স্বামী নিখোঁজ, তবু থামেনি মমতার জীবনসংগ্রাম
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

হিলি (দিনাজপুর) প্রতিনিধি: ‘শাক লাগবে শাক, বারো মিশালি শাক’—সকাল হলেই এমন হাঁকডাকে মুখর হয়ে ওঠে দিনাজপুরের হিলি পৌর এলাকার পাড়া-মহল্লা। মাথায় শাকের বোঝা নিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ছুটে চলেন ৩০ বছর বয়সী মমতা বেগম।

স্বামী নিখোঁজ, সংসারের হাল ধরার মতো আর কেউ নেই। তাই দুই ছেলে ও ছোট মেয়ের মুখে খাবার তুলে দিতে প্রতিদিন বেরিয়ে পড়েন তিনি। ভোরে বের হন, ফেরেন দিন শেষে।

মমতার বাড়ি জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার হাটখোলা গ্রামে। তিনি ২ ছেলে ও দুই মেয়ের জননী। বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছে। দুই ছেলে মাদ্রাসায় পড়ে, ছোট মেয়ে থাকে মায়ের সঙ্গে।

দীর্ঘদিন ধরে স্বামীর কোনো খোঁজ নেই, সংসারের খরচও তিনি দেন না। ফলে সন্তানদের ভরণপোষণ ও পড়াশোনার ব্যয়, সবকিছুর দায়িত্ব এখন মমতার কাঁধে। নানির দেওয়া সামান্য জমিতে একটি ছোট কুঁড়েঘরেই তাদের আশ্রয়।

হিলি শহর থেকে মমতার বাড়ি প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে। গ্রামের মাঠঘাট থেকে বারো মিশালি শাক, কলার থোর, মোচাসহ নানা শাকসবজি সংগ্রহ করেন তিনি। এরপর বস্তায় ভরে মাথায় তুলে হেঁটে পৌঁছান হিলিতে। সকাল থেকে দুপুর, কখনো বিকেল পর্যন্ত ঘুরে ঘুরে সেগুলো বিক্রি করেন।

রোদ-বৃষ্টি বা ক্লান্তি কিছুই তার পথচলায় বাধা হতে পারে না। কারণ একদিনের আয় বন্ধ হলে সংসারের চুলা জ্বলবে কি না, সেই দুশ্চিন্তা তাকে তাড়া করে ফেরে। সারা দিনের পরিশ্রমে আয় সামান্য, তা দিয়েই চলে সংসার, সন্তানদের খাবার ও পড়ার খরচ, চিকিৎসা। তবু হাল ছাড়েন না মমতা।

হিলির ভীমপুর গ্রামের গৃহিণী নাহিদা আক্তার বলেন, এই আপা অনেক ভালো মানুষ। প্রতিদিন সকালে তাকে শাক বিক্রি করতে দেখি। মাথায় করে এত দূর থেকে হেঁটে আসেন। দেখলে খুব কষ্ট হয়। আমি যতটা পারি সহযোগিতা করার চেষ্টা করি।

মহিলা কলেজপাড়ার বাসিন্দা মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, সন্তানদের মানুষ করতে এই নারীর পরিশ্রম সত্যিই প্রশংসনীয়। সমাজের সামর্থ্যবান মানুষের উচিত তার মতো অসহায় মায়েদের পাশে দাঁড়ানো।

নিজের কষ্টের কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন মমতা। তিনি বলেন, অনেকে অনেক কথা বলে, আমি কিছু মনে করি না। ছেলেমেয়ে জন্ম দিয়েছি, তাদের মানুষ করতে হবে। আমি তো মা, তাদের ফেলে রাখতে পারি না। হাড়ভাঙা পরিশ্রম করলেও সন্তানদের মুখে হাসি দেখলে সব কষ্ট দূর হয়ে যায়।

মমতার কাছে জীবন মানে শুধু বেঁচে থাকা নয়, সন্তানদের জন্য একটু ভালো ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার নিরন্তর চেষ্টা। সমাজের সহমর্মিতা ও সহযোগিতা পেলে তার জীবনসংগ্রামের বোঝা কিছুটা হালকা হতে পারে।

—জা. অর্থনীতি/এনজে