বাংলাদেশের নদী-নেটওয়ার্ক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কৌশলগত চালিকাশক্তি

মো. আব্দুল কাদের: বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি, অর্থনীতি ও জনজীবনের সঙ্গে নদীর সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। এ দেশের ইতিহাসে নদী যেমন জনপদ গড়ে তুলেছে, তেমনি কৃষি, বাণিজ্য, যোগাযোগ ও সাংস্কৃতিক বিকাশের পথও নির্মাণ করেছে। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, কর্ণফুলীসহ অসংখ্য নদ-নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের জনবসতি, কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি এবং বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড। অথচ অর্থনৈতিক উন্নয়নের বর্তমান আলোচনায় নদীকে প্রায়ই কেবল প্রাকৃতিক সম্পদ, নৌপথ কিংবা বন্যার উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাস্তবে একটি কার্যকর ও সমন্বিত রিভার নেটওয়ার্ক বা নদীকেন্দ্রিক যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বাংলাদেশের উন্নয়নের অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি হতে পারে।

রিভার নেটওয়ার্ক বলতে শুধু নদীপথে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন বোঝায় না। এর আওতায় নদী ও নৌপথের সঙ্গে বন্দর, সড়ক, রেলপথ, কৃষি, শিল্প, মৎস্যসম্পদ, পর্যটন, আঞ্চলিক বাণিজ্য এবং নদী তীরবর্তী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সমন্বিত ব্যবস্থাকে বোঝানো যায়। এই বিস্তৃত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে পারলে নদী বাংলাদেশের জন্য কেবল অতীতের ঐতিহ্য হয়ে থাকবে না; বরং ভবিষ্যতের টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে।

এখন আর প্রশ্ন এটি নয় যে, বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য নদী গুরুত্বপূর্ণ কি না। বরং আসল প্রশ্ন হলো, দেশটি কি তার নদী-নেটওয়ার্ককে একটি আধুনিক, সমন্বিত ও পরিবেশগতভাবে টেকসই ব্যবস্থায় রূপান্তর করতে পারবে— যা উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করবে, পরিবহন ব্যয় কমাবে, কর্মসংস্থান বাড়াবে এবং অর্থনৈতিক সহনশীলতাকে শক্তিশালী করবে? অত্যধিক ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশে, যেখানে পণ্য ও মানুষের চলাচল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য অপরিহার্য, সেখানে নদী-নেটওয়ার্ক এক অনন্য ভৌগোলিক সুবিধা প্রদান করে। নদীগুলো কৃষিপ্রধান অঞ্চলগুলোকে বাণিজ্যিক কেন্দ্র, শিল্পাঞ্চল এবং বড় বড় বাজারের সঙ্গে সংযুক্ত করে। এছাড়া এগুলো দুর্গম ও সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চলগুলোকে জাতীয় অর্থনীতির মূলধারায় যুক্ত করার সুযোগও তৈরি করে।

এমন একটি অর্থনীতিতে, যেখানে পরিবহন ব্যয় কৃষিপণ্য, উৎপাদিত পণ্য এবং রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে প্রভাবিত করে, সেখানে অভ্যন্তরীণ জলপথ সড়ক ও রেল পরিবহনের একটি সাশ্রয়ী বিকল্প হতে পারে। যেসব ক্ষেত্রে নৌ-চলাচলের উপযুক্ত পরিবেশ, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও লজিস্টিক সুবিধা রয়েছে, সেখানে ভারী পণ্য, নির্মাণসামগ্রী, সার, কৃষিপণ্য এবং অন্যান্য সামগ্রী জলপথে পরিবহন করা বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক হতে পারে। নদীপথে পরিবহনের অর্থনৈতিক গুরুত্ব কেবল পণ্য স্থানান্তরের প্রত্যক্ষ ব্যয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কার্যকর জলপথ যানজটপূর্ণ সড়কগুলোর ওপর চাপ কমাতে পারে, জ্বালানি-নির্ভর পরিবহনের ওপর নির্ভরতা হ্রাস করতে পারে এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের নির্ভরযোগ্যতা বাড়াতে পারে। যেহেতু বাংলাদেশ শিল্প উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করতে এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে চায়, তাই নিজেদের জন্য এই সুবিধাগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

তবে কেবল নদী থাকলেই যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া যাবে, তা কিন্তু নয়। এগুলোর অবদান নির্ভর করে নৌ-চলাচলযোগ্যতা, নির্ভরযোগ্য টার্মিনাল, পণ্য ওঠানামা করানোর সুবিধা, নিরাপদ নৌযান, কার্যকর কাস্টমস প্রক্রিয়া এবং সড়ক, রেলপথ ও শিল্পকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে সংযোগের ওপর। এই আনুষঙ্গিক বিনিয়োগগুলো ছাড়া নদীপথ কেবল একটি ভৌগোলিক সুবিধাই থেকে যায়, পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত হতে পারে না।

বাংলাদেশের বহুমুখী লজিস্টিক ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন ব্যবস্থাকে গড়ে তোলা একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় সুযোগ। সড়ক পরিবহনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা যানজট, লজিস্টিক ব্যয়ের বৃদ্ধি, সড়কের ক্ষতি এবং বিলম্বের কারণ হতে পারে। একটি সুষম পরিবহন ব্যবস্থা, যেখানে নৌপথে উপযুক্ত ধরনের পণ্য পরিবহন করা হয়— তা জাতীয় বাণিজ্যের সামগ্রিক দক্ষতা বৃদ্ধি করতে পারে। এই রূপান্তরের জন্য প্রয়োজন নদী বন্দর, নৌ-চলাচল সহায়ক ব্যবস্থা, বৈজ্ঞানিকভাবে যৌক্তিক ক্ষেত্রে ড্রেজিং (নদী খনন), আধুনিক কার্গো টার্মিনাল এবং ডিজিটাল নৌযান ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিতে কৌশলগত বিনিয়োগ। একই সঙ্গে এমন মাল্টিমোডাল সুবিধা গড়ে তোলা জরুরি, যা নদীপথের নৌযান, ট্রাক এবং ট্রেনের মধ্যে পণ্য পরিবহনের প্রক্রিয়াকে নিরবচ্ছিন্ন করে তুলবে।

ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র অভ্যন্তরীণ নৌপথ ও শিল্প সরবরাহ শৃঙ্খলের মধ্যে শক্তিশালী সমন্বয়ের মাধ্যমে উপকৃত হতে পারে। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকলে ব্যবসায়ীরা ব্যয়, দূরত্ব, পণ্য পৌঁছানোর সময়সীমা এবং পরিবেশগত বিবেচনার ভিত্তিতে পরিবহনের মাধ্যম নির্বাচন করতে পারবেন। বাংলাদেশের খতিয়ে দেখা উচিত যে, অভ্যন্তরীণ নৌপথ কীভাবে রপ্তানিমুখী শিল্পগুলোকে সহায়তা করতে পারে। তৈরি পোশাক খাতসহ অন্যান্য উৎপাদনমুখী শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কেবল শ্রমের উৎপাদনশীলতা বা উৎপাদন ক্ষমতার ওপরই নির্ভর করে না, বরং এটি লজিস্টিক ব্যয় এবং সেবার নির্ভরযোগ্যতার ওপরও অনেকাংশে নির্ভরশীল। যদিও নৌপথ সড়ক বা রেল যোগাযোগের বিকল্প হতে পারে না, তবুও কৌশলগতভাবে পরিকল্পিত নদী-ভিত্তিক পণ্য পরিবহন করিডোরগুলো বিদ্যমান পরিবহন অবকাঠামোর পরিপূরক হিসেবে কাজ করতে পারে এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের দক্ষতা বাড়াতে পারে। সুতরাং নৌপথকে বিচ্ছিন্নভাবে কেবল উৎসাহিত না করে, একটি সমন্বিত লজিস্টিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কল্যাণের মূলে রয়েছে নদী ও কৃষি উন্নয়নের মধ্যকার সম্পর্ক। নদীব্যবস্থা সেচ কার্যে সহায়তা করে, প্লাবনভূমির মাটির উর্বরতা পুনরুদ্ধার করে এবং ধান, শাকসবজি, পাট ও অন্যান্য কৃষিপণ্য উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মৌসুমি বন্যা, যদি তা পরিবেশগত ও সামাজিকভাবে সহনীয় মাত্রায় থাকে— তবে তা মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি এবং জলাভূমি পুনরুদ্ধারে অবদান রাখতে পারে। নদীগুলো অভ্যন্তরীণ মৎস্যসম্পদ, জলজ চাষাবাদ এবং জলজ সম্পদের ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল লাখ লাখ মানুষের জীবিকার উৎস। মৎস্য উৎপাদন খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি, কর্মসংস্থান ও অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যে অবদান রাখে। নদীনির্ভর জনগোষ্ঠী নৌ-পরিবহন, মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ, কেনাবেচা এবং অন্যান্য বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও যুক্ত।

তাই নদীভিত্তিক একটি সামগ্রিক উন্নয়ন কৌশলে পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে কৃষি আধুনিকায়ন, মৎস্য সংরক্ষণ, হিমাগার সুবিধা, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং গ্রামীণ উদ্যোগকে যুক্ত করা প্রয়োজন। উন্নত অবতরণ কেন্দ্র, স্বাস্থ্যসম্মত মৎস্য বাজার, নির্ভরযোগ্য পরিবহন ব্যবস্থা এবং ডিজিটাল বাজার তথ্যের সহজলভ্যতা উৎপাদকদের পণ্যের ভালো দাম পেতে এবং ফসল তোলার পরবর্তী ক্ষতি কমাতে সাহায্য করতে পারে। এই ধরনের উদ্যোগ নিশ্চিত করবে যে, নদী থেকে প্রাপ্ত অর্থনৈতিক সুফল যেন কেবল মধ্যস্বত্বভোগী বা বড় বাণিজ্যিক গোষ্ঠীর হাতে সীমাবদ্ধ না থেকে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছায়।
বাংলাদেশের নদী নেটওয়ার্কের গুরুত্ব কেবল অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর কৌশলগত তাৎপর্যও রয়েছে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যবর্তী ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ প্রতিবেশী দেশগুলো এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক বাজারের সঙ্গে বাণিজ্য ও সংযোগ জোরদার করার সুযোগ রাখে। ঐতিহাসিকভাবে নদীপথগুলো এমন সব জনপদ ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রকে সংযুক্ত করত, যা বর্তমানে আন্তর্জাতিক সীমানার কারণে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। কার্যকর দ্বিপাক্ষিক চুক্তি ও আঞ্চলিক পরিবহন ব্যবস্থার সহায়তায় নৌপথগুলোতে নতুন করে বিনিয়োগ করা গেলে, এই অর্থনৈতিক সংযোগের কিছুটা পুনরুদ্ধার সম্ভব হতে পারে।

অভিন্ন নদী ও অভ্যন্তরীণ জলপথ ব্যবহারের ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে সহযোগিতা আঞ্চলিক বাণিজ্যে বড় ভূমিকা রাখতে পারে— যদি এর সঙ্গে সুনির্দিষ্ট ও নির্ভরযোগ্য কার্যপদ্ধতি, নৌ-চলাচলের সুযোগ, পর্যাপ্ত অবকাঠামো এবং পারস্পরিক লাভজনক ব্যবস্থা যুক্ত থাকে। এছাড়া ভৌগোলিক অবস্থান, যথাযথ চুক্তি এবং বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর পরিবহন সংযোগের ওপর ভিত্তি করে নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে জলপথের উন্নয়ন বাণিজ্য ও ট্রানজিটের ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে আন্তঃসীমান্ত সংযোগকে কেবল বাণিজ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা উচিত নয়। বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে অনেক আন্তঃসীমান্ত নদী প্রবাহিত হয়; এসব নদীর পানির প্রাপ্যতা, প্রবাহের সময়কাল এবং গুণমান আন্তর্জাতিক সীমান্তের উভয় পাশের কৃষি, মৎস্যসম্পদ, বাস্তুতন্ত্র এবং জনগোষ্ঠীর জীবিকার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।

তাই কার্যকর নদী-কূটনীতির ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি ন্যায়সংগত পানি ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছ তথ্য আদান-প্রদান এবং পরিবেশ সুরক্ষার সমন্বয় থাকা আবশ্যক। নৌ-চলাচল ও বাণিজ্যবিষয়ক চুক্তিগুলো অভিন্ন পানিসম্পদের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনাকে দুর্বল না করে বরং তাকে আরও শক্তিশালী করে তুলবে— এমনটিই হওয়া উচিত। যে দেশ তার অভ্যন্তরীণ জলপথগুলোকে আঞ্চলিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করার পাশাপাশি নিজস্ব পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে, তারা তাদের ভৌগোলিক অবস্থানকে দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সুবিধায় রূপান্তর করার ক্ষেত্রে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে।

নদীর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কেবল পরিবহন ও কৃষির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। নদীমাতৃক ভূদৃশ্য, ঐতিহাসিক বন্দর, নৌ-সংস্কৃতি, জলাভূমি এবং অনন্য গ্রামীণ জনপদগুলো পর্যটন, বিনোদন ও সাংস্কৃতিক উদ্যোগের সুযোগ তৈরি করে। সুপরিকল্পিত নদী তীরবর্তী উন্নয়ন জনপরিসরকে উন্নত করার পাশাপাশি স্থানীয় বাণিজ্যের জন্যও নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে পর্যটন উদ্যোগগুলো এমনভাবে পরিকল্পনা করা উচিত, যাতে পরিবেশগত ধারণক্ষমতা, নৌ-চলাচলের নিরাপত্তা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকারের বিষয়টি গুরুত্ব পায়।

বাংলাদেশ তার আন্তঃসংযুক্ত জলজ সম্পদের মাধ্যমে ‘ব্লু ইকোনমি’ বা নীল অর্থনীতির বৃহত্তর সম্ভাবনাও কাজে লাগাতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে মৎস্যসম্পদ, জলজ জীববৈচিত্র্য, জলপথ-ভিত্তিক পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা এবং অভ্যন্তরীণ নৌপথ ও উপকূলীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক। এ ধরনের উন্নয়ন অবশ্যই পরিবেশগত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে হতে হবে; একে যেন অবাধ বাণিজ্যিক শোষণের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা না হয়। মূল নীতি হওয়া উচিত— নদীকে কেন্দ্র করে পরিচালিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যেন সম্পদটিকে নিঃশেষ না করে, বরং এর দীর্ঘমেয়াদি মূল্যকে আরও সুদৃঢ় করে।
নদী-কেন্দ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে যেকোনো গভীর আলোচনায় বন্যা, নদীভাঙন, পলি জমা, দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো ঝুঁকিগুলোকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের নদী ব্যবস্থা যেমন বিপুল অর্থনৈতিক সুবিধা দেয়, তেমনি এটি বিভিন্ন জনপদ ও অবকাঠামোকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখেও ফেলে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন, চরম আবহাওয়া পরিস্থিতির তীব্রতা বৃদ্ধি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়া এবং উপকূলীয় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় লবণাক্ততা প্রবেশের মতো সমস্যাগুলো বিদ্যমান পানি ব্যবস্থাপনা চ্যালেঞ্জকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। এই চাপগুলো কৃষি, মিঠা পানির প্রাপ্যতা, অবকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। এর যথাযথ সমাধান হলো নদীকে কেবল নিয়ন্ত্রণযোগ্য ‘হুমকি’ হিসেবে না দেখা। বরং বাংলাদেশের প্রয়োজন এমন একটি সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি, যা নদীর পরিবেশগত ভূমিকাগুলোকে স্বীকৃতি দেবে এবং একই সঙ্গে পরিহারযোগ্য ঝুঁকিগুলো কমিয়ে আনবে।

বাংলাদেশের নদীগুলোর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হয়তো ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক বিচ্ছিন্নতা। নদী ব্যবস্থাপনার সঙ্গে পানিসম্পদ, নৌ-চলাচল, ভূমি প্রশাসন, পরিবেশ সুরক্ষা, মৎস্য সম্পদ, স্থানীয় সরকার এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মতো একাধিক সরকারি সংস্থা জড়িত থাকে। এসব সংস্থার দায়িত্ব পালনের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব থাকলে অবকাঠামোগত বিনিয়োগ অকার্যকর হয়ে পড়তে পারে এবং পরিবেশগত সমস্যাগুলো দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। নদী দখল, অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্য, পৌর বর্জ্য, প্লাস্টিক দূষণ এবং নদীর তীরবর্তী এলাকা অপরিকল্পিতভাবে দখল করার ফলে যে ব্যয় তৈরি হয়, তা প্রায়শই বেসরকারি বাণিজ্যিক হিসাব-নিকাশে অন্তর্ভুক্ত থাকে না। এই ব্যয়ের বোঝা শেষ পর্যন্ত স্থানীয় জনগোষ্ঠী, সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর বর্তায়।

বাংলাদেশের প্রয়োজন পরিবেশগত মানদণ্ডগুলোর কঠোর প্রয়োগ, শিল্পকারখানার বর্জ্য নিঃসরণের ওপর স্বচ্ছ নজরদারি, কার্যকর বর্জ্য পানি শোধন ব্যবস্থা এবং নদী অববাহিকাগুলোর ধারাবাহিক সুরক্ষা। শিল্প প্রবৃদ্ধি এবং নদী সংরক্ষণকে একে অপরের পরিপন্থি হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং কৃষি, মৎস্য চাষ, উৎপাদন শিল্প এবং নগর উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদি টেকসই অবস্থার জন্য বিশুদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য পানিসম্পদ অপরিহার্য। যৌথ তথ্য ব্যবস্থা, সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব বণ্টন এবং পরিমাপযোগ্য কর্মক্ষমতা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় জোরদার করা প্রয়োজন। নদী-কেন্দ্রিক বড় প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে কঠোর অর্থনৈতিক মূল্যায়ন ও পরিবেশগত প্রভাব যাচাই করা উচিত। একই সঙ্গে এসব প্রকল্পের সম্ভাব্য সুফল, আর্থিক ব্যয়, রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজনীয়তা এবং সম্ভাব্য সামাজিক প্রভাব সম্পর্কে জনসমক্ষে তথ্য প্রকাশ করা জরুরি।

সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অর্থবহ অংশগ্রহণ থাকা আবশ্যক। জেলে, কৃষক, নৌযান চালক, নদীর তীরবর্তী বাসিন্দা এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে নদীর পরিবর্তনশীল অবস্থা ও উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর ফলাফল সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান থাকে। তাদের অংশগ্রহণ প্রকল্পের নকশাকে উন্নত করতে পারে, সংঘাত কমাতে পারে এবং সরকারি বিনিয়োগকে প্রকৃত চাহিদার সঙ্গে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তুলতে পারে। বাংলাদেশের এমন একটি সুসংহত জাতীয় কাঠামো প্রয়োজন, যা নদী ব্যবস্থাপনাকে দেশের বৃহত্তর উন্নয়ন অগ্রাধিকারগুলোর সঙ্গে যুক্ত করবে। ড্রেজিং, নদীবন্দর নির্মাণ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পর্যটন এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণকে বিচ্ছিন্ন প্রকল্প হিসেবে না দেখে, নীতিনির্ধারকদের উচিত প্রতিটি নদী অববাহিকা এবং জাতীয় অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে এই উদ্যোগগুলো একে অপরের ওপর কী প্রভাব ফেলে, তা মূল্যায়ন করা।

প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলপথগুলো চিহ্নিত করা এবং সেগুলোর বাণিজ্যিক উপযোগিতা, পরিবেশগত সংবেদনশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি নৌ-চলাচল সক্ষমতা যাচাই করা। এরপর সরকারি বিনিয়োগ এমন সব জলপথ বা করিডোরে কেন্দ্রীভূত করা উচিত, যেখানে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা বাণিজ্য, কৃষি এবং আঞ্চলিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সুফল বয়ে আনতে পারে।

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের নদীবন্দরগুলোকে আধুনিকায়ন করা এবং সেগুলোকে সড়ক ও রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযুক্ত করা প্রয়োজন। ডিজিটাল কার্গো ট্র্যাকিং, বন্দরের কার্যপদ্ধতিতে পূর্বাভাসযোগ্যতা, নৌযানের নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং টার্মিনাল ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন অভ্যন্তরীণ জলপথ পরিবহনকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে সাহায্য করবে।

তৃতীয়ত, নদী পুনরুদ্ধার ও দূষণ নিয়ন্ত্রণকে অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে হবে। একটি দূষিত নদীতে হয়তো নৌযান চলাচল অব্যাহত থাকতে পারে, কিন্তু মৎস্যসম্পদের অবনতি, পানি শোধনের ব্যয় বৃদ্ধি এবং পার্শ্ববর্তী জনপদগুলোর স্বাস্থ্যকর বাস্তুতন্ত্রের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণে নদীটির সামগ্রিক অর্থনৈতিক মূল্য হ্রাস পায়।

চতুর্থত, অর্থায়নের ক্ষেত্রে অবকাঠামো নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ— উভয় বিষয়কেই বিবেচনায় রাখতে হবে। যে অবকাঠামো যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা যায় না, তা থেকে প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া সম্ভব নয়। সরকারি বিনিয়োগ, সুপরিকল্পিত বেসরকারি অংশগ্রহণ এবং উন্নয়ন অংশীদারিত্ব— এসবই কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, তবে শর্ত হলো প্রকল্পগুলোকে অবশ্যই স্বচ্ছ, আর্থিকভাবে টেকসই এবং পরিবেশবান্ধব হতে হবে।

পরিশেষে সরকারের উচিত অগ্রগতির পরিমাপযোগ্য সূচক নির্ধারণ করা। এর মধ্যে থাকতে পারে অভ্যন্তরীণ জলপথে পরিবাহিত পণ্যের পরিমাণ, লজিস্টিক ব্যয়, বিভিন্ন মৌসুমে নৌপথের নাব্যতা, শিল্পদূষণ হ্রাস, নদীবন্দরগুলোর কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা। এই ধরনের সূচক নীতিনির্ধারকদের এটি মূল্যায়ন করতে সহায়তা করবে যে, নদীকেন্দ্রিক ব্যয় কেবল প্রকল্পের সংখ্যাই বাড়াচ্ছে, নাকি প্রকৃতপক্ষে প্রকৃত অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি করছে। বাংলাদেশের সমৃদ্ধি কেবল নদীর ওপর কতটা কার্যকরভাবে সেতু নির্মাণ করা হলো তার ওপরই নির্ভর করবে না, বরং নদীকে কেন্দ্র করে কতটা বিচক্ষণতার সঙ্গে একটি অর্থনীতি গড়ে তোলা হলো, তার ওপরও নির্ভর করবে। এ দেশের নদীগুলো যেমন অতীতে এর ইতিহাস গড়ে দিয়েছে, তেমনি একটি সুসংহত রূপকল্প ও দায়িত্বশীল শাসনের মাধ্যমে এগুলো ভবিষ্যতে আরও প্রতিযোগিতামূলক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং সহনশীল অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ গঠনে সহায়তা করতে পারে। অতএব এখন প্রয়োজন নদীকে কেন্দ্র করে বিচ্ছিন্ন কোনো উদ্যোগ নয়, বরং একটি সুদূরপ্রসারী, সমন্বিত ও পরিবেশবান্ধব জাতীয় উন্নয়ন-দর্শন।

প্রভাষক (বাংলাদেশ স্টাডিজ)
কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ (সিএসই)
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি