ইতিহাস লিখে ক্যাসিয়াসের অনন্য যাত্রা
ফাইল ছবি

ইকার ক্যাসিয়াসের গল্প শুরুটা কোনো ফুটবল-স্বপ্নের ক্লাসিক স্ক্রিপ্টের মতো ছিল না। বাবা সরকারি চাকরিজীবী, মা বিউটি পার্লারের কর্মী-স্পেনের মোডোলেস শহরের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া এই ছেলেকে নিয়ে পরিবারটির স্বপ্ন ছিল খুবই বাস্তববাদী— নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য একটি সরকারি চাকরি। নব্বইয়ের দশকের সেই স্পেনে এমন ভাবনাই ছিল সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পরিকল্পনা। কিন্তু এই ছকবাঁধা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ধীরে ধীরে ভেঙে দেন ক্যাসিয়াস নিজেই-ইচ্ছা বা উচ্চাকাঙ্ক্ষার জোরে নয়, বরং ফুটবলের এক অদ্ভুত নিয়তির টানে!

শৈশবের ক্যাসিয়াস ফুটবলে খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না— এটা তার গল্পের সবচেয়ে অদ্ভুত দিকগুলোর একটি। এতটাই অনাগ্রহী ছিলেন যে তার বাবা একবার ১৪টি প্রশ্নের সঠিক ভবিষ্যদ্বাণী করে ১ মিলিয়ন পাউন্ড জেতার সুযোগ পেয়েও ছেলের ভুলোমন আচরণের কারণে সেই কুপন পোস্ট করতে পারেননি। সেই ভুলোমনা শিশুটিই পরে হয়ে উঠবেন বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা গোলরক্ষক-এটা তখন কেউ কল্পনাও করেনি!

তবে নিয়তির দরজা খুলে দেয় রিয়াল মাদ্রিদ। মাত্র ৮ বছর বয়সে ক্লাবটির স্কাউটদের নজরে আসেন ক্যাসিয়াস। সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর ক্লাবের যুব একাডেমিতে শুরু হয় তার পথচলা, যা পরিণত হয় এক কিংবদন্তি অধ্যায়ে। ভিসেন্তে দেল বস্কের ছায়ায় বেড়ে ওঠা এই গোলরক্ষক ১৯৯০-৯১ মৌসুমে জুনিয়র দলে খেলা শুরু করেন এবং ধীরে ধীরে রিয়াল মাদ্রিদের ভবিষ্যৎ ভরসা হয়ে ওঠেন।

১৯৯৭ সালের ২৭ নভেম্বর তার ক্যারিয়ারের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘুরে যায়-উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে রিয়াল মাদ্রিদের সিনিয়র দলে ডাক পান তিনি, যদিও সেদিন খেলার সুযোগ হয়নি। তবু সেই দিনই তিনি বুঝে যান, বড় মঞ্চ তার জন্য অপেক্ষা করছে। ১৯৯৮-৯৯ মৌসুমে অভিষেকের মাধ্যমে শুরু হয় তার পেশাদার যাত্রা। তখনও তিনি ড্রাইভিং লাইসেন্সের বয়সে পৌঁছাননি, তাই মাদ্রিদে যাতায়াত করতেন পাবলিক বাসে চড়ে— এমন বাস্তবতা থেকেই জন্ম নেয় ভবিষ্যতের এক বিশ্বসেরা গোলরক্ষকের।

মাত্র ১৯ বছর বয়সে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে খেলে ইতিহাস গড়েন ক্যাসিয়াস, টুর্নামেন্টের ইতিহাসে অন্যতম কনিষ্ঠ গোলরক্ষক হিসেবে। এরপর রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে জেতেন চারটি লা লিগা এবং দুটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা (১৯৯৯–২০০০, ২০০১–০২)!

জাতীয় দলের ক্ষেত্রেও তার পথচলা ধীরে ধীরে পরিণত হয় ইতিহাসে। ১৯৯৭ সালে অনূর্ধ্ব-১৭ দলে শুরু করে তিনি পরবর্তী সময়ে অনূর্ধ্ব-১৭ দলের অধিনায়ক হন এবং ১৯৯৯ সালে যুব বিশ্বকাপ জেতেন। সিনিয়র দলে অভিষেক হয় ২০০০ সালে। ২০০২ বিশ্বকাপে মূল গোলরক্ষক ইনজুরিতে পড়লে সুযোগ পান ক্যাসিয়াস এবং সেই সুযোগ তিনি হারাননি।

২০০৮ ইউরোতে স্পেনের শিরোপা জয়ের পথে তিনি গোল্ডেন গ্লাভস জেতেন, এরপর ২০১০ বিশ্বকাপে অধিনায়ক হিসেবে নেদারল্যান্ডসকে ১-০ গোলে হারিয়ে স্পেনকে ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ জেতান। সেই ম্যাচে তার রক্ষণভাগের নেতৃত্বই স্পেনকে এনে দেয় সর্বোচ্চ সাফল্য।
ক্যাসিয়াসের ব্যক্তিগত অর্জনও কম নয়। ২০০০ সালে ব্র্যান্ড অ্যাওয়ার্ড দিয়ে শুরু করে তিনি একাধিকবার উয়েফা টিম অব দ্য ইয়ারে (২০০৭, ২০০৮, ২০০৯, ২০১০) জায়গা পান, তিনবার উয়েফার বর্ষসেরা গোলরক্ষক হন এবং ফিফার অল-স্টার দলেও নির্বাচিত হন। স্পেনের হয়ে তিনি খেলেন ১২১টি ম্যাচ।

তার ক্যারিয়ারজুড়ে আরেকটি আলোচিত দিক ছিল কুসংস্কার। প্রতিবার রিয়াল মাদ্রিদ বা স্পেন গোল করলে তিনি ক্রসবার স্পর্শ করতেন-এই অভ্যাস কখনও ভাঙেননি। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও তিনি আলোচনায় আসেন, বিশেষ করে ক্রীড়া সাংবাদিক সারা কার্বোনেরোর সঙ্গে সম্পর্কের কারণে, যদিও সমালোচনা তার পারফরম্যান্সকে প্রভাবিত করতে পারেনি।

একজন ভুলোমনা কিশোর থেকে শুরু করে বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক-ইকার ক্যাসিয়াসের গল্প আসলে ভাগ্য, অধ্যবসায় আর এক অদ্ভুত কুসংস্কারের মিশ্রণে গড়া এক ফুটবল কিংবদন্তির ইতিহাস।

একনজরে
পুরো নাম : ইকার ক্যাসিয়াস ফার্নান্দেজ 
জন্ম: ২০ মে, ১৯৮১ 
জন্মস্থান : মোস্তোলেস, মাদ্রিদ
দেশ : স্পেন
উচ্চতা : ৫ ফুট সাড়ে ১১ ইঞ্চি
পজিশন : গোলকিপার 
ক্লাব : রিয়াল মাদ্রিদ জার্সি নম্বর : ১
বিশ্বকাপ জয় : ২০১০
ইউরো জয় : ২০০৮ 
চ্যাম্পিয়ন্স লিগ : ২টি