কিছু মানুষ সবসময় দেরি করে কেন, জানুন বৈজ্ঞানিক কারণ

অনলাইন ডেস্ক: কিছু মানুষ ঘুম থেকে উঠাসহ সব কাজেই দেরি করেন। অফিস থেকে শুরু করে ব্যক্তিজীবনেও লেট। এসব মানুষকে অনেকেই ব্যঙ্গ করে বলে থাকেন লেট লতিফ। কী কারণে তারা সব সময়ই দেরি করেন তা জানার চেষ্টা করেছে মনোবিজ্ঞানীরা। 

এমন ঘটনা যদি জীবনে প্রায়ই ঘটে, তাহলে নিজেকে খুব বেশি দোষ দেবেন না। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, সব সময় দেরি করার পেছনে কেবল অলসতা নয়, আমাদের মস্তিষ্কের কিছু স্বাভাবিক অভ্যাসও কাজ করে।

ধরুন, আপনি ভাবলেন—গোসল করতে ১০ মিনিট, নাশতা করতে ১০ মিনিট, কাপড় পরতে ৫ মিনিট আর বাসস্ট্যান্ডে যেতে ১০ মিনিট লাগবে। হিসাব করে দেখলেন, ৩৫ মিনিটেই সব হয়ে যাবে।

কিন্তু বাস্তবে কাপড় খুঁজে পেতে দেরি হলো, মোবাইলে একটি ফোন এলো, লিফটের জন্য অপেক্ষা করতে হলো, রাস্তায় একটু যানজটও ছিল। দেখতে দেখতেই আরও ২০ মিনিট কেটে গেল। এমন ভুল প্রায় সবাই করে। কারণ আমরা অনেক সময় কোনো কাজ শেষ করতে কত সময় লাগবে, তা ঠিকভাবে আন্দাজ করতে পারি না।

বিবিসি সায়েন্স ফোকাস ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মনোবিজ্ঞানে এমন মানুষদের বলা হয় ‘টাইম অপটিমিস্ট’। এরা সব সময় মনে করে, ‘এটা তো খুব অল্প সময়েই হয়ে যাবে!’ কিন্তু বাস্তবে কাজটি শেষ হতে অনেক বেশি সময় লাগে। ফলে দিনের শুরুতেই পুরো পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।

মজার বিষয় হলো, যে পথ দিয়ে প্রতিদিন যান, সেই পথের সময় নিয়েই সবচেয়ে বেশি ভুল হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া ও যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের এক গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ খুব পরিচিত রাস্তা বা জায়গায় যেতে কত সময় লাগে, তা প্রায়ই বাস্তবের চেয়ে কম মনে করে।

তাই অনেকেই ভাবেন, ‘এই তো, ১০ মিনিটেই পৌঁছে যাব।’ কিন্তু বাস্তবে সময় লাগে ১৫ বা ২০ মিনিট।

দেরি করার আরেকটি কারণ হলো কাজ ফেলে রাখা। অনেকেরই বের হওয়ার ঠিক আগে নতুন কাজ শুরুর অভ্যাস থাকে।

হয়তো ভাবলেন, এই মেসেজটার উত্তর দিয়েই বের হব, এক কাপ চা খেয়ে নিই কিংবা ফেসবুকটা আর একবার দেখি।

এই ছোট ছোট কাজই কয়েক মিনিট করে সময় নষ্ট করে। শেষে দেখা যায়, বের হওয়ার সময় অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে।

আগে পৌঁছাতে অনেকের ভালো লাগে না
বিবিসি সায়েন্স ফোকাসের প্রতিবেদনে বলা হয়, শুনে অবাক লাগতে পারে, কিন্তু অনেকেই ইচ্ছে করেই আগে বের হন না। কারণ আগে পৌঁছালে অপেক্ষা করতে হবে। অনেকের কাছে অপেক্ষা করা বিরক্তিকর।

তাই তারা এমনভাবে সময় হিসাব করেন, যেন ঠিক সময়েই পৌঁছানো যায়। কিন্তু জীবনে সবকিছু কি পরিকল্পনা অনুযায়ী চলে? সামান্য যানজট, বৃষ্টি বা অন্য কোনো ছোট সমস্যা পুরো হিসাবটাই বদলে দিতে পারে।

পরিবার থেকেও এই অভ্যাস আসতে পারে
গবেষকদের মতে, সময় মেনে চলার অভ্যাস অনেকটাই ছোটবেলা থেকে গড়ে ওঠে। যে পরিবারে সময় নিয়ে খুব বেশি কড়াকড়ি থাকে না, সেখানে বড় হওয়া শিশুরাও পরে একই অভ্যাস ধরে রাখতে পারে।

আবার বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতিতেও সময় সম্পর্কে ধারণা এক নয়। কোথাও পাঁচ মিনিট দেরি হওয়া স্বাভাবিক, আবার কোথাও এক মিনিট দেরি মেনে নেওয়া হয় না।

তাহলে সমাধান কী
বিশেষজ্ঞরা একটি সহজ পরামর্শ দেন। ঠিক সময়ে পৌঁছানোর চেষ্টা করবেন না, বরং একটু আগে পৌঁছানোর পরিকল্পনা করুন। কোনো জায়গায় যেতে কত সময় লাগবে, সেটি বাস্তবভাবে হিসাব করুন। তারপর সেই সময়ের সঙ্গে অন্তত ১৫ মিনিট অতিরিক্ত যোগ করুন। দূরের যাত্রা হলে আরও বেশি সময় হাতে রাখুন।

আর যদি আগে পৌঁছে অপেক্ষা করতে বিরক্ত লাগে, তাহলে সেই সময়টাকে কাজে লাগান। বই পড়তে পারেন, প্রয়োজনীয় মেসেজের উত্তর দিতে পারেন, কিংবা পরের কাজের পরিকল্পনা গুছিয়ে নিতে পারেন।

দেরি করার অভ্যাস বদলানো সম্ভব
সব সময় দেরি করা মানেই আপনি দায়িত্বজ্ঞানহীন, এমন নয়। অনেক সময় আমাদের মস্তিষ্কই সময়ের হিসাব ঠিকমতো করতে পারে না। আবার কখনো অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস বা কাজ ফেলে রাখার অভ্যাসও এর জন্য দায়ী।

তবে এগুলো বদলানো যায়।
আজ থেকে যদি আপনি শুধু একটি অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন। আর তা হলো প্রয়োজনের অন্তত ১৫ মিনিট আগে বের হওয়া। তাহলে হয়তো আর কখনো বাস, ট্রেন, ক্লাস, মিটিং কিংবা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কোনো সুযোগ মিস করতে হবে না।

—জা. অর্থনীতি/এএইচএ