২০২৪ সালের ৪ আগস্ট রোববার ঘোষণা হয় ‘পরশু নয়, আগামীকালই লং মার্চ টু ঢাকা!’—মাত্র সাতটি শব্দ। কিন্তু এই সাত শব্দের আহ্বানই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বড় মোড় তৈরি করেছিল। এর কারণ হচ্ছে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের পদত্যাগের ইঙ্গিত দিয়ে ৬ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঘোষণা দেন। কিন্ত ৪ আগস্ট শিক্ষার্থীদের আনন্দোলন রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। প্রাণ হারান শত-শত মানুষ। চলমান আন্দোলনকে ‘জঙ্গি হামলা’ বলে আখ্যায়িত করে তৎকালীন সরকার।
আর ঠিক এ কারনেই ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ৬ আগস্টের পরবর্তীতে তা একদিন এগিয়ে এনে ৫ আগস্টে কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
সেই সময় কী চিন্তা করে একদিন এগিয়ে নিয়ে আসা হয়েছিল? এমন প্রশ্নের জবাবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক, সাবেক উপদেষ্টা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া একটি গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘সময় যত গড়াচ্ছিল, বিভিন্ন সূত্র থেকে তথ্য আসছিল যে আওয়ামী লীগ ঢাকায় বড় ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। একই সঙ্গে ইন্টারনেট বন্ধ করে আরও কঠোর দমন-পীড়ন চালানোর আশঙ্কাও ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছিল। আমরা বুঝতে পারছিলাম, পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল ৬ আগস্ট ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি পালন করা। সেই জায়গা থেকে কর্মসূচিও ঘোষণা করি। কিন্তু ৪ আগস্ট সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে আমার মনে হয়, আর একদিন অপেক্ষা করলে আন্দোলনের গতি থেমে যেতে পারতো, এমনকি সরকার বড় ধরনের দমন-পীড়ন চালানোর সুযোগও পেয়ে যেত। সে সময় নাহিদ ভাইয়ের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছিল না। পরে রিফাত, কাদের, মাসুদ, মাহিন, বাকেরদের সঙ্গে আলোচনা করে আমি কর্মসূচিটি এক দিন এগিয়ে এনে ৫ আগস্ট করার ঘোষণা দিই।’
জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সংবাদমাধ্যমে পাঠানো একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠায়। সেখানে ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঘোষণা দেন।
এতে বলা হয়, ‘পরিস্থিতি পর্যালোচনায় এক জরুরি সিদ্ধান্তে আমাদের ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ৬ আগস্ট থেকে পরিবর্তন করে ৫ আগস্ট করা হলো। অর্থাৎ আগামীকালই সারা দেশের ছাত্র-জনতাকে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রার আহ্বান জানাচ্ছি।’
অর্ধশতাধিক ছাত্র-জনতাকে খুন করা হয়েছে উল্লেখ করে এতে বলা হয়, ‘আজ (রোববার) প্রায় অর্ধশতাধিক ছাত্র-জনতাকে খুন করেছে ‘খুনি হাসিনা’। চূড়ান্ত জবাব দেওয়ার সময় এসে গেছে। বিশেষ করে আশপাশের জেলাগুলো থেকে সবাই ঢাকায় আসবেন এবং যারা পারবেন আজই ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়ে যান। ঢাকায় এসে মুক্তিকামী ছাত্র-জনতা রাজপথগুলোতে অবস্থান নিন।’
চূড়ান্ত লড়াইয়ের কথা উল্লেখ করে এতে বলা হয়, ‘চূড়ান্ত লড়াই, এই ছাত্র নাগরিক অভ্যুত্থানের চূড়ান্ত স্বাক্ষর রাখার সময় এসে গেছে। ইতিহাসের অংশ হতে ঢাকায় আসুন সকলে। যে যেভাবে পারেন কালকের মধ্যে ঢাকায় চলে আসুন। ছাত্র-জনতা এক নতুন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটাব।’
এছাড়া তিনি ভিডিও বার্তায় বলেন, ‘ঢাকায় এসে মুক্তিকামী ছাত্র-জনতা রাজপথগুলোতে অবস্থান নিন। চারদিক থেকে আমরা গণভবনের দিকে রওনা হব। আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের ‘গুন্ডারা’ পুলিশের অস্ত্র নিয়ে ছাত্র-জনতার ওপর হামলা করেছে। কিন্তু ছাত্র-জনতার প্রতিরোধের মুখে তারা টিকে থাকতে পারেনি। রাজপথের পরাজিত শক্তি হিসেবে তারা বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আমাদের বিরুদ্ধে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। এ ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করতে হবে। আনন্দের বিষয় হচ্ছে দেশের বিভিন্ন স্থানে সেনাবাহিনী ছাত্র-জনতার পক্ষে দাঁড়িয়েছে। আবার মিরপুর ও মোহাম্মদপুরে সেনাবাহিনী ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালিয়েছে। সেনাবাহিনীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলতে চাই, আপনারা এ দেশের নাগরিক। জনগণের জানমালের নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছেন। আপনারা দেশ ও জনগণের জন্য কাজ করবেন। কোনো খুনি রাজনৈতিক দলের জন্য কাজ করবেন না। এটিই দেশের মানুষ আপনাদের কাছে প্রত্যাশা করে।’ অন্য সমন্বয়করাও একযোগে এ কর্মসূচির লিখিত ও ভিডিও বার্তা প্রচার করেন।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক সমন্বয়ক মাহিন সরকার বলেন, তিন তারিখের পরে শেখ হাসিনা পুরো, মানে সবখান থেকেই যত তাদের শক্তি, সেটা ঢাকায় কেন্দ্রীভূত করার চেষ্টা করছিল। এটা আমরা ভিজুয়াল করছি এবং মাঠে থেকে রিয়েলাইজ করছি। ওইদিনে আমাদের ফার্মিং ছিল, আমরা যদি তাদেরকে একদিন টাইম দিতাম, তাহলে ঢাকাটাকে ওরা আরও বেশি ওদের মতো করে সাজাইতে পারত। প্রতিরক্ষাও ওদের মতো করে সাজাইতে পারত। সেই জায়গা থেকে আমাদের একটা ইয়ে ছিল যে, আগেভাগেই যদি মানুষজন আসে, তাহলে এই হতাহত এবং সংঘর্ষের মেয়াদ আরও সংক্ষিপ্ত হবে। শেখ হাসিনার পতন আরও দ্রুত হবে। আর এটা দেরি করলে হতাহত বাড়বে এবং শেখ হাসিনার পতনের সম্ভাবনা একটু কমে যায়। সেই জায়গা থেকে আমরা আসলে ৫ আগস্ট দেওয়া।

তিনি আরও বলেন, যারা ফিল্ডে ছিল, সব রাজনৈতিক সংগঠন এই ব্যাপারে একমত ছিল। তারা বিভিন্নভাবে এটাকে পরামর্শ দিয়েছে। আমরা যারা সমন্বয়ক ছিলাম, তারা পরামর্শ দিয়েছি, আর সাধারণ জনগণও আমাদেরকে এক ধরনের প্রেসার দিয়েছে। আমরা যখন অনলাইনে এগুলো নিয়ে অ্যাক্টিভিটি চালাইতাম, তখন মানুষ বলতো যে লং মার্চ আগে হওয়া উচিত। আর তার চেয়েও বড় ব্যাপার ছিল, ওই সময়ে আবার ইন্টারনেট অফ করার একটা সম্ভাবনা ছিল। ইন্টারনেট যদি অফ হয়, সেক্ষেত্রে তো আমরা আমাদের ডিরেকশন মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারব না। তাই ইন্টারনেট অফ হওয়ার আগেই মানুষকে ঢাকামুখী করা দরকার ছিল। আল্টিমেটলি ঢাকাতেই শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার বাহিনী টিকে ছিল। তাছাড়া সারাদেশেই ৪ আগস্টের মধ্যেই তাদের সব জায়গায় পতন হইছে। তো সেই জায়গা থেকে ঢাকার বাইরে আন্দোলনে মানুষের ওইভাবে আর কোনো অর্থবহ ভূমিকা ছিল না। সেই জায়গা থেকে আমাদের ৪ আগস্ট ঘোষণা দেওয়া, যে ৬ আগস্টের কর্মসূচি ৫ আগস্টে আনা হচ্ছে।
সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে মাহিন সরকার বলেন, আসিফ মাহমুদ তার বইয়েও উল্লেখ করেছেন। এ বিষয়ে প্রধান সমন্বয়ক নাহিদ ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু ডিবি হেফাজত থেকে বের হওয়ার পর নম্বর পরিবর্তন করায় তার সঙ্গে যোগাযোগ সম্ভব হচ্ছিল না। পরে অন্য সমন্বয়কদের সঙ্গে আলোচনা করে সবাই একমত হন যে, কর্মসূচি এগিয়ে আনার এটাই উপযুক্ত সময়। মাঠে থাকা ছাত্র সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেও একই ধরনের মতামত আসে। তাই দেরি না করে বিকেলের দিকে পাঁচ আগস্টের কর্মসূচি ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
—জা.অর্থনীতি/এএইচএ
