সাইদুর রহমান, চট্টগ্রাম: বড় বিনিয়োগ ও বিপুল সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের প্রায় ৩৩ হাজার একর জমিতে গড়ে তোলা হয় জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এনএসইজেড)। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে সর্বোচ্চ ১৫ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য ছিল। ২০৩০ সালের মধ্যে ১৯ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনাও দেখানো হয়েছিল। কিন্তু প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেলেও লক্ষ্য অর্জন হয়েছে সামান্যই।
অর্থনৈতিক অঞ্চলটিতে বর্তমানে মাত্র ১৭টি কারখানা উৎপাদনে রয়েছে। আরও ২৪টি কারখানা নির্মাণাধীন। সব মিলিয়ে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ২০ হাজার মানুষের।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির অনিশ্চিত সরবরাহ বিনিয়োগে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে জমি হস্তান্তরে বিলম্ব, শ্রমিক আবাসনের সংকট ও দক্ষ জনবলের ঘাটতি। ফলে বিপুল জমি ও বিনিয়োগ সম্ভাবনা থাকলেও প্রত্যাশিত শিল্পায়নের গতি পাচ্ছে না মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল। এ কারণে সরকারের বিনিয়োগ লক্ষ্যের সঙ্গে অর্জনের বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) ২০২৬ সালের মধ্যে এনএসইজেডসহ পাঁচটি অগ্রাধিকার অর্থনৈতিক অঞ্চলে ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। এসব অঞ্চলে অন্তত ২ লাখ ৩৮ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রত্যাশা ছিল।
অন্যদিকে অংশীজনদের হিসাবে পরিকল্পিত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হলে শুধু মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলেই ২০৩০ সালের মধ্যে ১৯ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ আসতে পারে।
তাই এখন প্রশ্ন উঠেছে, এত বড় বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও ব্যবসায়িক পরিবেশ কতটা তৈরি হয়েছে। সংরক্ষিত ম্যানগ্রোভ এলাকা উচ্ছেদ করে গড়ে তোলা হয়েছে বিশাল এই শিল্পাঞ্চল। কিন্তু পুনরুদ্ধার করা জমিকে উৎপাদনশীল করতে প্রয়োজনীয় সহায়ক অবকাঠামো এখনও পুরোপুরি তৈরি হয়নি।
জমি বরাদ্দ, বিনিয়োগে গতি নেই
শিল্পের জন্য জমি বরাদ্দ থাকলেই সেখানে কারখানা করা যায় না। প্রয়োজন জমি বুঝে পাওয়া এবং মৌলিক অবকাঠামো। মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রায় ৫০০ একর জমি বরাদ্দ পেয়েছে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)। তবে শিল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাটি এখনও বরাদ্দ পাওয়া জমির পুরোপুরি দখল বুঝে পায়নি।
বিজিএমইএর সাবেক সহ-সভাপতি রাকিবুল আলম চৌধুরী বলেন, জমি বুঝে না পাওয়া এবং মৌলিক অবকাঠামো তৈরি না হওয়া পর্যন্ত বিনিয়োগকারীরা নতুন করে ঝুঁকি নিতে আগ্রহী নন।
তিনি বলেন, ‘আমরা প্রয়োজনীয় শর্তপূরণ করেছি এবং অর্থ পরিশোধ করেছি। কিন্তু এখনও আমাদের জমির সীমানা নির্ধারণ করে বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি।’
তার ভাষ্য, ‘জমি বুঝিয়ে দেওয়া হলে, সড়ক তৈরি হলে এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত হলে বিনিয়োগকারীরা বিকল্প নিয়ে চিন্তা করতে পারেন। এসব সমস্যার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত উদ্যোক্তারা ঝুঁকি নিতে চাইছেন না।’
জমি বরাদ্দ ও বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি থাকলেও জমি বুঝিয়ে দেওয়া ও অবকাঠামো নির্মাণে বিলম্ব হচ্ছে। ফলে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি কারখানা, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে রূপ নিচ্ছে না।
ইউটিলিটি এখনও বড় ঝুঁকি
যেসব প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে কারখানা করেছে, তাদেরও নির্বিঘ্ন উৎপাদন চালাতে নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির অনিয়মিত সরবরাহ বড় প্রকল্পের পরিচালন ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
মডার্ন সিনটেক্সের জ্যেষ্ঠ মহাব্যবস্থাপক সফর বড়ুয়া বলেন, ‘বড় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ইউটিলিটির নিশ্চয়তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’ তিনি বলেন, ‘যখন বড় বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়, তখন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ এবং পানি ও গ্যাসের মতো ইউটিলিটি সরবরাহ অত্যাবশ্যক। এগুলো ছাড়া এ ধরনের প্রকল্প লাভজনকভাবে পরিচালনা করা খুব কঠিন।’
তার ভাষায়, ‘নিরবচ্ছিন্ন পানি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বড় বিনিয়োগ অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকবে।’
রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য এমন অনিশ্চয়তা বড় সমস্যা। কারণ এসব শিল্পকে নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন চালিয়ে যেতে হয়। ইউটিলিটি সরবরাহ অনিশ্চিত হলে বিনিয়োগকারীদের কাছে মিরসরাইয়ের আকর্ষণও কমতে পারে।
শিল্পাঞ্চল হলেও নেই প্রয়োজনীয় সেবা
সমস্যা শুধু কারখানার ভেতরে নয়। বিপুলসংখ্যক শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের জন্য প্রয়োজনীয় অনেক সেবা এখনও পর্যাপ্ত নয়। এর মধ্যে রয়েছে শ্রমিকদের আবাসন, পরিবহন, ব্যাংকিংসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সেবা। অর্থনৈতিক অঞ্চলের দূরবর্তী অবস্থানও শ্রমিক নিয়োগ ও ধরে রাখার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করছে।
এসকিউ ইলেকট্রিক্যালস লিমিটেডের মানবসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তা এহসানুল কবীর নিজামী বলেন, ‘প্রধান জনবসতি থেকে দূরত্ব এবং আশপাশের পরিবেশ শ্রমিকদের সেখানে চাকরি নিতে নিরুৎসাহিত করছে।’
তিনি বলেন, ‘এলাকাটি মহাসড়ক থেকে প্রায় ২০ থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে এবং সমুদ্রের কাছাকাছি। রাতে এলাকা নীরব ও অন্ধকার হয়ে যায়। ফলে শ্রমিকরা এখানে কাজ করতে স্বস্তি বা নিরাপত্তাবোধ করেন না।’ বিনিয়োগকারীদের জন্য (ওয়ান স্টপ সার্ভিস) একক সেবা ব্যবস্থাও কার্যকর করার দাবি জানান তিনি।
তার মতে, ‘বর্তমানে অগ্নিনিরাপত্তা, পরিবেশ, ব্যবসা ও অন্যান্য অনুমোদনের জন্য বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়। এসব সেবা ওয়ান স্টপ সার্ভিসের আওতায় আনা উচিত, যাতে বিভিন্ন লাইসেন্স ও সনদের জন্য এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে ছুটতে না হয়।’
বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টিতে এসব প্রশাসনিক ও পরিবহন ব্যয়ও ব্যবসা পরিচালনার খরচ বাড়াচ্ছে।
পরিবেশ তৈরি হলে আসতে পারে বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ
ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল এখনও বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকেন্দ্র হয়ে ওঠার সম্ভাবনা রাখে। তবে সেই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আমিরুল হক বলেন, ‘অর্থনৈতিক অঞ্চলটির বিনিয়োগ সম্ভাবনা ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য। তবে বিনিয়োগের পথ খুলতে মৌলিক সুবিধাগুলো নিশ্চিত করা জরুরি।’
তিনি বলেন, ‘এনএসইজেড এ অঞ্চলের অন্যতম বড় প্রকল্প। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি নিশ্চিত করা এবং শ্রমিকদের আবাসনের ব্যবস্থা করা গেলে বিনিয়োগ আকর্ষণ করা খুব কঠিন হবে না।’
সরকারি অবকাঠামো বিনিয়োগই গুরুত্বপূর্ণ
জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের সাবেক পরামর্শক আবদুল কাদের খান বলেন, প্রকল্পটিতে চীনা বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি বাংলাদেশের বড় বড় শিল্পগোষ্ঠীও এসেছে। কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে উৎপাদনে গেছে। আরও কিছু নির্মাণাধীন রয়েছে।
পরিকল্পিত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো চালু হলে শেষ পর্যন্ত প্রায় ১৪ লাখ প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে বলে তিনি মনে করেন। তবে এই লক্ষ্য অর্জন অনেকটাই নির্ভর করবে সহায়ক অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারের সক্ষমতার ওপর।
আবদুল কাদের খান বলেন, ‘সড়ক, পানি সরবরাহ, গ্যাসের নেটওয়ার্ক এবং বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ক সমন্বিত সরকারি উদ্যোগের মাধ্যমে গড়ে তুলতে হবে।’
বিনিয়োগকারীদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি করতে অবকাঠামো প্রকল্প শেষ করার জন্য পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দেরও দাবি জানান তিনি।
জমির বিশাল ভাণ্ডার থেকে কার্যকর শিল্পকেন্দ্র
মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলের আকার নিয়ে কোনো ঘাটতি নেই। রয়েছে বিপুল জমি। আছে কৌশলগত অবস্থান। রয়েছে সম্ভাব্য বিনিয়োগের বড় পাইপলাইন। সমস্যা হচ্ছে, এসব সুবিধাকে কার্যকর কারখানা, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে রূপ দেওয়া।
প্রায় এক দশক পর সর্বোচ্চ ১৫ লাখ কর্মসংস্থানের লক্ষ্য এবং বর্তমানে প্রায় ২০ হাজার কর্মসংস্থানের ব্যবধানই প্রকল্পটির চ্যালেঞ্জটি স্পষ্ট করছে। তাই এখন শুধু শিল্পের জন্য জমি বরাদ্দ দিলেই হবে না। সেই জমিকে দ্রুত শিল্পের উপযোগী করে তুলতে হবে। নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানি নিশ্চিত করতে হবে। উন্নত করতে হবে সড়ক যোগাযোগ।
গড়ে তুলতে হবে শ্রমিকদের আবাসন ও অন্যান্য সহায়ক সেবা। দ্রুত জমি হস্তান্তর করতে হবে। বাড়াতে হবে দক্ষ জনবল তৈরির উদ্যোগ। এসবের ওপরই নির্ভর করবে পরিকল্পিত ১৯ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ কতটা বাস্তবে আসে। মিরসরাইয়ে শিল্পায়নের জন্য জমির অভাব নেই। এখন বড় প্রশ্ন, সেই জমিকে উৎপাদনশীল করে তুলতে প্রয়োজনীয় পরিবেশ কত দ্রুত তৈরি করা যায়।
