হাসানের ইতিহাস

ক্রীড়া প্রতিবেদক: এক হ্যাটট্রিকেই ইতিহাস, পাঁচ উইকেটে সেই ইতিহাসের পূর্ণতা। আবুধাবি টেস্টের তৃতীয় দিনটি যেন পুরোপুরিই নিজের করে নিলেন হাসান মাহমুদ। বাংলাদেশের প্রথম পেসার হিসেবে টেস্টে হ্যাটট্রিক করার পর ইনিংসে তুলে নিয়েছেন পাঁচ উইকেটও! তার সঙ্গে এবাদত হোসেনের দুর্দান্ত বোলিংয়ে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে আফগানিস্তানের ব্যাটিং। দিনের শুরুতে ৪ উইকেটে ২১১ রান নিয়ে খেলতে নামা স্বাগতিকরা শেষ পর্যন্ত প্রথম ইনিংসে গুটিয়ে গেছে ২৪০ রানে। 

গতকাল দিনের শুরুতেই নতুন বল হাতে পেয়ে আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়ে বাংলাদেশ। সেই আক্রমণের প্রথম সাফল্য এনে দেন এবাদত। তার অফ স্টাম্পের বাইরে পড়া বল ভেতরে ঢুকে ইকরামের ব্যাট ও প্যাডের ফাঁক গলে সরাসরি আঘাত হানে স্টাম্পে। চলতি ইনিংসে এটি ছিল এবাদতের তৃতীয় উইকেট। এর পরই শুরু হয় হাসান মাহমুদের দাপট।

আফগানিস্তানের ইনিংসের ৮৩তম ওভারে টানা তিন বলে তিন ব্যাটসম্যানকে সাজঘরে ফেরান হাসান। প্রথম বলে ব্যাক অব আ লেংথের ডেলিভারি নিচু হয়ে ভেতরে ঢুকে গেলে কিছুই করার ছিল না ইসমত আলমের। সরাসরি বোল্ড হয়ে ফেরেন তিনি। পরের বলে কায়েস আহমেদের ব্যাটের কানায় লেগে বল চলে যাচ্ছিল স্লিপের দিকে। ডান দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে দুর্দান্ত ক্যাচ নিয়ে হাসানের হ্যাটট্রিকের সম্ভাবনা জিইয়ে রাখেন লিটন দাস।

হ্যাটট্রিকের জন্য তখন প্রয়োজন আর মাত্র একটি উইকেট। ওভারের পঞ্চম বলে জিয়া উর রেহমানের প্যাডে বল লাগতেই জোরালো আবেদন করেন বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা। কিন্তু আম্পায়ার আউট না দেওয়ায় রিভিউ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। রিপ্লেতে দেখা যায়, বল সরাসরি অফ স্টাম্পের ওপরের অংশে আঘাত করত। আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত বদলে যেতেই সতীর্থদের উল্লাসে ভেসে যান হাসান। পূর্ণ হয় বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসের তৃতীয় হ্যাটট্রিক।

এই কীর্তির মধ্য দিয়ে একাধিক দিক থেকে ইতিহাসের অংশ হয়েছেন হাসান। ২০০৩ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে অলক কাপালি এবং ২০১৩ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সোহাগ গাজী টেস্টে বাংলাদেশের হয়ে হ্যাটট্রিক করেছিলেন। তবে দুজনই ছিলেন স্পিনার। হাসানই প্রথম পেসার, যিনি লাল বলের ক্রিকেটে বাংলাদেশের হয়ে পর পর তিন বলে তিন উইকেট নেওয়ার কৃতিত্ব দেখালেন। শুধু বাংলাদেশেই নয়, সব দেশ মিলিয়ে চলতি বছর টেস্ট ক্রিকেটে এটিই প্রথম হ্যাটট্রিক। আর টেস্টের দীর্ঘ ইতিহাসে এটি ৫০তম হ্যাটট্রিকের ঘটনা।

হ্যাটট্রিকের আনন্দের মধ্যেই থেমে থাকেননি হাসান। আফগানিস্তানের প্রথম ইনিংসে ২১ ওভার বল করে ৫৫ রান দিয়ে নিয়েছেন ৫ উইকেট। পাঁচটি মেডেনও আদায় করেছেন তিনি। মাত্র ১৭ টেস্টের ক্যারিয়ারে এটি তার চতুর্থ পাঁচ উইকেটের ইনিংস। একই ম্যাচে হ্যাটট্রিক ও ফাইফার-দুটি অর্জনই তার পারফরম্যান্সকে দিয়েছে বাড়তি মাত্রা।

এদিন আরও একটি ব্যক্তিগত মাইলফলক স্পর্শ করেছেন হাসান। বাংলাদেশের দ্রুততম পেসার হিসেবে টেস্টে ৫০ উইকেটের ঘরে পৌঁছেছেন তিনি। এর আগে বাংলাদেশের পেসারদের মধ্যে এই কৃতিত্ব ছিল মাশরাফি বিন মুর্তজা ও তাসকিন আহমেদের। ফলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজের অবস্থান আরও শক্ত করলেন এই তরুণ পেসার।

অন্যদিকে, আফগানিস্তানের পতন ত্বরান্বিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন এবাদতও। হাসানের পাঁচ উইকেটের সঙ্গে তার শিকার দুটি। সব মিলিয়ে তৃতীয় দিনের সকালে মাত্র ২৯ রান যোগ করতেই ৬ উইকেট হারায় আফগানিস্তান। ২১১ থেকে ২৪০-স্কোরবোর্ডে রান বাড়লেও উইকেট হারানোর ধাক্কা সামলাতে পারেনি স্বাগতিকরা।

এর আগে বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস শেষ হয়েছিল ৩৪৬ রানে। সেঞ্চুরি না এলেও তিন ব্যাটসম্যানের অর্ধশতকে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছিল দল। তানজিদ তামিম ৮৩, সাদমান ইসলাম ৬৭ এবং লিটন দাস ৫৩ রান করেন। আফগানিস্তানকে ২৪০ রানে আটকে দিয়ে এখন ১০৬ রানের লিড বাংলাদেশের হাতে।

আবুধাবির এই টেস্টে তাই আলোচনার কেন্দ্রে এখন হাসান মাহমুদ। হ্যাটট্রিক, ফাইফার, দ্রুততম পেসার হিসেবে ৫০ উইকেট-একদিনেই তিনটি বড় অর্জন। ব্যক্তিগত রেকর্ডের এমন ঝলককে এবার ম্যাচ জয়ের উপলক্ষে পরিণত করতে পারলেই হাসানের এই ঐতিহাসিক দিনটি বাংলাদেশের ক্রিকেটে আরও স্মরণীয় হয়ে থাকবে!