Print Date & Time : 21 October 2026 Wednesday 04:00 pm

ঐতিহ্য পর্যটনে লালমাই-ময়নামতির বিনোদন-বাণিজ্যের হাতছানি

image

ড. মুহাম্মদ সোহরাব উদ্দীন

লালমাই-ময়নামতি কুমিল্লা জেলার আদি মধ্যযুগের প্রত্ন-ঐতিহ্য সমৃদ্ধ এক অনন্য টিলাময় উচ্চভূমি। কুমিল্লা শহর থেকে প্রায় ৮ কি.মি. পশ্চিমে অবস্থিত উত্তর-দক্ষিণে প্রায় ১৬-১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ আর পূর্ব-পশ্চিমে ৪-৫ কিলোমিটার প্রশস্ত এই উচ্চভূমিতে ৭ম-৮ম শতকে গড়ে উঠেছিল বৌদ্ধ তীর্থ কেন্দ্র। বিহার কেন্দ্রিক পারলৌকিক ও জাগতিক জ্ঞান চর্চার এই কেন্দ্রগুলো ছিল বর্তমান সময়ের বিশ্ববিদ্যালয়ের সমতুল্য। সাত থেকে তেরো শতক পর্যন্ত গুপ্ত, নাথ, রাত, খড়গ, দেব, চন্দ্র, বর্মণ রাজবংশের ৩৩/৩৪ জন শাসকের নাম পাওয়া গেছে এই অঞ্চলের প্রাচীন মুদ্রা ও লিপিসাক্ষ্য থেকে। প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার থেকে জানা যায়, এই অঞ্চলটি ছিল প্রাচীন বঙ্গ-সমতট জনপদের রাজধানী। প্লাইস্টোসিন সময়ের এই উচ্চভূমির ভূপ্রকৃতি গঠনে রয়েছে লঙ্কার রাম-রাবণের যুদ্ধের পৌরাণিক গল্প। যুদ্ধে রাবনের শক্তিশেলে লক্ষণ অচেতন হয়ে পড়লে বনজ ওষুধের জন্য হনুমান হিমালয়ের গন্ধমাধব পর্বত বয়ে নিয়ে আসে কিন্তু পুনরায় রেখে আসার সময় অসাবধানতায় কিছু অংশ ভেঙে লমলম সাগরের পাড়ে পড়লে তৈরি হয় এই উচ্চভূমি। অন্যদিকে টিলাশ্রেণির নাম লালমাই-ময়নামতি হওয়ার পেছনেও রয়েছে গাথা ও লোকসংগীতে উল্লিখিত চন্দ্র বংশীয় রাজার দুই মেয়ে লালমাই ও তান্ত্রিক রানী ময়নামতির নাম। এ অঞ্চলের প্রত্নস্থল থেকে আবিষ্কৃত নব্য প্রস্তর যুগের হাতিয়ার, মূর্তি, মুদ্রা, তাম্রশাসন, পোড়ামাটির নিদর্শন, টেরাকোটা ফলকচিত্র, ধাতব নিদর্শনসহ নানা প্রত্নবস্তু দিয়ে তৈরি করা হয়েছে ময়নামতি প্রত্নস্থল জাদুঘর।

অতন্ত সমৃদ্ধ এই প্রত্নাঞ্চলের প্রাচীন স্থাপত্য নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে বৌদ্ধ স্থাপত্যের স্মারক শালবন বিহার, আনন্দ বিহার, ভোজ বিহার, ত্রিরত্ন মুড়া বা কুটিলা মুড়া, রূপবান মুড়া ও ইটাখোলা মুড়া বিহার ও মন্দির, রানীর বাংলো মন্দির। এ ছাড়া প্রাচীন হিন্দু ঐতিহ্যের মধ্যে রয়েছে চারপত্র মুড়া ও চন্ডিমুড়া। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক সংলগ্ন ক্যান্টনমেন্ট থেকে কম্পানীগঞ্জের রাস্তায় অল্প কিছুটা সামনেই রয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাধিসৌধ ময়নামতি ওয়ার সিমিট্রি। এই সমাধিক্ষেত্রটি ২য় বিশ্বযুদ্ধে এই অঞ্চলে নিহত সৈনিকদের স্মৃতি ধারণ করলেও টিলার উপরে এর কেন্দ্রীয় অংশে রয়েছে প্রাচীন স্থাপত্য কাঠামো। লালমাই-ময়নামতি উচ্চভূমির সর্ব উত্তরের প্রত্ননিদর্শন রানীর বাংলো এবং সর্ব দক্ষিণের পর্যটন কেন্দ্র চন্ডীমুড়া। পাহাড়ের নৈসর্গিক সৌন্দর্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক অনন্য সম্মিলন লালমাই-ময়নামতি পর্যটন কেন্দ্র।

মানুষ স্বভাবতই ঘুরতে পছন্দ করে। স্বাভাবিকভাবেই ইতিহাস-ঐতিত্যের এই প্রাচীন নিদর্শনগুলো থাকে মানুষের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দুতে। এগুলো পরিদর্শনের মাধ্যমে মানুষের যে শিকড়ের অনসন্ধান ও আত্নপরিতৃপ্তি ঘটে তাই ঐতিহ্য পর্যটন। এ কারণেই বর্তমান বিশ্বে পর্যটন শিল্পের বিকাশমান ধারায় ঐতিহ্য পর্যটনকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। কালের বিবর্তনে টিকে থাকা ও সংস্কৃতির উত্তরাধিকারীদের দ্বারা লালিত হয়ে এই ঐতিহ্য ছড়িয়ে পড়ে পর্যটনের মাধ্যমে বিশ্বের নানা প্রান্তরে। ঐতিহ্য পর্যটন শিক্ষা, সংস্কৃতি, বিনোদন, সংরক্ষণ এবং মুনাফা অর্জন প্রভৃতির সংমিশ্রণ। তাই বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে পর্যটনের সামগ্রিক সুযোগ-সুবিধা বিবেচনায় কুমিল্লার লালমাই-ময়নামতির প্রত্নাঞ্চল হতে পারে একটি আদর্শ ঐতিহ্য পর্যটন কেন্দ্র। দীর্ঘ সময় ধরে কুমিল্লা, সিলেট ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের ভ্রমণপিপাসু মানুষের প্রথম পছন্দ শালবন বিহার ও এর সংলগ্ন অঞ্চল। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যগত এসব নিদর্শনের পাশাপাশি বিগত দুই দশকে এ অঞ্চলে গড়ে উঠেছে ব্লু ওয়াটার পার্ক, ম্যাজিক প্যারাডাইস, ডায়নোসর পার্ক, বোটানিক্যাল গার্ডেনসহ গুণগতমানসম্পন্ন বেশ অনেকগুলো পার্ক ও রিসোর্ট। ঢাকা থেকে মাত্র ১০৫ কি.মি. দূরত্বে চারলেনের ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দিয়ে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টায় পৌঁছানো যায় এ পর্যটন অঞ্চলে। শালবন বিহার, ময়নামতি জাদুঘর, নব শালবন বিহার, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা পল্লী উন্নয়ন একাডেমি প্রভৃতি পরিদর্শনের প্রতি প্রবল আকর্ষণের কারণে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের প্রধানতম পর্যটন কেন্দ্র এটি। ঢাকার লালবাগ কেল্লার পর প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সবচেয়ে বেশি রাজস্ব সংগৃহীত হয় এই প্রত্নাঞ্চল থেকে। বিগত সময়ে কেবল শালবন বিহারে নিরাপত্তা বেষ্টনীসহ টিকিট কাউন্টার থাকলেও বর্তমানে রূপবান মুড়া এবং ইটাখোলা মুড়া প্রত্নস্থল এ সুবিধার আওতায় আনা হয়েছে। তবে নিরাপত্তা এবং অনুমতির জটিলতার কারণে ময়নামতি ক্যান্টনমেন্টের অভ্যন্তরের প্রত্নস্থাপনা আনন্দ বিহার, ভোজ বিহার, ত্রিরত্ন মুড়া ও চারপত্রমুড়া সাধারণ দর্শনার্থীদের পরিদর্শন করা সম্ভব হয় না। এর পাশাপাশি অনেকগুলো প্রত্নঢিবিতে খনন পরিচালিত না হওয়ায় এগুলোও জনসাধারণের জানার বাইরে রয়ে গেছে।

জাতিসংঘের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড ট্যুরিজম অর্গানাইজেশনের মতে পর্যটনের ক্ষেত্রে আটটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো হলো- পরিবহন ও যোগাযোগ, আবাসন ব্যবস্থা, খাদ্য ও পানীয়, আমোদ-প্রমোদের ব্যবস্থা, দর্শকদের আকর্ষণ, সভা-সম্মেলন, পর্যটন সেবা এবং ভ্রমণ বাণিজ্য। লালমাই-ময়নামতির পর্যটন কেন্দ্রগুলোর মধ্যে শালবন বিহার ও ময়নামতি জাদুঘর এলাকাটিই দর্শনার্থীদের প্রধান আকর্ষণের কেন্দ্র কিন্তু এর ব্যবস্থাপনায় হিমশিম খেতে হয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষকে। কেননা, এর সামনের সংকীর্ণ রাস্তার উপর ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অন্য যানবাহন র্দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থেকে জটলার সৃষ্টি করে। অন্যদিকে এই রাস্তার পশ্চিম পাশে একদম রাস্তা ঘেঁষে গড়ে উঠেছে নানা রকম শৌখিন পণ্যের দোকান ও খাবার হোটেল। এই অঞ্চলে সাধারণ দর্শনার্থীদের থাকারও কোনো বন্দোবস্ত নেই। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে জাদুঘরের বিশাল যে পার্কিং এলাকা রয়েছে তা ব্যবহার করে এই সমস্যাগুলোর সমাধান করা সম্ভব। তা ছাড়া বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন ও সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে হোমস্টে গড়ে তোলা হলে নিরাপদ খাদ্য ও আবাসন ব্যবস্থার সমাধানসহ স্থানীয় জনসাধারণের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসবে। ময়নামতি জাদুঘর ও বিহারের উপস্থাপন কৌশল সেকেলে। জাদুঘরের মতো নিয়ত পরিবর্তনশীল একটি প্রতিষ্ঠান আধুনিকায়ণ না করলে বর্তমান দর্শনার্থীদের আগ্রহ তৈরি করা কঠিন। তা ছাড়া বিহারে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে দর্শক আকর্ষণে নানা পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। শালবন বিহার যেহেতু কেন্দ্র তাই এখানে মানচিত্র ও যোগাযোগব্যবস্থা উল্লেখসহ নিকটবর্তী অন্যান্য প্রত্নস্থাপনার উপস্থাপন করা গেলে দর্শনার্থীরা সেগুলোতেও ভ্রমণ করবে। এই অঞ্চলের পর্যটনের একটা বড় সুবিধা হলো স্কুল-কলেজের পাঠ্যক্রমে পুরার্কীতিগুলোর ইতিহাস-ঐতিহ্য অন্তর্ভুক্ত রয়েছে যে কারণে দর্শনার্থীরা এ বিষয়ে একটা ধারণা নিয়েই ঘুরতে আসে। তাই তাদের প্রত্যাশাও থাকে বেশি। প্রশিক্ষিত গাইড, ওয়েবসাইড, ফেসবুক পেজ ইত্যাদির মাধ্যমে আকর্ষণীয়ভাবে লালমাই-ময়নামতির ঐতিহ্য পর্যটনের একটা মানসম্মত স্টোরি তৈরি করতে হবে। সর্বোপরি পরিকল্পিত পরিকল্পনা ও সঠিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে পর্যটকদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব হলে লালমাই-ময়নামতি হয়ে উঠবে এই অঞ্চলে দেশি-বিদেশি দর্শনার্থীদের তীর্থভূমি।

অধ্যাপক, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ও ডিন, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়