নিজস্ব প্রতিবেদক: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান কোনো একক ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা দলের নয়। এই অভ্যুত্থানের মহানায়ক দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণ। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল স্বাধীনতা অর্জনের, আর ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান ছিল দেশ এবং জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার।
বুধবার (৫ আগস্ট) সকালে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকের দিনটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে আরেকটি যুগান্তকারী মাইলফলক। দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে হাজার হাজার মানুষ গুম ও অপহরণের শিকার হয়েছেন। লাখ লাখ মানুষ নির্যাতন-নিপীড়ন, হামলা কিংবা মিথ্যা মামলায় বছরের পর বছর ঘরছাড়া ছিলেন।
আরও পড়ুন: জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস আজ
তিনি বলেন, শুধু জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানেই হাজারো ছাত্র-জনতা, নারী ও শিশু শহীদ হন এবং অন্তত ৩০ হাজার মানুষ আহত হন। তিনি ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের সব শহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা এবং হতাহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণ যেমন মুক্তিযোদ্ধাদের ভুলে যায়নি, একইভাবে ২০২৪ সালে দেশ এবং জনগণের স্বাধীনতা রক্ষায় শহীদদেরও জনগণ ভুলবে না।
তার ভাষ্য, ফ্যাসিবাদী শাসনামলে গুম, খুন ও অপহরণকে স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত করা হয়েছিল। দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে চলা এই নৃশংসতার তুলনা কেবল স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ৩ বছরের দুঃশাসনের সঙ্গে চলে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঐতিহাসিক এই ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে তাদের পূর্বসূরিদের সাহসী ইতিহাস যেমন তুলে ধরবে, তেমনি বিতাড়িত ফ্যাসিস্টদের মুখোশও উন্মোচন করবে। এই জাদুঘর জনগণের সংগ্রাম, আত্মত্যাগ, বেদনা, সাহস ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে জাতীয় স্মৃতিতে স্থায়ীভাবে ধারণ করার একটি ঐতিহাসিক উদ্যোগ। এটি শুধু ২০২৪ সালের নৃশংস ঘটনার স্মারক নয়, বাংলাদেশের মানুষের সামগ্রিক গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার সঙ্গে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সম্পর্কও তুলে ধরবে। একই সঙ্গে শুধু জুলাই গণঅভ্যুত্থান নয়, বাংলাদেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাসও এখানে সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি।
আরও পড়ুন: ‘জুলাই কোনো শ্রেণি বা গোষ্ঠীর নয়, এটি সর্বস্তরের মানুষের’
জাদুঘরে জুলাই-আগস্টের রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের পরিচয় ও জীবনকথা, আহতদের সাক্ষ্য, অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী ছাত্র-জনতার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, সংবাদ প্রতিবেদন, পোস্টার, দেয়াললিখন, গ্রাফিতি, কার্টুন, কবিতা, গান, নাটক, চিত্রকর্ম, ব্যক্তিগত স্মারক ও ডিজিটাল উপাদান সংরক্ষণের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী। যারা ব্যক্তিগত স্মারক, দলিল, আলোকচিত্র ও শিল্পকর্ম জাদুঘরের জন্য দিয়েছেন, তাদের ধন্যবাদ জানান তিনি।
ইতিহাস সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সত্যতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অসম্পূর্ণ, অতিরঞ্জিত বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বয়ান ইতিহাসকে শক্তিশালী করে না; বরং ইতিহাসের বিশ্বাসযোগ্যতা দুর্বল করে এবং ভবিষ্যতে বিভেদের কারণ হয়। তাই প্রতিটি বিষয়ে যথাসম্ভব সত্যতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে জাদুঘরের উপস্থাপনা বাংলার পাশাপাশি ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষায়ও রাখার আহ্বান জানান তিনি, যেন বিশ্বের বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাস জানতে পারেন।
আরও পড়ুন: আবু সাঈদ বীরত্বে সবকিছু পাল্টে যায়
প্রধানমন্ত্রী জানান, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের শহীদদের নামে তাদের নিজ নিজ এলাকায় সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কিংবা সড়কের নামকরণ করা হবে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত জুলাইযোদ্ধাদের সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গুরুতর আহতদের থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, তুরস্ক, রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বর্তমানে ৫০ জন জুলাইযোদ্ধা বিদেশে চিকিৎসাধীন। গেজেটভুক্ত জুলাইযোদ্ধাদের মধ্যে ১৩ হাজারের বেশি ব্যক্তিকে তাদের নিজস্ব ব্যাংক হিসাবে শ্রেণিভিত্তিক মাসিক সম্মানী ভাতা দেওয়া হচ্ছে।
গণভোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গণভোটের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে গঠিত ‘সংবিধান সংশোধন–সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি’ কাজ শুরু করেছে। দেশ পুনর্গঠনের মাধ্যমে একটি স্বনির্ভর, সমৃদ্ধ, নিরাপদ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শহীদদের কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
আরও পড়ুন: ৩৬ জুলাই উদ্যাপনে কনসার্ট ‘বর্ষা বিপ্লবের গান’
এ সময় ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থপতি, ইতিহাসবিদ, গবেষক, জাদুঘর বিশেষজ্ঞ, শিল্পী, সংগ্রাহক, কারিগর, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সহযোগীদের ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে জনগণের পাশে দাঁড়ানোর জন্য দেশের সেনাবাহিনীকে অভিনন্দন জানান তিনি।
অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী জাদুঘরের বিভিন্ন গ্যালারি ও প্রদর্শনী ঘুরে দেখেন। এ সময় তিনি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি, শহীদদের আত্মত্যাগ, গণআন্দোলনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এবং স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার নির্যাতনের সংরক্ষিত আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, বিভিন্ন নিদর্শন ও তথ্য পরিদর্শন করেন। পরে তিনি ‘জুলাই ৩৬’ শীর্ষক আলোচনা সভায় অংশ নেন।
—জা.অর্থনীতি/এনজে