নিতাই রায় চৌধুরী
আমাদের এই দেশে রয়েছে হাজার বছরের পুরোনো সভ্যতার ইতিহাস। চন্দ্র-গুপ্ত-মৌর্য বা তারও আগের প্রাচীন সভ্যতার চিহ্ন এ দেশের মাটিতে রয়েছে। হিউয়েন সাং চীন দেশের সব জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষা করার পর যখন আরও অধিক জ্ঞান অন্বেষণের খোঁজ করছিলেন তখন তাকে উপদেশ দেওয়া হয়েছিল বাংলায় যাওয়ার জন্য। ৬৩৮ খ্রিষ্টাব্দে তিনি বাংলায় এসেছিলেন।
ইবনে বতুতা তার ভ্রমণ বৃত্তান্তে লিখেছিলেন, এ দেশে প্রবেশের হাজারটি দরজা আছে কিন্তু বেরোনোর কোনো পথ নেই। ৫৫ জন ফটকাবাজ ইংরেজ ফান্ড কালেক্ট করে একটা কোম্পানি তৈরি করল, নাম দিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। কোথায় গিয়ে ব্যবসা করা যায়? তাদের বলা হলো, বাংলায় যাও। তারা বাংলায় আসল। অর্থাৎ এই দেশের এত সৌন্দর্য, এত প্রাচুর্য, এত সমৃদ্ধি যে এখানে আসলে কেউ বেরোতে চাইত না। এখানে ওলন্দাজরা এসেছে, চাইনিজরা এসেছে, ফরাসিরা এসেছে, আফগান কাবুলিওয়ালারা এসেছে। কিন্তু বাংলার মানুষ কোথাও যায়নি। অতীত থেকেই দেশটাকে বলা হতো সোনার বাংলা। একটা দেশের সংস্কৃতি, মানে একটা জাতির আত্মা। জাতির সব চিত্রই তুলে ধরা যায় তার সংস্কৃতির মাধ্যমে। ধ্যান ধারণা, মূল্যবোধ, আচরণ, ধর্মীয় মূল্যবোধ, শিক্ষাব্যবস্থা, আইন ব্যবস্থা সবকিছু নির্ধারণ করে অর্থনীতি। অর্থনীতি যদি লুটের অর্থনীতি হয়, ব্যবসায়ীরা যদি দেখে যে পাচার করে লাভবান হওয়া যায়, সে তাই করবে।
সে নারী পাচার করবে, শিশু পাচার করবে, চালে কাঁকর মিশাবে, সিমেন্টে বালু মিশাবে, মাদক ব্যবসা করবে। একটা অন্ধকার যুগ পার হয়ে আমরা এসেছি। এখনও সে অন্ধকার কাটেনি। আমি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি সেই ভাষাশহিদদের যারা প্রথম স্বাধীনতার স্বপ্নের বীজ বপন করেছিলেন একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। তারপরে ঊনসত্তরের গণ-আন্দোলন, গণ-অভ্যুত্থান, আমরাই তার সঙ্গে ছিলাম। তারপরে একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধ। গত জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যারা দেশের পরিবর্তন এনেছেন তাদের প্রতিও আমি কৃতজ্ঞ। একটা গণতান্ত্রিক সমাজে আমাদের সব বৈচিত্র্যের মাঝে আমরা ঐক্য আনতে চাই। তার জন্য অর্থনীতির ভিতকে মজবুত করতে হবে। জাতীয় পুঁজির বিকাশ ঘটাতে হবে। লুটেরা পুঁজি, আধিপত্যবাদী শক্তি, সাম্রাজ্যবাদী শক্তির যে পুঁজি, তার পরিবর্তে আমরা একটি জাতীয় পুঁজি গঠন করে জাতীয় সংস্কৃতি শিক্ষাকে সমৃদ্ধ করে আমাদের জাত্যাভিমান নিয়ে আমরা মাথা তুলে দাঁড়াতে চাই। যেমন- অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দেশ আজকে পৃথিবীতে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। আমরা চাই, বাংলাদেশই হবে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচাইতে উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশ। আবার মানুষ তার ভাগ্য অনুসন্ধানে বাংলায় আসবে। আমরা জ্ঞানভিত্তিক সমাজ চাই। বহুমাত্রিক সমাজের মাঝে একমাত্র জ্ঞানই পারে একটা সমাজকে শাসন করতে। আমরা বহুমাত্রিক এই দেশটাকে একটি বৈচিত্র্যময় ঐক্য নিয়ে আমাদের দেশটাকে সমৃদ্ধ করতে চাই। সেখানে সংস্কৃতি মানুষের আত্মার কথা বলবে। সংস্কৃতিই হবে আমাদের দর্পণ।
মন্ত্রী, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়