ভারত সরকারি কর্মচারীদের বেতন কোন পদ্ধতিতে বাড়ায়? (ভিডিও)
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক:

 

ভারতে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর পদ্ধতি কী? বেতন বাড়াতে কি প্রতি বছর নতুন করে পে কমিশন গঠন করা হয়? নাকি মূল্যস্ফীতি বাড়লেই কর্মচারীদের বেতনের সঙ্গে যুক্ত হয় বাড়তি টাকা?

ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীদের বেতনব্যবস্থায় রয়েছে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একটি হলো পে কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী মূল বেতন পুনর্নির্ধারণ। অন্যটি হলো মহার্ঘ ভাতা, যার ইংরেজি নাম ডিয়ারনেস অ্যালাওয়েন্স বা ডিএ।

এই দুটি বিষয় কীভাবে কাজ করে, তা বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে ভারতের সপ্তম কেন্দ্রীয় পে কমিশনের ব্যবস্থায়।

ভারতে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীদের বেতন, ভাতা, পেনশন এবং চাকরির বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পর্যালোচনার জন্য নির্দিষ্ট সময় পরপর পে কমিশন গঠন করা হয়। কমিশন অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, সরকারি ব্যয়ের সামর্থ্য এবং কর্মচারীদের দাবি বিবেচনা করে সুপারিশ দেয়। এরপর সরকার সেই সুপারিশ পর্যালোচনা করে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়। অর্থাৎ কমিশনের সুপারিশ আর সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এক বিষয় নয়।

ভারতের সপ্তম পে কমিশনের সুপারিশ কার্যকর হয় ২০১৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে। কমিশন সর্বনিম্ন মূল বেতন ১৮ হাজার রুপি নির্ধারণের সুপারিশ করেছিল। পাশাপাশি পুরোনো বেতন কাঠামো বদলে চালু করা হয় নতুন পে ম্যাট্রিক্স। এই কাঠামোয় কর্মচারীর পদ ও বেতনস্তর অনুযায়ী মূল বেতন নির্ধারণের ব্যবস্থা করা হয়।

এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ছিল ২ দশমিক ৫৭ গুণের ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর। সহজভাবে বললে, পুরোনো কাঠামোয় কর্মচারীর মূল বেতনকে ২ দশমিক ৫৭ দিয়ে গুণ করে নতুন পে ম্যাট্রিক্সে তার বেতন নির্ধারণ করা হতো। তবে এই পুরো গুণফলকে নতুন করে বেতন বৃদ্ধি ভাবলে ভুল হবে। এর মধ্যে আগের মহার্ঘ ভাতার প্রভাবও হিসাব করা হয়েছিল। কমিশনের হিসাবে প্রকৃত বেতন বৃদ্ধির অংশ ছিল ১৪ দশমিক ২৯ শতাংশ।

কিন্তু পে কমিশন তো প্রতিদিনের বাজারদরের পরিবর্তন ধরে বেতন পুনর্নির্ধারণ করে না। তাহলে চাল, ডাল, বাসাভাড়া কিংবা যাতায়াতের খরচ বাড়লে কর্মচারীরা কীভাবে কিছুটা বাড়তি সুবিধা পান?

এখানেই আসে ডিএ বা মহার্ঘ ভাতার বিষয়টি।

ডিএ হলো মূল বেতনের একটি নির্দিষ্ট শতাংশ। মূল্যস্ফীতির প্রভাব সামলাতে এই ভাতা সমন্বয় করা হয়। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীদের ডিএ সাধারণত বছরে দুবার-জানুয়ারি ও জুলাই থেকে কার্যকর হওয়ার ভিত্তিতে পর্যালোচনা করা হয়। তবে সংশোধনের ঘোষণা ও টাকা দেওয়ার সময় এক নাও হতে পারে।

ডিএ নির্ধারণে ব্যবহার করা হয় শিল্পশ্রমিকদের ভোক্তা মূল্যসূচক, যার নাম অল ইন্ডিয়া কনজিউমার প্রাইস ইনডেক্স ফর ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স। সংক্ষেপে এআইসিপিআই-আইডব্লিউ। এই সূচকে শ্রমজীবী মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও পরিষেবার দামের পরিবর্তন ধরা হয়। নির্ধারিত সূত্রে সূচকের গড় হিসাব করে ডিএর হার বের করা হয়। ফলে শুধু এক মাসে বাজারদর বেড়েছে বলেই ডিএ একই হারে বেড়ে যায় না; নির্দিষ্ট সময়ের সূচকের হিসাব গুরুত্বপূর্ণ।

একটি সহজ উদাহরণ দেওয়া যাক।

ধরা যাক, একজন কর্মচারীর মূল বেতন ৩০ হাজার রুপি। তার ডিএর হার ৬০ শতাংশ হলে, তিনি মূল বেতনের সঙ্গে অতিরিক্ত ১৮ হাজার রুপি মহার্ঘ ভাতা পাবেন। অর্থাৎ মূল বেতন ও ডিএ মিলিয়ে হবে ৪৮ হাজার রুপি। এখানে বাড়িভাড়া বা অন্য কোনো ভাতা যোগ করা হয়নি।

এখন ডিএর হার যদি ৬৩ শতাংশ হয়, তাহলে একই মূল বেতনের ওপর ডিএ দাঁড়াবে ১৮ হাজার ৯০০ রুপি। অর্থাৎ আগের তুলনায় মাসে ৯০০ রুপি বেশি। খেয়াল করুন, এখানে মূল বেতন বাড়েনি; বেড়েছে মূল বেতনের ওপর হিসাব করা মহার্ঘ ভাতা।

২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীদের ডিএ ৫৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৬০ শতাংশ করা হয়। সরকারি ঘোষণায় বলা হয়, এই সিদ্ধান্তের সুবিধা পাবেন প্রায় ৫০ লাখ কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারী এবং ৬৮ লাখের বেশি পেনশনভোগী। পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রে একই ধরনের সুবিধার নাম ডিয়ারনেস রিলিফ বা ডিআর।

তবে একটা বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। ডিএ বাড়লেই সব কর্মচারীর মোট বেতন একই অঙ্কে বাড়ে না। কারও মূল বেতন বেশি, কারও কম। তাই একই শতাংশে ডিএ বাড়লেও টাকার অঙ্কে পার্থক্য হয়। আবার বাড়িভাড়া ভাতা বা অন্য ভাতা সংশ্লিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত হয়।

আরেকটি বিষয় হলো, ডিএর হার আর পে কমিশনের ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর এক নয়। ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর নতুন বেতন কাঠামোয় মূল বেতন নির্ধারণে ব্যবহৃত হয়েছিল। অন্যদিকে ডিএ মূল্যস্ফীতির প্রভাব সামলাতে মূল বেতনের ওপর শতাংশ হিসেবে হিসাব করা হয়।

ভারতের এই ব্যবস্থা থেকে বাংলাদেশের জন্য আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা রয়েছে। দীর্ঘ সময় পরপর বড় আকারে বেতন কাঠামো সংশোধনের পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির সঙ্গে যুক্ত ভাতা নিয়মিত পর্যালোচনার ব্যবস্থা থাকলে কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতার পরিবর্তন বোঝা সহজ হতে পারে। তবে এমন ব্যবস্থা চালু করতে হলে মূল্যস্ফীতির নির্ভরযোগ্য সূচক, সরকারি অর্থের সংস্থান, নিয়মিত পর্যালোচনা এবং স্বচ্ছ হিসাব-সবকিছুই বিবেচনায় নিতে হবে।

সবশেষে মনে রাখতে হবে, সপ্তম পে কমিশন ভারতের একটি নির্দিষ্ট সময়ের বেতন কাঠামো ব্যাখ্যা করে। ভারত ইতিমধ্যে অষ্টম কেন্দ্রীয় পে কমিশন গঠন করেছে। নতুন কমিশনের কাজ হলো কেন্দ্রীয় কর্মচারীদের বেতন, ভাতা ও অবসর-সুবিধা পর্যালোচনা করে সুপারিশ দেওয়া। তবে কমিশন গঠন মানেই নতুন বেতন কাঠামো ইতিমধ্যে কার্যকর হয়ে গেছে, এমন নয়।

ভারতের পে কমিশন পদ্ধতির মূল শিক্ষা হলো, মূল বেতন পুনর্নির্ধারণ এবং মূল্যস্ফীতির সঙ্গে ভাতা সমন্বয়-দুটি আলাদা প্রক্রিয়া। কর্মচারীদের আয় কীভাবে বাড়ছে, তা বুঝতে হলে দুটিকেই আলাদাভাবে দেখতে হবে।

ভারতে ডিএ বাড়লে কত টাকা বেশি পান কর্মীরা?

ভারতে সরকারি কর্মচারীদের ডিএ বা মহার্ঘ ভাতা কীভাবে হিসাব করা হয়, জানেন?ধরা যাক, আপনার মূল বেতন ৩০ হাজার রুপি। ডিএর হার ৬০ শতাংশ হলে আপনি পাবেন ১৮ হাজার রুপি। অর্থাৎ মূল বেতন ও ডিএ মিলিয়ে ৪৮ হাজার রুপি। এখন ডিএ ৬৩ শতাংশ হলে ভাতা হবে ১৮ হাজার ৯০০ রুপি। মাসে বাড়বে ৯০০ রুপি। তবে মনে রাখবেন, ডিএ বাড়লে মূল বেতন বাড়ে না। মূল বেতনের ওপর ভাতার অঙ্ক বাড়ে। এ কারণেই পে কমিশন আর ডিএ-দুটি আলাদা বিষয়।  

—জা. অর্থনীতি/এলএটি