ইবি প্রতিনিধি: কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) তীব্র লোডশেডিংয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন শিক্ষার্থীরা। বিদ্যুৎ সংকটে ব্যাহত হচ্ছে ল্যাব, লাইব্রেরি ও আবাসিক হলের কার্যক্রম। একই সঙ্গে ক্যাম্পাসসংলগ্ন মেস এলাকাতেও ঘনঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি বিকল্প পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় গ্রিডে উৎপাদন ঘাটতির কারণে এ সংকট তৈরি হয়েছে। পল্লী বিদ্যুতের স্বস্তিপুর জোনাল অফিসের ডিজিএম খালিদ মোহাম্মদ সালাউদ্দিন জানান, স্থানীয় সাবস্টেশন বা বিদ্যুৎ লাইনে কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি কিংবা ওভারলোডের সমস্যা নেই।
তিনি বলেন, ‘জাতীয় গ্রিডে প্রায় ৪ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন কমে যাওয়ায় এ সংকট তৈরি হয়েছে। আমাদের উপকেন্দ্রে প্রকৃত ২০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে গড়ে মাত্র ৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে চাহিদা আরও বেড়েছে।’
ক্যাম্পাসের তুলনায় সংলগ্ন আবাসিক ও মেস এলাকাগুলোতে লোডশেডিংয়ের মাত্রা আরও বেশি। এ বিষয়ে ডিজিএম বলেন, এসব এলাকা সাধারণ গ্রামীণ ফিডারের আওতাভুক্ত। ফলে মেস এলাকাগুলোকে আলাদা অগ্রাধিকার দেওয়ার কারিগরি সুযোগ নেই। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে আলাদা ‘এক্সপ্রেস ফিডারের’ মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল মালেক বলেন, বিদ্যুৎ সরবরাহের মূল নিয়ন্ত্রণ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের হাতে নেই। তবে উপ-উপাচার্যসহ প্রশাসনের সংশ্লিষ্টরা বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ও সমন্বয় করছেন।
এগিয়ে চলছে ইনডোর সাবস্টেশনের কাজ
চলমান সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে ইনডোর টাইপ ১০/১৪ এমভিএ ৩৩/১১ কেভি বৈদ্যুতিক সাবস্টেশন নির্মাণ করা হচ্ছে। এ বিষয়ে ২০২৫ সালের মে মাসে কুষ্টিয়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সঙ্গে চুক্তি করে বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রশাসন।
চুক্তি অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের চাহিদা অনুযায়ী অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। অতিরিক্ত বিদ্যুৎ থাকলে তা জনস্বার্থে পার্শ্ববর্তী এলাকায় সরবরাহ করতে পারবে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি।
ইবি প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল মালেক বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ইনডোর সাবস্টেশনের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ হবে বলে আশা করছি। সম্প্রতি পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা প্রকল্পটি পরিদর্শন করে ইতিবাচক মতামত দিয়েছেন।’
আরও পড়ুন: ইবিতে তীব্র বিদ্যুৎ সংকট, ব্যাহত একাডেমিক কার্যক্রম
তবে এই সাবস্টেশন চালু হলেই জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ ঘাটতিজনিত লোডশেডিং পুরোপুরি বন্ধ হবে না বলে জানান তিনি। তার ভাষ্য, দূরবর্তী লাইন থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহের কারণে সৃষ্ট কারিগরি ত্রুটি ও ঘনঘন বিভ্রাট কমবে। সাবস্টেশন চালু হলে বিশ্ববিদ্যালয় বিদ্যুৎ সরবরাহে শতভাগ অগ্রাধিকার পাবে। তবে জাতীয় গ্রিডে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ থাকাও জরুরি।
পল্লী বিদ্যুতের ডিজিএম খালিদ মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে ইনডোর সাবস্টেশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এর কাজ চলমান রয়েছে।
সোলার প্যানেল স্থাপনের উদ্যোগ
প্রতি বছর বিদ্যুৎ সংকটের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে সোলার প্যানেল স্থাপনের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রকৌশল দপ্তর জানিয়েছে, সরকারি একটি প্রকল্পের আওতায় ক্যাম্পাসে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল মালেক বলেন, ‘প্রতিবছর তৈরি হওয়া বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ হিসেবে সোলার প্যানেল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে শিক্ষক প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়ে উপাচার্যের সঙ্গে দ্রুত বৈঠক করা হবে। অনুমোদন পেলে প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করে চূড়ান্তভাবে জমা দেওয়া হবে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. একেএম মতিনুর রহমান বলেন, ইউজিসি ও সরকারের উদ্যোগে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সোলার প্যানেল স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ক্যাম্পাসে উপযুক্ত স্থানে সোলার প্যানেল স্থাপনের জন্য ইউজিসির প্রতিনিধিদলকে সরেজমিন পরিদর্শনের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এ জন্য প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সহায়তাও দেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, জাতীয় বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি ক্যাম্পাসে বিদ্যুতের অপচয় রোধেও পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অপ্রয়োজনীয় এসি, ফ্যান ও হলের হিটার ব্যবহার বন্ধে জরুরি নোটিশ জারি করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আশা, ইনডোর সাবস্টেশন চালু ও ভবিষ্যতে সোলার প্যানেল স্থাপন করা গেলে জাতীয় গ্রিডের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমবে এবং ক্যাম্পাসে বিদ্যুৎ সরবরাহ আরও স্থিতিশীল হবে।
—জা. অর্থনীতি/এলএটি