বিশ্বকাপের উন্মাদনায় ফ্যাশনের নতুন ভাষা

তারিক রহমান খান: বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই শুধু মাঠের লড়াই নয়, এটি কোটি মানুষের আবেগ, উচ্ছ্বাস ও পরিচয়েরও এক বিশাল উৎসব। প্রিয় দলের জয়-পরাজয়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় মানুষের পোশাক, সাজসজ্জা ও জীবনযাপনের ধরন। এবারের বিশ্বকাপের আবহেও তার ব্যতিক্রম নয়। ফুটবলের উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়েছে ফ্যাশন, প্যাশন ও স্টাইলের প্রতিটি অনুষঙ্গে। জার্সির গণ্ডি পেরিয়ে এখন টি-শার্ট, শাড়ি, লুঙ্গি, স্নিকার্স, এমনকি মেকআপেও জায়গা করে নিয়েছে বিশ্বকাপের রং।
বাংলাদেশে ফুটবল বিশ্বকাপ এলেই দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায় সমর্থকদের বড় একটি অংশ। আর্জেন্টিনা কিংবা ব্রাজিল— প্রিয় দলের পতাকার রঙে রাঙিয়ে তোলেন তারা নিজেদের চারপাশ। সেই আবেগকে পুঁজি করে ফ্যাশন হাউস ও পোশাক ব্যবসায়ীরাও নিয়ে আসছেন নানা ধরনের নতুন ডিজাইন। বাজারে এখন পাওয়া যাচ্ছে দলভিত্তিক জার্সির পাশাপাশি থিমভিত্তিক টি-শার্ট, ক্যাজুয়াল শার্ট এবং ফিউশন পোশাক।
তরুণদের কাছে জার্সি এখনও সবচেয়ে জনপ্রিয় পোশাক। তবে এবার দেখা যাচ্ছে নতুন প্রবণতা। শুধুমাত্র খেলা দেখার সময় নয়, দৈনন্দিন জীবনেও বিশ্বকাপ-থিমের পোশাক ব্যবহার করছেন অনেকে। আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা কিংবা ব্রাজিলের হলুদ-সবুজ রঙের টি-শার্ট এখন ক্যাম্পাস, আড্ডা কিংবা ঘোরাঘুরির অন্যতম অনুষঙ্গ। অনেকেই আবার প্রিয় খেলোয়াড়ের নাম ও নম্বর সংবলিত পোশাক পরে নিজেদের সমর্থনের প্রকাশ ঘটাচ্ছেন।
বিশ্বকাপের এই ফ্যাশন-ঢেউয়ে পিছিয়ে নেই নারীরাও। শাড়িতে ফুটে উঠছে বিভিন্ন দেশের পতাকা, দলের রং এবং ফুটবলের নকশা। বিশেষ করে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল সমর্থকদের জন্য তৈরি করা হচ্ছে থিমভিত্তিক শাড়ি, ওড়না ও কুর্তি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব পোশাক পরে ছবি তোলা এবং শেয়ার করার প্রবণতাও বেড়েছে। ফলে বিশ্বকাপ এখন শুধু খেলার আসর নয়, নিজেকে নতুনভাবে উপস্থাপনেরও একটি উপলক্ষ হয়ে উঠেছে।
গ্রামীণ সংস্কৃতির পরিচিত পোশাক লুঙ্গিতেও লেগেছে বিশ্বকাপের রং। বাজারে পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন দলের পতাকার আদলে তৈরি লুঙ্গি। শহর থেকে গ্রাম— সব জায়গাতেই এর চাহিদা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অনেকে মজার ছলে, আবার অনেকে আন্তরিক সমর্থনের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে এসব লুঙ্গি ব্যবহার করছেন। এতে ফুটবলের উৎসব আরও বেশি জনমুখী হয়ে উঠছে।
শুধু পোশাকেই নয়, বিশ্বকাপের ছোঁয়া লেগেছে ফ্যাশন অনুষঙ্গেও। স্নিকার্স, ক্যাপ, রিস্টব্যান্ড, ব্যাগ কিংবা সানগ্লাসেও দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন দলের রং ও প্রতীক। তরুণদের মধ্যে কাস্টমাইজড স্নিকার্সের জনপ্রিয়তা বেড়েছে, যেখানে প্রিয় দলের পতাকা বা খেলোয়াড়ের ছবি আঁকা হচ্ছে। অনেকেই নিজের স্টাইলের সঙ্গে ফুটবলপ্রেমকে মিলিয়ে নিচ্ছেন নতুনভাবে।
এবারের বিশ্বকাপে মেকআপ ট্রেন্ডেও এসেছে বৈচিত্র্য। খেলা দেখতে যাওয়ার আগে কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় যোগ দিতে অনেক তরুণী মুখে আঁকছেন প্রিয় দলের পতাকা। চোখের সাজ, নেইল আর্ট কিংবা হেয়ার অ্যাকসেসরিজেও ব্যবহার করা হচ্ছে দলের রং। ফলে ফুটবলপ্রেম এখন হয়ে উঠেছে ব্যক্তিগত স্টাইল প্রকাশেরও একটি মাধ্যম।
ফ্যাশন বিশ্লেষকদের মতে, বড় কোনো আন্তর্জাতিক আয়োজন মানুষের জীবনধারায় প্রভাব ফেলে। বিশ্বকাপ ফুটবল তার অন্যতম উদাহরণ। খেলার আবেগ যখন মানুষের হৃদয়ে গভীরভাবে স্থান করে নেয়, তখন তা পোশাক-পরিচ্ছদ, আচরণ ও সংস্কৃতিতেও প্রতিফলিত হয়। এ কারণেই বিশ্বকাপকে ঘিরে তৈরি হয় বিশেষ ফ্যাশন ট্রেন্ড, যা কিছু সময়ের জন্য হলেও মানুষের জীবনযাপনের অংশ হয়ে ওঠে।
সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ ফুটবল এখন আর শুধু ৯০ মিনিটের খেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এক বিস্তৃত সাংস্কৃতিক উৎসব, যার রঙ ছড়িয়ে পড়ে জীবনযাপনের নানা স্তরে। জার্সি থেকে শাড়ি, লুঙ্গি থেকে স্নিকার্স, মেকআপ থেকে দৈনন্দিন স্টাইল— সর্বত্রই ফুটে উঠছে ফুটবলের আবেগ। বিশ্বকাপের এই রঙিন উৎসবে ফ্যাশন যেন হয়ে উঠেছে সমর্থনের নতুন ভাষা, আর স্টাইল হয়ে উঠেছে ভালোবাসার প্রকাশ।