Print Date & Time : 08 November 2026 Sunday 07:28 pm

উৎপাদন অর্ধেকে, দামও তলানি: ৬৫ পুঞ্জিতে হাহাকার

image

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি: লাউয়াছড়া খাসিয়াপুঞ্জি। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দলবদ্ধভাবে বসে নিপুণ হাতে পান সাজাচ্ছেন নারীরা। এক একটা পান সাজিয়ে তৈরি হচ্ছে ‘গুছি’। এই গুছিই যাবে শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ হয়ে ঢাকায়, ঢাকা থেকে লন্ডন, মধ্যপ্রাচ্যে।

এই বছর সেই হাতের কাজে আর আগের মতো হাসি নেই। গুছি তৈরি হচ্ছে ঠিকই। কিন্তু পান ছোট, রং মলিন, দাম কম। যে পান একসময় সংসার চালাত, সেই পান এখন সংসারে টান এনে দিয়েছে।

খাসিয়াপুঞ্জি

মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ, কুলাউড়া, জুড়ী, বড়লেখা ও রাজনগর উপজেলার পাহাড়ি অঞ্চলে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৬৫টি খাসিয়াপুঞ্জি রয়েছে।

এসব পুঞ্জিতে খাসিয়ারা বসবাস করেন শত শত বছর ধরে। তাদের জীবিকা নির্বাহের প্রধান মাধ্যম একটাই — পান চাষ।

এটা সাধারণ চাষ নয়। এটা তাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও পরিচয়। টিলার ছায়াঘেরা বনে পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে প্রাকৃতিকভাবে তারা পান চাষ করেন। কোনো বড় কারখানা নেই, কোনো কৃত্রিমতা নেই। সুপারি গাছকে অবলম্বন করে লতিয়ে ওঠে পান গাছ।

পুঞ্জির পুরুষরা ভোরে জুম বা বরজে যান। গাছের পরিচর্যা করেন, পরিপক্ব পানপাতা সংগ্রহ করেন। আর নারীরা দলবদ্ধভাবে বসে অত্যন্ত নিপুণ হাতে পান সাজিয়ে বাজারজাতকরণের উপযোগী ‘গুছি’ তৈরি করেন। একটা পরিবারের সকাল শুরু হয় পান দিয়ে, শেষও হয় পান দিয়ে।

যে কারণে উৎপাদন অর্ধেকে

বর্ষাকাল পানের ভরা মৌসুম। এ সময় পানের ফলন সবচেয়ে বেশি হয়। কিন্তু চলতি বছর চিত্রটা সম্পূর্ণ উল্টো। গত সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায় পানের উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।

আগে যেখানে দেড় মাস পরপর গাছ থেকে পরিপক্ব পান সংগ্রহ করা যেত, সেখানে এখন দুই থেকে আড়াই মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। গাছে পান আসছে দেরিতে, আসলেও সংখ্যায় কম।

শুধু উৎপাদন কমে যাওয়াই নয়, বিরূপ আবহাওয়ার কারণে পানের পাতার আকারও ছোট হয়ে গেছে। বাজারে ছোট পানের কদর ও দাম — দুটোই কম। ফলে কাঙ্ক্ষিত মুনাফা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন চাষিরা।

অন্যদিকে শ্রমিকের মজুরি, সার, কীটনাশকসহ সব উপকরণের দাম বহুগুণ বেড়ে গেছে। আয় কমেছে, খরচ বেড়েছে — দুই দিকের চাপে পিষ্ট খাসিয়া চাষিরা।

মৌসুমভেদে প্রতি কুড়ি পান ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। সাধারণত পানের ভরা মৌসুমে প্রতি সপ্তাহে ১০-১২ হাজার টাকার বিক্রি হয় একটা পরিবারের। কিন্তু এ বছর বৃষ্টি কম হওয়ায় প্রতি সপ্তাহে ৫-৬ হাজার টাকার পান বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ আয় প্রায় অর্ধেক কমে গেছে।

অথচ বাজারে চাল, ডাল, তেল, সন্তানের পড়াশোনার খরচ — সবই বেড়েছে। এতে পানচাষিদের লোকসান হচ্ছে। সংসার আর পান চাষের খরচ মেটাতে গিয়ে তাদের কাঁধে বাড়ছে ঋণের বোঝা।

ঢাকার পান ব্যবসায়ীরা আগে বড় বড় পান সংগ্রহ করে বিদেশে রপ্তানি করতেন। খাসিয়া পান বিদেশে গিয়ে দেশের সুনাম বাড়াত। কিন্তু এ বছর পানের আকার ছোট থাকায় এবং রং কিছুটা মলিন থাকায় রপ্তানি হচ্ছে কম। রপ্তানি কমে যাওয়ায় দেশের বাজারেও দাম পড়ে গেছে।

শ্রীমঙ্গলের নাহার পুঞ্জির বাসিন্দা ডিবারমিন পতাম বলেন, চলতি বছর মৌসুমের শুরুতে কিছুটা আশা জাগলেও গত জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত দীর্ঘ সময় অত্যন্ত কম দামে পান বিক্রি করতে হয়েছে। এখন শীতের আগমনে পানের মৌসুম শেষ পর্যায়ে চলে এসেছে। অনেক জুমে পান প্রায় শূন্যের কোঠায়।

তিনি বলেন, ফলে পুঞ্জির পরিবারগুলো চরম আর্থিক সংকটে পড়ছে। নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে পানের উপযুক্ত দাম না পাওয়ায় চাষিরা আজ দিশেহারা। অনেকে মহাজন বা বিভিন্ন মাধ্যম থেকে ঋণ নিয়ে সংসার চালাচ্ছেন।

এই ঋণ শুধু সংসার চালানোর জন্য নয়। পরের মৌসুমে আবার জুমে কাজ করার জন্য, গাছের পরিচর্যার জন্য, শ্রমিকের মজুরি দেওয়ার জন্যও ঋণ নিতে হচ্ছে। ঋণের চক্র থেকে বের হওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।

লাউয়াছড়া খাসিয়াপুঞ্জির হেডম্যান (সমাজপ্রধান) ফিলা পতমী বলেন, পানের নানা রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ মোকাবিলা করে এ বছর যেটুকু উৎপাদিত হয়েছে, তারও ন্যায্যমূল্য মেলেনি। চারদিকে সবকিছুর দাম বাড়ছে, অথচ আমাদের আয়ের একমাত্র উৎস এই পানের দাম দিন দিন কমছে।

তিনি বলেন, সরকারি আর্থিক সহায়তা এবং পৃষ্ঠপোষকতা থাকলে আজ আমাদের এই দুর্দিন দেখতে হতো না।

কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর ইউনিয়নের হীরামতিছড়া খাসিয়াপুঞ্জির হেডম্যান বিওয়ানলী সুঙ বলেন, আগের মতো পাইকারেরা দাম দিয়ে পান কেনেন না। পরিবার-পরিজন নিয়ে তীব্র আর্থিক অনটনে পড়তে হচ্ছে। তবু শত বছরের বাপ-দাদার ঐতিহ্য ও জীবিকার টানে আমরা পান চাষ ধরে রেখেছি।

এই কথাটাই খাসিয়াদের আসল শক্তি। শত বছরের ঐতিহ্য। লাভ না হলেও তারা পান ছাড়ছেন না। কারণ পান ছাড়া তাদের পরিচয় নেই।

খাসিয়াদের সংগঠন খাসি সোশ্যাল কাউন্সিলের প্রচার সম্পাদক সাজু মারছিয়াং বলেন, খাসিয়াদের অর্থনীতি সম্পূর্ণই পানকেন্দ্রিক। জুমে পান কমে যাওয়ায় এবং ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় তরুণ প্রজন্মসহ সবাই হতাশ। খাসিয়া পান বিদেশে রপ্তানি হয়ে দেশের সুনাম বাড়ালেও উৎপাদকেরা আজও অবহেলিত। সরকারের পক্ষ থেকে সহজ শর্তে ঋণ ও সঠিক বিপণন ব্যবস্থা না করলে এই ঐতিহ্য রক্ষা করা কঠিন হবে।

তরুণদের মধ্যে এখন প্রশ্ন উঠছে— বাপ-দাদার এই পেশায় থাকব, নাকি শহরে গিয়ে অন্য কাজ করব? অনেক তরুণ ইতোমধ্যে পুঞ্জি ছেড়ে শ্রীমঙ্গল শহরে, সিলেটে, ঢাকায় গিয়ে কাজ করছেন। এতে পুঞ্জিতে শ্রমিক সংকটও তৈরি হচ্ছে।

ঐতিহ্যবাহী এই পেশা থেকে তরুণরা মুখ ফিরিয়ে নিলে শুধু খাসিয়ারাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাংলাদেশের পান শিল্প, ক্ষতিগ্রস্ত হবে পরিবেশবান্ধব এই চাষ পদ্ধতি।

শুধু বৃষ্টির অভাব নয়, পানের রোগবালাই আর পোকামাকড়ের আক্রমণও এবার বেশি।চাষিরা বলছেন, গাছে বিভিন্ন ধরনের ছত্রাক, পাতা পচা রোগ দেখা দিয়েছে। পোকামাকড়ের আক্রমণে অনেক গাছ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এর জন্য কীটনাশক, ছত্রাকনাশক কিনতে হচ্ছে চড়া দামে। কিন্তু তাতেও পুরোপুরি কাজ হচ্ছে না।

কৃষি বিভাগ থেকে মাঝে মাঝে পরামর্শ দেওয়া হলেও পুঞ্জিগুলো দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় হওয়ায় নিয়মিত সেবা পৌঁছায় না বলে অভিযোগ চাষিদের।

মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, চাষিদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে কৃষি বিভাগ থেকে নিয়মিত পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। পান চাষে কোনো নতুন সমস্যা দেখা দিলে তা গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

তবে চাষিরা বলছেন, শুধু পরামর্শ নয়, তাদের দরকার বাস্তব সহায়তা— সহজ শর্তে ঋণ, ভালো মানের সার-কীটনাশক, রোগবালাই দমনে প্রশিক্ষণ, আর সবচেয়ে বড় কথা, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা।

সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এই দুর্দিন থেকে খাসিয়া পানচাষিদের বাঁচাতে এখনই কয়েকটি উদ্যোগ নেওয়া দরকার।

সহজ শর্তে ঋণ: মহাজনের চড়া সুদে ঋণ নয়, সরকারি ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে, কম সুদে ঋণ দিতে হবে।

সরাসরি বিপণন: মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে চাষিরা যাতে সরাসরি পাইকার ও রপ্তানিকারকদের কাছে পান বিক্রি করতে পারেন, সেই ব্যবস্থা করতে হবে।

রপ্তানি সহায়তা: খাসিয়া পানের মান যাচাই, গ্রেডিং, প্যাকেজিং ও রপ্তানির জন্য আলাদা উদ্যোগ নিতে হবে। বিদেশে এই পানের চাহিদা আছে, শুধু সঠিক চ্যানেল দরকার।

জলবায়ু সহনশীল চাষ: বৃষ্টি কম হলেও যাতে উৎপাদন ধরে রাখা যায়, সেজন্য সেচ, ছায়া ব্যবস্থাপনা, রোগ প্রতিরোধী জাত নিয়ে গবেষণা দরকার।

পুঞ্জিতে সেবা পৌঁছে দেওয়া: কৃষি কর্মকর্তাদের নিয়মিত পুঞ্জি পরিদর্শন, মোবাইল সেবা, প্রশিক্ষণ কর্মশালা আয়োজন করতে হবে।

খাসিয়াদের কাছে পান শুধু একটা ফসল নয়। এটা তাদের বাপ-দাদার ঐতিহ্য, তাদের আত্মপরিচয়, তাদের বেঁচে থাকার অবলম্বন।

যে পান লন্ডনের বাজারে গিয়ে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করে, সেই পানের চাষি যদি ঋণে ডুবে না খেয়ে থাকেন, তাহলে সেটা আমাদের সবার জন্য লজ্জার।

লাউয়াছড়ার পুঞ্জিতে এখন সন্ধ্যা নেমেছে। নারীরা এখনো পান সাজাচ্ছেন। তাদের চোখে ক্লান্তি, কিন্তু হাতে এখনো যত্ন। তারা এখনো আশা ছাড়েননি— পরের মৌসুমে বৃষ্টি হবে, পান বড় হবে, দাম বাড়বে।এই আশাটুকুই খাসিয়াদের বাঁচিয়ে রেখেছে। এখন দরকার রাষ্ট্র আর সমাজের একটু সহায়তা, যাতে এই আশা ভেঙে না যায়।

—জা. অর্থনীতি/এনজে