ইসমে আজম ঋজু: সুন্দরবনের মতো এমন একটি বৃহৎ বন দেখার সত্যিকার অর্থে সুযোগ পেয়েছিলাম ২০১৫ সালে। আমি তখন সাতক্ষীরার ওয়াইল্ডটিমের মুন্সীগঞ্জ ফিল্ড অফিসে কর্মরত। কাজটা ছিল সমগ্র সুন্দরবনে ছোট দলে বিভক্ত হয়ে পায়ে হেঁটে খুঁজে আনতে হবে বন্যপ্রাণীর বিশেষ কিছু নমুনা। ২০১৫ সালের ২১ ডিসেম্বর ভোরবেলায় রওনা হলাম আমরা। ভাটার টানে পানি কমে মিটার দশেক নদীর চর বেরিয়ে আছে। সাম্পান চরের কিনারে থামানো হলো। পানিতে নামতেই কাপড়ের জঙ্গল বুটের উষ্ণতায় থাকা পা ঠান্ডায় জমে গেল। পানি ও কাদা মিলে প্রায় হাঁটু পর্যন্ত দেবে গেলাম। কাদা পেরিয়ে কোনোরকম শক্ত মাটিতে পৌঁছলাম। নদী বরাবর ক্যালতাবাড়ী খালের মুখেই ডান পাড়ে কাদারতলা থেকে বনের মেঝে সমান পোড়ামাটির দেওয়াল চোখে পড়ল। এগুলোই সুন্দরবনের লবণের চুলা। কাছে গিয়ে দেখলাম চর থেকে কোমর সমান পোড়া মাটির মসৃণ দেয়াল। মাটির নিচে হয়তো এই দেওয়ালের বাকি অংশ আরও আছে। কাছাকাছি অনেক মৃৎপাত্রের ভাঙা টুকরো খোলামকুচি পড়ে ছিল। কয়েকটি টুকরো তুলে নিয়ে দেখলাম প্রায় প্রতিটিতে একই নকশা। চেক ছাপযুক্ত লাল রঙের মাটির পাত্রের ভাঙা অংশ।
ভাটায় পানি নেমে যাওয়ায় বনসংলগ্ন চরে খেয়াল করলাম লাল রঙের কিছু একটা ছড়িয়ে আছে সমগ্র চরময়। কাছে যেতেই চোখে পড়ল, প্রায় এক কিলোমিটার লম্বা কাদা চরে বহু লবণ চুলার ধ্বংসাবশেষ ও ভাঙা লাল কালো রঙের মৃৎপাত্রের টুকরো ছড়িয়ে আছে। তাই দূর থেকে চরের উপরিভাগ লালচে দেখাচ্ছিল। ঠায় দাঁড়িয়ে দেখলাম কিছুক্ষণ। সারি সারি লবণের চুলা দেখে অনুমান করতে চেষ্টা করলাম, কেমন মহা আয়োজন হয়েছিল সেই সময়। কত মানুষে জনমুখর ছিল এই গভীর বন। লবণের চুলার পোড়া মাটি, চেক ছাপ যুক্ত মৃৎপাত্রের অসংখ্য টুকরো, কিছু কালো রঙের টুকরো সেখানে পড়ে ছিল। তখন পর্যন্ত সুন্দরবনে লবণকেন্দ্রিক যতগুলো প্রত্নস্থল দেখেছি তার সবগুলো প্রায় একই রকম। লবণের চুলার পোড়ামাটি, চেক ছাপ যুক্ত মৃৎপাত্র ছড়িয়ে থাকা উপকূলীয় চর প্রাচীন লবণ পল্লিতে দাঁড়িয়ে নিজের মধ্যে বরাবরই শিহরণ অনুভব করি অজানা অতীত নিয়ে। জানতে হবে, কারা কখন কীভাবে এই লবণ শিল্প গড়ে তুলেছিল।
আমাদের ক্যাম্প থেকে শিবসা ধরে দক্ষিণে কিছু দূর গেলেই শেখেরটেক। শেখেরটেক বা শেখের বাড়ি নিয়ে ইতিহাসে ভিন্ন ভিন্ন মতামতও পাওয়া যায়। ইতিহাসবিদদের কেউ কেউ মনে করেন ১৬০০ শতকের এই স্থাপনা বারোভুঁইয়াদের এক ভুঁইয়া মহারাজ প্রতাপাদিত্য কর্তৃক নির্মিত শিবসা দুর্গ। আবার কেউ মনে করেন মোঘল আমলে মোঘল কর্তৃক এই দুর্গ নির্মিত হয়েছে। এমন ভীষণ বনে প্রাচীন মন্দির, দালান কোঠার ধ্বংসাবশেষ দেখার জন্য সার্ভের সবাই উদগ্রীব ছিলাম। আমাদের সাম্পান যেখানে থামানো হলো সেই পাড়ে বনের মেঝে থেকে ফুট দুই নিচের মাটির স্তরে ভাঙা মৃৎপাত্রের টুকরো বেরিয়ে থাকতে দেখলাম। বনের মধ্যে প্রায় ঘণ্টা খানেক হাঁটার পরে এক স্থানে ঝোপঝাড়ের আড়ালে ছোট একটি ইটের ঢিবি পেলাম। ঢিবি বেশি উঁচু নয় বনের মেঝে থেকে মাত্র ফুট দুই উঁচু হবে। লম্বা দেওয়ালের চিহ্ন মিলে একটি কক্ষ পেলাম। আশপাশে আরও ছোট বড়ো ঢিবি ছড়িয়ে আছে। অপূর্ব এক অনুভূতিতে গায়ের লোমগুলো দাঁড়িয়ে গেল। ইতিহাসে পড়া আর তা বাস্তবে দেখার রোমাঞ্চ এক নয়। একে একে কাছাকাছি ছড়িয়ে থাকা প্রতিটি স্তূপ ঘুরে দেখতে লাগলাম। এক স্তূপ থেকে আরেক স্তূপ করতে করতে সামনের দিকে এগিয়ে গেলাম। সামান্য যেতেই সামনে যা দেখলাম তাতে অবাক আর বিস্ময় প্রকাশ করা ছাড়া ওই মুহূর্তে অন্য কিছু মনে আসেনি। এই দিকের ভাঙা ইটের ঢিবিগুলো আকারে টিলার মতো উঁচু। ইটের কথা বাদ দিলে মনে হবে সুন্দরবনে ভেজা মাটি ফুঁড়ে যেন টিলা পাহাড় বেরিয়ে আছে। এমন উঁচু ঢিবি দেখে সহজেই অনুমান করা যায়, অতীতে বড়ো আকারের ইমারত ছিল। কালের গ্রাসে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
শেখেরটেক থেকে শিবসা ধরে দক্ষিণে রওনা দিলাম। শেখেরখাল থেকে ডানে আরেকটি খালে প্রবেশ করে কিছু দূর গিয়ে ডান পাড়ে নামলাম। সেখানে শত শত বছর পেরিয়ে এমন ভীষণ বনে প্রতিকূল আবহাওয়ার সঙ্গে লড়াই করে এখনও একটি মন্দির দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমে মন্দিরের চারপাশ ঘুরে দেখলাম। বনের মেঝে থেকে দুই থেকে আড়াই ফুট উঁচু ভিত্তির ওপর মন্দির দাঁড়িয়ে আছে। সকালে ভাটা ছিল তাই নদীর পাড়ের তলা পর্যন্ত ইটের স্তূপ দেখা যাচ্ছে। বোটে ওঠার সময় সেখান থেকে কিছু ইট উল্টেপাল্টে দেখছিলাম। এখানেও ইটে বিভিন্ন ছাপ দেখলাম। নকশা থাকতে পারে ভেবে অনুসন্ধান করতে গিয়ে ইটের তলায় একটি কাচের টুকরো পাওয়া গেল। হাতে নিয়ে দেখলাম কাচের টুকরোটি একটি চুড়ির ভাঙা টুকরো। ঘোলাটে সবুজভাবের কাচের ওপর সাদা ও কমলা রঙের প্রলেপ দেওয়া অমসৃণ কাচের চুড়ি। চুড়ির টুকরোটি সংগ্রহ করলাম। ফেরার পরে অনুসন্ধানে এটি ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল, রোম ও সুন্দরবনের মধ্যে সমৃদ্ধিশালী বাণিজ্যিক সম্পর্কের সন্ধান দিয়েছিল।
সার্ভে করার সুবাদে সমগ্র সুন্দরবন ঘুরে দেখার সুযোগ হয়েছিল। এমনটা হয়তো স্থানীয় বনজীবীদের বেলাতেও সম্ভব নয়। ২০১৭-১৮ সালে আবার গিয়ে দেখা পাই কামানদাগা প্রত্নস্থান, মান্দারবাড়িয়ার চর খোলামকুচির স্তূপের। নামকরণ করি আড়পাঙ্গাসিয়া প্রত্নস্থলের (এটি পরবর্তী সময়ে হাজার বছরের পুরোনো সুন্দরবনের প্রাচীন বসতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে আবিষ্কৃত হয়)। ২৫ জানুয়ারি ২০১৭, আমাদের কাজ ছিল সাগরকুলের বনাঞ্চলে। আগে মামুন্দা ও পশ্চিমে রায়মঙ্গল নদীর মধ্যবর্তী বনাঞ্চলে। এই দুই নদী দক্ষিণে এসে এক হয়ে মিশেছে সাগরে। সাম্পান থেকে চরে নেমে জেগে থাকা চরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলাম। চরের শেষ প্রান্তে গিয়ে পেলাম পনেরো থেকে কুড়ি ফুট জায়গা জুড়ে ইটের একটি স্তূপ। স্তূপের কাছাকাছি যেতেই পায়ের তলায় ইটের অস্তিত্ব টের পেলাম। স্তূপটিতে ধসে পড়া দেওয়ালের চিহ্ন বর্তমান। ইটের আকার আড়পাঙ্গাসিয়া প্রত্নস্থানের ইটের সমান। বেশ ভালো মানের ইট ব্যবহার হয়েছিল।
আমাদের সাম্পান সাগরকুল ঘেঁষে মামুন্দার উত্তরমুখী। জেগে থাকা সাগরকুলের চরের দিকে তাকিয়ে রইলাম। মাঝে মাঝে দূরবীনে চোখ দিয়ে কাদাচরে দৃষ্টি বুলিয়ে নিচ্ছিলাম। কেন জানি মন মানছিল না যে, ওই একটি মাত্র স্থাপনাই আছে। এভাবে কিছুদূর যেতেই চরের মাঝে দুটি স্থান ফুট খানেক উঁচু মনে হলে দূরবীনে চোখ রাখলাম। তাতে সন্দেহ আর গভীর হলো। কাদার মধ্যে উঁচু স্থানের কাছাকাছি যেতেই ইটের স্তূপ দেখতে পেলাম। ইটের গাঁথুনি ভালোভাবেই বুঝা যাচ্ছে। সামান্য দূরে আরেকটি স্তূপ পেলাম। সেটি আকারে ছোট, চার কোন বিশিষ্ট। এই স্তূপগুলোতে ভাঙা ইটের ব্যবহার একেবারেই নেই। কাদা মাটির গাঁথুনিতে প্রতিটি আস্ত ইটের ব্যবহার হয়েছে। স্তূপ তিনিটির আশেপাশে ভালোভাবে নজর দিয়ে দেখলাম আর কোন স্তূপের সন্ধান পাওয়া যায় কিনা। কিন্তু পেলাম না। তবে সাম্পান থেকে নেমে কয়েক মিটার পর থেকে এ পর্যন্ত আশেপাশে যতদূর ঘুরেছি সবখানেই কাদার তলায় ইটের অস্তিত্ব টের পেয়েছি। ইটের স্তূপ থেকে বন প্রায় ২০০ মিটার দূরে।
জিপিএস এ দেখলাম খেজুরদানার মুখের সেই স্তূপ থেকে এই ইটের স্তূপগুলোর দূরত্ব প্রায় ৮০০ মিটার। সমগ্র চরেই কাদার তলে ছড়িয়ে আছে ইট। তাহলে ভেবে দেখেন প্রথমে আমরা সাগরকুলের প্রথম ইটের স্তূপ দেখে মনে করেছিলাম ছোট কোনো স্থাপনা। অথচ একেবারে তার উল্টো! বঙ্গোপসাগর কূলে বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে ছিল স্থাপনাগুলো। একেবারে সাগর পাড় ঘুরে হিলসামাড়ী রায়মঙ্গলের চর পর্যন্ত। ভাবতেই রোমাঞ্চকর শিহরণ খেলে যাচ্ছে। এতো বিশাল অঞ্চল জুড়ে তৎকালীন কেমন ছিল বঙ্গের দক্ষিণের সাগর পাড়ের এই বসতী, নৌবন্দর বা সমুদ্র নগরী! সম্পূর্ণ জোয়ারে এই বিস্তীর্ণ প্রত্ন অঞ্চল প্রায় দুই থেকে তিন বা তার অধিক উচ্চতার পানির নিচে তলিয়ে যায়। নদী ব্যবহার করে যেমন উত্তরের জনপদে যাওয়া সহজ তেমনি বঙ্গোপসাগর দিয়ে সমগ্র পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ সহজ ছিল।
সুন্দরবনের প্রাচীনত্ব শুধু লবণেই সীমাবদ্ধ নয়। এই বনের আরও অজানা ইতিহাস আছে। এ যেন ইতিহাসের খনি! আড়পাঙ্গাসিয়া প্রত্নস্থলে সুন্দরবনের প্রাচীন বসতির বহু প্রত্নবস্তুর সন্ধান পেয়েছিলাম। ওই বছরই এমন অনেক প্রত্নস্থল ও প্রত্নবস্তু পেয়েছি যেগুলো সম্পর্কে ইতিহাসে কোনো উল্লেখ পাওয়া যায় না। পরবর্তী সময়ে প্রথম আলোর ইফতেখার ভাই আমার অনুসন্ধানগুলো জনসম্মুখে প্রকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। সে ধারাবাহিকতায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক সুফি মোস্তাফিজুর রহমান স্যার ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সোহরাব উদ্দিন স্যারও সুন্দরবনে আমার আবিষ্কৃত প্রত্নস্থানগুলো পরিদর্শন করেছেন। এই প্রত্নস্থলগুলোর বিশেষ কিছু নমুনা এতটাই চমকপ্রদ ও গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে সুন্দরবন ভূমির বয়স, মানুষের বসতি, নগরায়ণ ও ধর্ম সংস্কৃতি সম্পর্কে আমূল পরিবর্তন ও নতুনত্বের সন্ধান দিয়েছিল। সুন্দরবনের ইতিহাস জোয়ার-ভাটার সঙ্গে কখনও উন্মোচিত, কখনও বিলীন হয়।
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ও সুন্দরবননামা গ্রন্থের লেখক