স্টারলিংকের লাইসেন্স আটকা, মাস্কের প্রশ্ন- ভারতের আসল মালিক কে?
ছবি: এআই জেনারেট

জাতীয় অর্থনীতি আন্তর্জাতিক: ভারতের বাজারে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা স্টারলিংকের অনুমোদন নিয়ে বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্ক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, ‘আম্বানি কি ভারতের আসল মালিক?’ রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান মুকেশ আম্বানির দিকেই এই ইঙ্গিত বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা, যদিও মাস্ক সরাসরি কারও নাম নেননি।

বুধবার মাস্ক অভিযোগ করেন, ‘কিছু ক্ষমতাধর শিল্পপতি’ নিজেদের একচেটিয়া আধিপত্য ধরে রাখতে স্টারলিংকের প্রবেশে বাধা দিচ্ছেন। এটিকে তিনি ‘ভারতের জনগণের বিরুদ্ধে অপরাধ’ বলেও বর্ণনা করেন। বুধবারের পোস্টটি ছিল ডোজডিজাইনার নামের একটি অ্যাকাউন্টের পোস্টের জবাবে, যেখানে কর্তৃপক্ষকে স্টারলিংকের ছাড়পত্র দ্রুত শেষ করার আহ্বান জানানো হয়েছিল। বৃহস্পতিবার তিনি লেখেন, স্টারলিংক ১৬৫টির বেশি দেশে লাইসেন্সপ্রাপ্ত এবং গত পাঁচ বছর ধরে ভারত সরকারের সব আইন ও বিধিবিধান মেনে চলছে। তাহলে এখনো কেন লাইসেন্স মিলছে না? এর পরই আসে সেই প্রশ্ন, আম্বানি কি ভারতের আসল মালিক? এক ব্যবহারকারী মন্তব্য করেছিলেন, সরকার নাগরিকের চেয়ে সুবিধাভোগী ধনকুবেরদের স্বার্থ রক্ষায় বেশি আগ্রহী। মাস্কের পোস্ট ওই আলোচনারই অংশ।

মাস্কের পোস্ট পুনরায় শেয়ার করে লোকসভায় বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী লেখেন, ‘ভারতে স্বাগতম, ইলন। অন্যজনকে চিনতে পারা পর্যন্ত অপেক্ষা করুন।’ ক্ষমতাসীন শিবিরের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত শিল্পপতি গৌতম আদানির দিকেই তার ইঙ্গিত বলে ধারণা করা হচ্ছে। জবাবে মাস্ক রাহুলকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘এটি সত্যিই উদ্বেগজনক।’

এদিকে ভারত সরকার অবশ্য মাস্কের অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছে। টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় এটিকে ‘ভিত্তিহীন ও ভ্রান্ত ধারণাপ্রসূত’ বলে উল্লেখ করেছে। মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, অনুমোদন কাঠামো ন্যায্য ও বৈষম্যহীন। প্রতিটি স্যাটেলাইট যোগাযোগ সেবার লাইসেন্সধারীকে নিরাপত্তা বিধি মানার প্রমাণ দিতে হয়। দেশে ১০টির বেশি স্যাটেলাইট অপারেটর বাজারে এসেছে এবং এ খাতে শতভাগ বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ আছে। তিনটি কক্ষপথের স্যাটেলাইট সেবাদাতাকে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে এবং তিনটিরই নিরাপত্তা যাচাই চলছে প্রায় একই পর্যায়ে। যাচাই শেষ হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান স্পেকট্রাম বরাদ্দ চাইতে পারবে। দেশটির প্রতিমন্ত্রী চন্দ্রশেখর পেম্মাসানি বলেন, নিরাপত্তা ছাড়পত্র স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অপেক্ষমাণ, এর সঙ্গে কোনো একক প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক নেই।

একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, লাইসেন্সপ্রাপ্ত তিন প্রতিষ্ঠান হলো স্টারলিংক, রিলায়েন্স জিওর জিওস্যাটকম এবং ভারতী গোষ্ঠী-সমর্থিত ইউটেলস্যাট ওয়ানওয়ে। নিরাপত্তা ছাড়পত্র ও স্পেকট্রাম অনুমোদন না মেলা পর্যন্ত কেউই বাণিজ্যিক সেবা শুরু করতে পারবে না। অবশ্য অন্য একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লাইসেন্সের সঙ্গে সব স্যাটেলাইট যোগাযোগ প্রতিষ্ঠানকে অস্থায়ী স্পেকট্রামও দেওয়া হয়েছে।

স্টারলিংকের ব্যবসা পরিচালনা বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট লরেন ড্রেয়ার বুধবার জানান, প্রতিষ্ঠানটি সেবা শুরুর জন্য প্রস্তুত। ভারতে ২০টি গেটওয়ে সাইট ও শত শত অ্যান্টেনা বসানো হয়েছে এবং ব্যবহারকারীর তথ্য দেশের ভেতরে রাখার ব্যবস্থাও আছে। জিও প্ল্যাটফর্মসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আকাশ আম্বানি মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান; তিনি বলেন, মাস্কের বক্তব্য তিনি দেখেননি। ভারতী এয়ারটেলের চেয়ারম্যান সুনীল ভারতী মিত্তাল জানান, ইউটেলস্যাট ওয়ানওয়েও নিয়ন্ত্রক অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে।

মণিপুরে জঙ্গিরা স্টারলিংক ব্যবহার করছে বলে যে দাবি উঠেছিল, মাস্ক তা নাকচ করে বলেছেন, ভারতে এখন এর সেবা বন্ধ। তিনি আরও বলেন, স্টারলিংক উচ্চগতির ও সাশ্রয়ী ইন্টারনেট পৌঁছে দেবে সেসব মানুষের কাছে, যাদের সংযোগ নেই কিংবা বর্তমান দাম বহনের সামর্থ্য নেই। মাস্কের দাবি, বাধা দিয়ে আসলে সবচেয়ে অবহেলিত অঞ্চলের মানুষেরই ক্ষতি করা হচ্ছে।

রিলায়েন্স বা মুকেশ আম্বানির পক্ষ থেকে মাস্কের অভিযোগ নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। প্রাথমিক প্রতিবেদনগুলোতে রাহুল গান্ধী ছাড়া অন্য কোনো রাজনৈতিক নেতার প্রতিক্রিয়াও দেখা যায়নি।

তবে বেশ কয়েক বছর ধরেই ভারতে ব্যবসা শুরুর চেষ্টা করছে মাস্কের প্রতিষ্ঠানটি। স্টারলিংকের ভারতীয় শাখা ২০২৫ সালের জুনে টেলিযোগাযোগ লাইসেন্স পেয়েছিল। তবে বাণিজ্যিক সেবা শুরুর জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ছাড়পত্র ও স্পেকট্রাম এখনো মেলেনি। ওই বছরের মার্চেই স্টারলিংকের সেবা ভারতে বিতরণে রিলায়েন্স জিও ও স্পেসএক্সের মধ্যে চুক্তির খবর প্রকাশিত হয়েছিল, যা তখন অনেককে অবাক করেছিল। ফলে ভারতে স্টারলিংকের যাত্রা কবে শুরু হবে, তা অনিশ্চিত।