‘শুল্কের রাজা’ কেন শুল্ক আরোপে পিছিয়ে গেলেন?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুল্ক আরোপ করতে এতটাই পছন্দ করেন যে, প্রথম মেয়াদে নিজের নাম দিয়েছিলেন ‘ট্যারিফ ম্যান’ বা ‘শুল্কমানব। দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফিরে তিনি বন্ধু ও শত্রু সব দেশের ওপর শুল্ক আরোপ করে চলেছেন। তার লক্ষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদনশিল্প পুনরুজ্জীবিত করা, মাদকের প্রবেশ ঠেকানো এবং ব্রাজিলের এক মিত্রের বিরুদ্ধে কথিত উইচ হান্ট বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার প্রতিবাদ জানানো।

সিএনএনের খবরে বলা হয়েছে, গত বছর মহামন্দার পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে শুল্ক বাড়ানোর পর ট্রাম্প নিজের ছবি প্রকাশ করেছিলেন ‘মিস্টার ট্যারিফ’ ও ‘দ্য ট্যারিফ কিং’ শিরোনামে। কিন্তু রাশিয়ার ওপর উচ্চ শুল্ক বহাল রাখার প্রশ্নে তিনি কেন পিছিয়ে গেলেন?

গত শুক্রবার নতুন নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক কার্যকর হওয়ার মাত্র দুইদিন আগে সেগুলো স্থগিত করে নির্বাহী আদেশে সই করেন ট্রাম্প। এ সিদ্ধান্তের পর যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের আইনপ্রণেতাদের মধ্যে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক আরোপের বিধানে গত সেপ্টেম্বরে সই করেছিলেন ট্রাম্প। দক্ষিণ ক্যারোলিনার প্রয়াত রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের নামে আইনটির নাম রাখা হয়েছিল।

নির্বাহী আদেশে রাশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানির ওপর সর্বোচ্চ ৫০০ শতাংশ শুল্ক এবং রাশিয়ার তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের শীর্ষ পাঁচ আমদানিকারক দেশের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক স্থগিত করা হয়েছে। অর্থাৎ রাশিয়ার যুদ্ধকে চাপে ফেলতে কংগ্রেস নতুন একটি অর্থনৈতিক অস্ত্র তৈরি করেছিল। কিন্তু আপাতত সেটি ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ট্রাম্প।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান রেমন্ড জেমসের ওয়াশিংটনবিষয়ক নীতিবিশ্লেষক এড মিলস বলেন, ‘এতে লিন্ডসে গ্রাহাম নিষেধাজ্ঞা আইনের কার্যকর প্রয়োগের প্রায় সব পথ বন্ধ হয়ে গেল।’ মিলসের মতে, ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্ত তার আগের অবস্থানের ধারাবাহিকতা। ২০২৫ সালের এপ্রিলে বিভিন্ন দেশের ওপর ব্যাপক শুল্ক আরোপের তালিকা থেকেও রাশিয়াকে বাদ দিয়েছিলেন তিনি। মিলস বলেন, ‘ঘোষণার সময়টি তাৎপর্যপূর্ণ। যেসব সিদ্ধান্তের প্রতি মানুষের মনোযোগ কম এবং রাজনৈতিকভাবে যেগুলোর পক্ষে ট্রাম্প সাফাই দিতে চান না, সেগুলো সাধারণত শুক্রবারের শেষ ভাগে ঘোষণা করা হয়। মধ্যবর্তী নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ আগে এটি রিপাবলিকান পার্টির জন্য মোটেও ভালো নয়।’

শুল্ক স্থগিতের সিদ্ধান্তে জ্বালানি বাজারের ওপর তীব্র চাপ কিছুটা কমেছে। ব্যবসায়ীরা ধারণা করছেন, রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা কমলে বাজারে জ্বালানির সরবরাহ বাড়তে পারে।

লিপো অয়েল অ্যাসোসিয়েটসের প্রেসিডেন্ট অ্যান্ডি লিপো বলেন, ‘রাশিয়া ইতোমধ্যে চীন, ভারত, তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশে অপরিশোধিত তেল বিক্রি করছে। তবে পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানি সীমিত রেখেছে। এই ছাড়ের ফলে আরও বিস্তৃত পরিসরে ক্রেতাদের কাছে তেল বিক্রি সহজ হতে পারে। কিন্তু এতে বাজারে প্রকৃতপক্ষে অতিরিক্ত সরবরাহ আসবে কি না,  তা নিশ্চিত নয়।’

ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশকে স্বাগত জানিয়েছেন রাশিয়ার সার্বভৌম সম্পদ তহবিলের প্রধান কিরিল দিমিত্রিয়েভ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি এ সিদ্ধান্তকে ‘গুরুত্বপূর্ণ ও সত্যিকার অর্থে ঐতিহাসিক মুহূর্ত’ বলে অভিহিত করেছেন।

রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে মতবিরোধে জড়িয়েছেন একাধিক রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা। তাদের মধ্যে রয়েছেন দক্ষিণ ক্যারোলিনার সিনেটর ডারলিন গ্রাহাম। তিনি তার প্রয়াত ভাইয়ের আসনে দায়িত্ব পালন করছেন এবং পূর্ণ মেয়াদে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধ বন্ধ করতে এবং গ্যাসের দাম কমাতে আমি রাশিয়ার ওপর চাপ বজায় রাখার পক্ষেই থাকতাম। কারণ আমি পুতিনকে বিশ্বাস করি না, রাশিয়াকেও না।’

রিপাবলিকান সিনেটর থম টিলিস এ সিদ্ধান্তকে ‘চরম দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলেছেন। তিনি ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ‘ইউক্রেনে হামলা চালানো এবং নিরপরাধ বেসামরিক মানুষকে হত্যা করা এক রুশ স্বৈরশাসকের কাছে নতি স্বীকারের’ অভিযোগ তোলেন।

তবে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের সিদ্ধান্তের পক্ষে রয়েছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞার বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রভাব ‘পর্যালোচনা’ করার সময় পাবেন ট্রাম্প। রুবিও বলেন, ‘সমস্যা হলো, এসব নিষেধাজ্ঞা শুধু রাশিয়ার ওপর নয়। এর আওতায় ভারতসহ আরও কয়েকটি দেশের ওপর শুল্ক আরোপের বিষয়ও রয়েছে। আমার মনে হয়, নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক আরোপের ফলে বিশ্ব অর্থনীতি, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়বে, তা বিশ্লেষণ করতে প্রেসিডেন্ট ৬০ দিন সময় নিতে চান।’