মোফাজ্জল বিদ্যুৎ, ঢাকা: জমি, রাসায়নিক সার কিংবা বালাইনাশক ছাড়াই দেশে চাষ হচ্ছে পুষ্টিগুণে ভরপুর মাশরুম। অল্প জায়গা ও স্বল্প পুঁজিতে চাষের সুযোগ থাকায় দেশে পর্যায়ক্রমে সম্প্রসারিত হচ্ছে কৃষির এ খাত। একদিকে কৃষিতে রপ্তানির সম্ভাবনা অন্যদিকে পুষ্টিকর, সুস্বাদু ও ঔষধিগুণসম্পন্ন ফসলের জনপ্রিয়তাও ধাপে ধাপে বাড়ছে। তবে উৎপাদন বাড়লেও সুনির্দিষ্ট বাজার সংকট এবং সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনার অভাবে পিছিয়ে রয়েছে বিলিয়ন ডলার রপ্তানির সম্ভাবনার মাশরুম। জনগণের খাদ্যাভ্যাসে মাশরুমের উপস্থিতি না থাকা, পুষ্টিগুণ ও রন্ধন প্রণালী সম্পর্কে সচেতনতার ঘাটতি এবং প্রচারের অভাব বাজার তৈরিতে বাধা দিচ্ছে। একইসঙ্গে উন্নত মানসম্পন্ন স্পন বা বীজ প্রাপ্তিতে জটিলতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞানের ঘাটতি, দক্ষ জনবলের অভাব এবং উপযুক্ত প্যাকেজিং ব্যবস্থার অনুপস্থিতি পুরো খাতটিকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
জানা গেছে, মাশরুমের দেশীয় উৎপাদন বর্তমানে ৪০ হাজার টন ছাড়িয়ে গেছে যার বাজারমূল্য প্রায় ৮০০ কোটি টাকা। একটা সময় দেশের অভিজাত হোটেল ও রেস্তোরাঁগুলোর জন্য মাশরুম সম্পূর্ণ আমদানির ওপর নির্ভরশীল ছিল। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে যেখানে দেশে প্রায় ৭০ টন মাশরুম আমদানি করা হতো বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় শূন্যের কোটায়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্যানুযায়ী, দেশে বর্তমানে বছরে প্রায় ৪০ থেকে ৪২ হাজার টন মাশরুম উৎপাদিত হচ্ছে। বাজারে ওয়েস্টার মাশরুম প্রধান হলেও ব্ল্যাক বা কান, মিল্কি, ঋষি, ইরিনজি এবং বাটন জাতের মাশরুমও চাষ হচ্ছে। বর্তমানে উৎপাদিত মাশরুমের মোট বাজারমূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা বা ৬৫ দশমিক ৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। দেশে ১৭ কোটি মানুষের মধ্যে যদি মাত্র ১০ শতাংশ মানুষ নিয়মিত মাশরুম খান তবে দৈনিক প্রায় ৪৫০ টন মাশরুমের প্রয়োজন পড়ে। এতে বছরে প্রায় ১৫ লাখ ৫১ হাজার টনের বিশাল দেশীয় চাহিদা তৈরির সুযোগ রয়েছে। একইসঙ্গে নিয়মিত মাশরুম সেবন টিউমার প্রতিরোধ, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অন্যতম শীর্ষ বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্রান্ড ভিউ রিসার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী মাশরুমের বাজারের আকার ছিল প্রায় ৭১ দশমিক ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২৬ সালে এটি বৃদ্ধি পেয়ে ৭৮ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে বলে তারা প্রাক্কলন করেছে। এছাড়া বৈশ্বিক স্ট্র্যাটেজিক মার্কেট ইন্টেলিজেন্স প্ল্যাটফর্ম আইএমএআরসির তথ্যমতে, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক মাশরুমের বাজার ছিল ৭৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার যা ২০২৬ সালে বৃদ্ধি পেয়ে ৮০ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। ২০৩৪ সালের মধ্যে এই বাজার ১২৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে বলে তাদের পূর্বাভাস রয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজার ধরতে সরকারের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) বিভিন্ন উদ্যোগ এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের আগ্রহের কারণে চিত্র বদলে গেছে। চাষিদের মাশরুম চাষের লক্ষ্য এখন রপ্তানি ও স্থানীয় বাজারে মাশরুম জনপ্রিয় করে তোলা।
২০১৭ সাল থেকে ঢাকার ধামরাইয়ের আড়ালিয়া গ্রামের প্রবাসফেরত জহিরুল ইসলাম মাশরুম চাষ করে আসছেন। তার খামারে গিয়ে দেখা যায় প্রায় ২৫ হাজার স্পন রয়েছে। টিনের ছাউনি ও চারপাশ স্টিলের নেট দিয়ে ঘেরা তার খামার। ১০ শতাংশ জমিতে গড়ে তোলা খামারে রয়েছে ৩০০টি বেড। সেখান থেকে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ কেজি মাশরুম উৎপাদন হয়। বাজারে প্রতি কেজি ২৫০ থেকে ৪০০ টাকায় বিক্রি হয়। সব খরচ বাদ দিয়ে মাসে ৭৫ থেকে ৮০ হাজার টাকা লাভ হয় জহিরুলের। স্পন উৎপাদন ও বিক্রির পাশাপাশি মাশরুম ইনস্টিটিউটে প্রশিক্ষণ নিতে আসা চাষিদের অনুপ্রেরণার গল্প শোনান। বর্তমানে তার খামারের মূল্য ও বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০ লাখ টাকা।
জহিরুল ইসলাম জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, রপ্তানিযোগ্য মাশরুম চাষের দিকে নজর দিচ্ছি। বর্তমানে দেশে প্রধানত ওয়েস্টার মাশরুম উৎপাদিত হলেও ব্ল্যাক ইয়ার/কান, মিল্কি, ঋষি, ইরিনজি ও বাটন জাতের মাশরুমও কিছু অংশে চাষ হচ্ছে। তবে সুনির্দিষ্ট বাজার পেলে এবং ক্রেতা-বিক্রেতাদের মধ্যে সমন্বয় হলে মাশরুম চাষ ব্যাপক হারে বাড়বে।
জহিরুলের কথা অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে মাশরুমের এই বিপুল চাহিদাকে কাজে লাগানোর জন্য বাংলাদেশের সব প্রাকৃতিক সুবিধা রয়েছে। বাংলাদেশের আবহাওয়া মাশরুম চাষের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী। এখানে খুব অল্প পুঁজিতে ও অল্প জায়গায় ঘরের ভেতরেই উল্লম্ব পদ্ধতিতে মাশরুম চাষ করা সম্ভব যার জন্য কোনো বিপুল আবাদি জমির প্রয়োজন হয় না। মাশরুম থেকে কোটি টাকা আয়ের সুযোগ রয়েছে চাষিদের।
টিউমার প্রতিরোধ, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে মাশরুমের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে জানান বেসরকারি মুন্ন মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক ডা. বজলুল করিম চৌধুরী। তিনি জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘মাশরুম প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার হওয়ায় মাছ-মাংসের বিকল্প হিসেবে খাওয়া যায়। এতে প্রায় সব ধরনের খাবার উপাদান রয়েছে। অনুখাদ্যের জন্য একটি আদর্শ খাবার হিসেবে বিবেচনা করা যায়। আমরা বহু রোগীকে মাশরুম খাওয়ার সাজেস্ট করে থাকি। সুস্থ থাকার জন্য পর্যায়ক্রমে মাশরুম মানুষের খাদ্য তালিকায় যুক্ত হচ্ছে।’
মাশরুমের বিপুল সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতায় ডিএই ‘মাশরুম চাষ সম্প্রসারণের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন ও দারিদ্র্য হ্রাসকরণ প্রকল্প’ বাস্তবায়ন করছে। ২০২৩ থেকে ২০২৭ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরমেয়াদি এই প্রকল্পের অনুমোদিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৯৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকা যার মাধ্যমে ২৫টি নতুন জার্মপ্লাজম সংগ্রহ ও বাংলাদেশের উপযোগী ২০টি প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ করা হয়েছে। মাশরুম উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (সাভার, ঢাকা) সক্ষমতা বৃদ্ধিসহ দেশের ৪৪টি জেলা, ১৪৮টি উপজেলা ও ১৫টি মেট্রোপলিটন থানা এলাকায় এর কাজ বিস্তৃত করা হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৬০০ উদ্যোক্তা এবং ১৮ হাজার দলভুক্ত চাষি তৈরি হয়েছে। নতুন ৩৫টি জার্মপ্লাজম সংগ্রহ, ১৮টি উৎপাদন প্রযুক্তি এবং ২৫টির বেশি প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এই প্রকল্পটির মাধ্যমে চাষ সম্প্রসারণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের মানোন্নয়ন করা গেলে ২০৩০-৩৩ সালের মধ্যে মাশরুমের বার্ষিক দেশীয় বাজার মূল্য ১১৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব। একইসঙ্গে স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে প্রক্রিয়াজাত মাশরুম বিশ্ববাজারে রপ্তানি করার সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হবে।
রপ্তানির বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ড. মোসা. আখতার জাহান কাঁকন জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে বাণিজ্যিক স্তরে মাশরুমের ব্যাপক রপ্তানি এখনও শুরু না হলেও এরই মধ্যে হংকং, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর এবং সৌদি আরবের মতো দেশগুলোতে মাশরুমের বিভিন্ন জাতের স্যাম্পল (যেমন- গ্যানোডার্মা, ব্ল্যাক ফাঙ্গাস, ঋষি) পাঠানো হয়েছে এবং বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে অত্যন্ত ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে। বিশেষ করে চীন ও ইউরোপের দেশগুলোতে মাশরুমের যে বিশাল ঘাটতি রয়েছে তা পূরণে বাংলাদেশ বড় ভূমিকা রাখতে পারে।’
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্ল্যান্ট প্যাথলজি বিভাগের অধ্যাপক আবু নোমান ফারুক আহম্মেদ জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘সরকারের পরিকল্পনার আওতায় প্রতিটি ভবনের ছাদে চার থেকে পাঁচ ফুট ওপরে সৌর প্যানেল বসালে প্যানেল ও ছাদের মধ্যবর্তী পুরো জায়গাটিকে সহজেই একটি মাশরুম হাউজ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। ওপরে সৌর প্যানেলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং নিচে কৃষি কাজ করার এই যৌথ রূপকে বলা হয় এগ্রোভোলটাইক্স যার মাধ্যমে এক প্রয়াসেই জোড়া সুবিধা অর্জন করা যাবে। একইসঙ্গে উৎপাদন বাড়লে আমদানিনির্ভরতা কমবে এবং রপ্তানিরও বড় সুযোগ তৈরি হবে।