২৩ বছর পর সাফ জয়ের স্বপ্নে বাংলাদেশ

ক্রীড়া প্রতিবেদক: সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ মানেই ফুটবলের আলাদা রকমের উৎসব। ফুটবলপ্রেমীরা সেই উন্মাদনায় ভেসে বেড়াতে প্রস্তুত। ফুটবল রোমাঞ্চের রেণু ছড়িয়ে দিতে প্রস্তুত ঢাকার জাতীয় স্টেডিয়ামও। আজ পর্দা উঠছে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের ১৫তম আসরের। টুর্নামেন্ট ঘিরে ক্রীড়াঙ্গনে উৎসবের আমেজ থাকার কথা থাকলেও, বাফুফে ও সাফের মধ্যকার সমন্বয়হীনতা এবং টিকিটের চড়া দামের কারণে শুরুর জৌলুসে কিছুটা ভাটা পড়েছে। তবে মাঠের লড়াই শুরু হতেই দর্শক হৃদয় রাঙাতে প্রস্তুত লাল-সবুজের দল। দীর্ঘ ২৩ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে দক্ষিণ এশিয়া ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট ফের ঘরে তোলার সুবর্ণ সুযোগ বাংলাদেশের সামনে। ২০০৩ সালের সোনালি স্মৃতির পর ঘরের মাঠে এটি বাংলাদেশের চতুর্থ আয়োজন।

২০২৫ সালে শ্রীলঙ্কায় আসরটি বসার কথা থাকলেও নানা জটিলতায় তা এক বছর পিছিয়ে যায় এবং পরবর্তী সময়ে আয়োজক হিসেবে সুযোগ পায় বাংলাদেশ। টুর্নামেন্টের প্রচারের অংশ হিসেবে ২০০৩ সালের সাফ জয়ী দল ও ২০১০ সালের এসএ গেমসের স্বর্ণজয়ী ফুটবলারদের নিয়ে একটি প্রীতিম্যাচ আয়োজন করা হলেও সাধারণ দর্শকদের মধ্যে প্রত্যাশিত উন্মাদনা তৈরি হতে কিছুটা সময় লাগছে। জাতীয় স্টেডিয়ামের ১৮ হাজার ৩০০ সাধারণ গ্যালারির আসনের বিপরীতে উদ্বোধনী দিনেই অর্ধেকের বেশি টিকিট অবিক্রীত থাকার চিত্র বলে দিচ্ছে, দর্শকদের মাঠে টানতে আয়োজকদের আরও কৌশলী হওয়া প্রয়োজন ছিল। সাধারণ গ্যালারির প্রতিটি টিকিটের দাম এক হাজার টাকা। একটি টিকিটে দিনের দুটি ম্যাচ দেখা যাবে—এটাই আয়োজকদের যুক্তি। কিন্তু সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের সামর্থ্যের কথা বিবেচনায় নিলে এক হাজার টাকা কম নয়। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে খেলা দেখতে গেলে খরচ আরও বাড়বে। ফলে টিকিটের দাম নির্ধারণে দর্শকদের কথা কতটা ভাবা হয়েছে, সেই প্রশ্নও উঠছে। তা সত্ত্বেও, মাঠের ৯০ মিনিটের ফুটবল সব হতাশা ও শীতলতা কাটিয়ে গ্যালারিতে উত্তাপ ছড়াবে—এমনটাই প্রত্যাশা ফুটবলপ্রেমীদের।

দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে চলা শিরোপা খরা কাটাতে এবার বদ্ধপরিকর বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দল। টুর্নামেন্টের আগের দিন পল্টনের জাতীয় স্টেডিয়ামে অফিসিয়াল সংবাদ সম্মেলনে স্বাগতিক দলের প্রধান কোচ টমাস ডুলি ও নতুন অধিনায়ক তপু বর্মণ সাফ ট্রফি ঘরে তোলার পরিষ্কার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। ২০০৩ সালের ফাইনালে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর ২০০৫ সালে রানার্সআপ হওয়া বাংলাদেশের সামনে ঘরের মাঠে সেই আক্ষেপ ঘুচানোর সুবর্ণ সুযোগ।

ফিফা উইন্ডোতে কোনো প্রীতিম্যাচ না খেলা প্রসঙ্গে প্রধান কোচ টমাস ডুলি খোলামেলা কথা বলেছেন। ইনজুরি সমস্যা ও দলের ফিটনেস নিয়ে কোচের পরিষ্কার বার্তা ছিল—তিনি কোনো অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি নিতে চাননি। সংবাদ সম্মেলনে ডুলি বলেন, ‘জীবনের সব লক্ষ্যই বাস্তবসম্মত হতে হবে, এবং এই টুর্নামেন্টে আমাদের জয় পাওয়াটা বাস্তবসম্মত। গত ২৩ বছরের চাপ আসলে বর্তমানের চেয়ে অনেক বেশি ছিল। এখন আমাদের ভালো করার মতো আত্মবিশ্বাস আছে। কঠোর পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস এবং শেষ মিনিট পর্যন্ত লড়াই করার মাধ্যমেই এটা সম্ভব। আমরা এ বছর ট্রফিটা জিততে চাই এবং মাঠে তা প্রমাণ করতে চাই।’

কোচ আরও যোগ করেন, ‘টুর্নামেন্টের আগে পর্যাপ্ত প্রীতিম্যাচ না পাওয়ার পেছনে আমাদের কিছু ইনজুরি সমস্যা ছিল। তপুসহ বেশ ক’জন খেলোয়াড় পুরোপুরি ফিট না থাকায় আমরা ঝুঁকি নিতে চাইনি। তবে আমি আমাদের খেলোয়াড়দের শতভাগ বিশ্বাস করি। যদি আমরা মাঠে নিজেদের সেরাটা দিয়ে ১১ বনাম ১১ লড়তে পারি, তবে আমাদের জেতার বাস্তবসম্মত সুযোগ রয়েছে।’ আসিয়ান কাপে শক্তিশালী দলের বিপক্ষে খেলার কঠিন অভিজ্ঞতা এই টুর্নামেন্টে বড় ভূমিকা রাখবে বলেও বিশ্বাস করেন তিনি।

গ্যালারির উপচে পড়া ভিড়ের স্নায়ুচাপকে পাশ কাটিয়ে অধিনায়ক তপু বর্মণ এই চাপকে দেখছেন নিজেদের সেরাটা নিংড়ে দেওয়ার সুযোগ হিসেবে। তবে উদ্বোধনী ম্যাচে দলের অন্যতম প্রধান শক্তি হামজা চৌধুরীকে ছাড়াই মাঠে নামতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। মিডমাঝ মাঠে হামজার অভাব পূরণের প্রত্যয় ব্যক্ত করে তপু বলেন, ‘প্রথমত বলব যে অনেক মিস করব। আসলে তার মতো লিডারশিপ আমাদের টিমে খুবই খুবই প্রয়োজন। কিন্তু আসলে তার জন্য আমাদের একটা করণীয় থাকবে সেটা হলো পথটা যেন সহজ করতে পারি। আমরা আসলে তাকে একটা ভালোভাবে ওয়েলকাম করতে চাই সেটা হলো উইনিং দিয়ে।’

প্রতিপক্ষ শ্রীলঙ্কা কিংবা ভুটানকে হালকাভাবে নিচ্ছেন না তপু। শ্রীলঙ্কা দল এশিয়া কাপ কোয়ালিফিকেশনে ৯ পয়েন্ট অর্জন করে নিজেদের শক্তিমত্তা প্রমাণ করেছে উল্লেখ করে তিনি জানান, ২০১৫ সালের দলটির সঙ্গে বর্তমান দলের মান ও আত্মবিশ্বাসে আকাশ-পাতাল তফাৎ রয়েছে।

আজ রাতে ভুটানের বিপক্ষে উদ্বোধনী ম্যাচে মাঠে নামছে বাংলাদেশ। এর পর ১১ নভেম্বর গ্রুপ পর্বের দ্বিতীয় ম্যাচে শ্রীলঙ্কার মুখোমুখি হবে স্বাগতিকরা। কোচের দূরদর্শিতা, খেলোয়াড়দের নিবেদন এবং ঘরের মাঠের সুবিধা কাজে লাগিয়ে দীর্ঘ খরা ঘুচিয়ে ট্রফি উল্লাসে মাতবে লাল-সবুজ জার্সিধারীরা—এটাই এখন গোটা দেশের কোটি ফুটবলপ্রেমীর একমাত্র চাওয়া।