ছুটির দিনে বেশি ঘুমিয়ে কি ঘাটতি মেটানো সম্ভব?

অনলাইন ডেস্ক: কর্মব্যস্ত সপ্তাহের কাজের চাপ ও পড়াশোনার কারণে তৈরি হওয়া ঘুমের ঘাটতি মেটাতে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে অনেকেই বেশি সময় ঘুমানোর চেষ্টা করেন। চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুযায়ী, মানুষের ঘুম মূলত ‘স্লিপ হোমিওস্ট্যাট’ এবং ‘সার্কাডিয়ান রিদম’ বা অভ্যন্তরীণ জৈবঘড়ির সমন্বয়ে নিয়ন্ত্রিত হয়। কর্মদিবসে প্রতিদিন সকাল ৬টায় ওঠার পর ছুটির দিনে সকাল ৯টা বা ১০টা পর্যন্ত ঘুমালে শরীরের স্বাভাবিক ছন্দ বিঘ্নিত হতে পারে। এর ফলে ছুটির দিনের রাতে নির্ধারিত সময়ে ঘুম আসতে চায় না এবং পরবর্তী কর্মদিবসে নতুন করে আবারও ঘুমের ঘাটতির চক্র শুরু হয়।

তবে গবেষণাগারে পরিচালিত বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় দেখা গেছে, এক-দুদিনের স্বল্পমেয়াদি ঘাটতি কাটাতে বাড়তি ঘুম সম্পূর্ণ অর্থহীন নয়। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র দুই ঘণ্টা ঘুমানো ব্যক্তিদের শরীরে শ্বেত রক্তকণিকার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটেছিল, যা পরবর্তী রাতে ১০ ঘণ্টা ঘুমানোর পর পুনরায় স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। অন্য এক গবেষণায় দেখা যায়, টানা ছয় রাত মাত্র চার ঘণ্টা ঘুমালে মানবদেহের গ্লুকোজ ব্যবহারের ক্ষমতা ও ইনসুলিনের কার্যকারিতা ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়; তবে পরবর্তীতে ছয় রাত পর্যাপ্ত ১২ ঘণ্টা করে ঘুমানোর সুযোগ দিলে সেই ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ হয়ে যায়। স্বল্পমেয়াদি অনিদ্রার পর অতিরিক্ত ঘুম মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা পুনরুদ্ধারেও প্রত্যক্ষ সহায়তা করে।

স্বল্পমেয়াদি অনিদ্রা কিছুটা পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হলেও নিয়মিত কয়েক সপ্তাহ বা মাসব্যাপী কম ঘুমানোর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি শুধু ছুটির দিনে পূরণ করা সম্ভব নয়। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, নিয়মিত ঘুমের ঘাটতি থাকলে মানুষের মনোযোগ ধরে রাখা, যেকোনো পরিস্থিতিতে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখানো এবং দিক নির্ণয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ মানসিক ক্ষমতাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, কর্মদিবসগুলোতে দীর্ঘ সময় কম ঘুমিয়ে কেবল ছুটির দিনে কয়েক ঘণ্টা বেশি ঘুমালেও এই ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পুরোপুরি দূর করা যায় না।

বাস্তব জীবনের ওপর গবেষণায় অবশ্য কিছুটা ভারসাম্যপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। সুইডেনে দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে ৪০ হাজারের বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ওপর পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, যারা কর্মদিবসে পাঁচ ঘণ্টার কম ঘুমালেও ছুটির দিনে কিছুটা বেশি ঘুমাতেন, তাদের ক্ষেত্রে অকালমৃত্যুর বাড়তি ঝুঁকি অনেকটাই কমে এসেছিল। যদিও যুক্তরাজ্যভিত্তিক অপর এক গবেষণায় সপ্তাহান্তের বাড়তি ঘুমের সঙ্গে মৃত্যু বা হৃদরোগের ঝুঁকি কমার কোনো স্পষ্ট সম্পর্ক মেলেনি। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার গবেষণায় উঠে এসেছে, ছুটির দিনে পরিমিত বাড়তি ঘুম তরুণ ও প্রাপ্তবয়স্কদের শরীরে প্রদাহ কমানোর পাশাপাশি বিষণ্ণতা ও উদ্বেগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ছুটির দিনে অতিরিক্ত সময় না ঘুমিয়ে সর্বোচ্চ এক থেকে দুই ঘণ্টার মতো বাড়তি বিশ্রাম নেওয়া শরীরের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকর। সপ্তাহজুড়ে চরম অনিদ্রায় ভুগে ছুটির দিনে দুপুর পর্যন্ত বিছানায় পড়ে থাকার অভ্যাস শরীরের স্বাভাবিক ছন্দকে স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বিশেষ করে যারা অনিদ্রার রোগে ভুগছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সময় বিছানায় থাকা পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে। তাই ছুটির দিনের অতিরিক্ত ঘুমের ওপর নির্ভর না করে প্রতিদিন একটি সুনির্দিষ্ট সময়ে নিয়ম মেনে পর্যাপ্ত ঘুমানোই দীর্ঘমেয়াদি সুস্বাস্থ্যের মূল চাবিকাঠি।
জেএ/অভি