুল ইসলাম  বলেন, ‘এই দুর্ভোগ থাইক্যা আমরার মুক্তি নাই। সিটি করপোরেশনে যে-ই বসে, খালি আশ্বাস দেয়, কিন্তু কামের কাম কিচ্ছু হয় না। এহনই এই অবস্থা হইলে সামনে বর্ষায় কি অবস্থা হইব আল্লাহ ভালো জানে।’

নগরের সালাউদ্দিন এলাকার বাসিন্দা আতিকুর রহমান বলেন, সড়কের পাশের নালাগুলো নিয়মিত পরিষ্কার না করা এবং অসচেতন নগরবাসী ময়লা ফেলে নালাগুলোর পানি চলাচল ব্যাহত করায় একই বৃষ্টি হলেই সড়কে পানি জমে দুর্ভোগের সৃষ্টি হয়।

নগরের টমছমব্রিজ এলাকার বাসিন্দা আবদুস সালাম  বলেন, কুমিল্লা নগরের বৃষ্টির পানির অধিকাংশই অপসারণ হয় কান্দি খাল দিয়ে। কান্দিরপাড় থেকে পদুয়ার বাজারের দিকে গেছে খালটি। কিন্তু বিগত সময় সড়ক বর্ধিত করতে গিয়ে খালটি সংকুচিত করেছে সড়ক ও জনপথ বিভাগ। সে সময় সিটি করপোরেশন এ নিয়ে তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়নি। এ কারণেও জলাবদ্ধতার সমস্যা তীব্র আকার ধারণ করেছে।

কুমিল্লা ঈশ্বর পাঠশালার (উচ্চবিদ্যালয়) প্রধান শিক্ষক শুধাংশু কুমার মজুমদার জানিয়েছেন, কেন্দ্রটিতে মোট ৬০৮ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে। এর মধ্যে ভারী বৃষ্টির কারণে একতলা ভবনটির কয়েকটি কক্ষে পানি প্রবেশ করেছে। তবে এই পরিস্থিতির মধ্যেও পরীক্ষায় কোনো সমস্যা হয়নি বলে জানিয়েছেন তিনি।

এসব প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. ইউসুফ মোল্লা (টিপু) বলেন, তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর নগরকে জলাবদ্ধতামুক্ত করতে বিভিন্ন কাজ এরই মধ্যে শুরু করেছেন। প্রতিটি নালা ও খাল পরিষ্কার করা হচ্ছে। আজকে ভারী বৃষ্টির কারণে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তবে প্রতিটি নালা ও খাল দিয়ে যেন দ্রুত পানি সরে যায়, এ জন্য সিটি করপোরেশনের নিয়মিত কর্মীদের পাশাপাশি দুটি বিশেষ টিম কাজ করছে।

সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আরও বলেন, ‘নগরের প্রতিটি এলাকায় মানুষ বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী নালা-খালের পাশে বা সড়কে রাখে। বৃষ্টি হলে এসব নির্মাণসামগ্রী নালা-খালে পড়ে পানি নামতে বাধা সৃষ্টি করে। আমরা এসব নিয়েও কাজ করছি। আমাদের চেষ্টা আছে, আশা করছি আগামী বর্ষার আগেই আমরা একটি ভালো অবস্থানে পৌঁছাতে পারব।’

—জা.অর্থনীতি/এনজে