পলাশ কুণ্ডু: আদালত প্রাঙ্গণে শিক্ষানবিশ আইনজীবীর সংখ্যা বর্তমানে লক্ষণীয়। তাদের বিজ্ঞ সিনিয়র আইনজীবীরা সেরেস্তায় হাতে-কলমে কাজ ও পেশাগত আচার-নীতি শেখান। দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে আইন বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনকারী শিক্ষানবিশরা প্রতিনিয়ত পড়ালেখা করার পাশাপাশি চেম্বারে বা ল’ ফার্মে আইন চর্চায় নিয়োজিত।
মক্কেলকে সরাসরি আইনি পরামর্শ দেওয়ার এখতিয়ার শিক্ষানবিশদের নেই, কারণ তারা বাংলাদেশ বার কাউন্সিল থেকে মোকদ্দমা পরিচালনার জন্য সনদপ্রাপ্ত বা স্বীকৃতিপ্রাপ্ত নন। তবে তারা ঘটনার বিবরণ শুনে-বুঝে ও দলিল-দস্তাবেজ দেখে বিজ্ঞ সিনিয়র আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করে প্রাথমিকভাবে মক্কেলকে আইনি মতামত দিতে পারেন। এছাড়া ব্যবহারিক জ্ঞানসম্পন্ন শিক্ষানবিশ আইনজীবীরা যেকোনো বৈধ চুক্তি বা অঙ্গীকারনামা সঠিক মূল্যমানের স্ট্যাম্প পেপারে বিধিবিধান মোতাবেক পরিপাটিভাবে লিখতে পারদর্শী।
মামলা-মোকদ্দমার ক্ষেত্রে বিশেষ পরিচয়বাহী টাউট-দালাল-বাটপাড়ের আশ্রয় নেওয়া থেকে ন্যায়বিচার প্রার্থীদের বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন বিজ্ঞ আইনজীবীরা। উল্লেখ্য, শিক্ষানবিশ থাকাকালীন কেউ অর্থ উপার্জনের লক্ষ্যে বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে নিজেকে আইনজীবী হিসেবে পরিচয় দিতে পারবে না। পেশাসংক্রান্ত এরূপ পন্থা অবলম্বনকারী প্রতারককে ‘টাউট’ আখ্যায়িত করে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বার কাউন্সিল তিনটি কঠিন ধাপে জটিল প্রশ্ন-প্যাটার্নে অনিয়মিতভাবে আইনজীবী তালিকাভুক্তির পরীক্ষা নিয়ে থাকে। বার কাউন্সিলের এরূপ কৌশলগত পদ্ধতির কারণে শিক্ষানবিশ আইনজীবীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। শিক্ষানবিশ আইনজীবীদের ভাষ্যমতে, যেহেতু এটি বেতনভিত্তিক কোনো চাকরি নয়, সেহেতু বার কাউন্সিলের উচিত নিয়মিত সহজ পদ্ধতিতে পরীক্ষা নিয়ে লাইসেন্স বা সনদ প্রদানের মাধ্যমে পেশাগত পরিচয় নিশ্চিত করা। আইন অনুশীলনকারীরা প্রত্যাশা করেন, প্রাজ্ঞ সিনিয়ররা তাদের অধীনে শিক্ষানবিশদের কাজ করার সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি বর্তমান প্রেক্ষাপট উপলব্ধি করে আর্থিক সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে আমলে নেবেন।
একদিকে সনদ প্রাপ্তির দীর্ঘসূত্রতা অন্যদিকে নতুন করে যুক্ত হয়েছে বয়সের নতুন বিধি-নিষেধের শঙ্কা। সম্প্রতি আইন শিক্ষার্থী ও শিক্ষানবিশ আইনজীবীদের মাঝে একটি প্রবল শোরগোল শুরু হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভেসে আসছে আইনজীবী হওয়ার যোগ্যতায় ভবিষ্যতে নাকি ৩৫ বছর বয়স পর্যন্ত আবেদন করতে পারবেন শিক্ষানবিশরা।
কিন্তু এই বয়স নির্ধারণের পক্ষে-বিপক্ষে মতামত ও মন্তব্য অনেক হলেও সবচেয়ে যৌক্তিক প্রশ্নটি হলো— এটি তো ডাক্তারি পেশা নয় যে, নির্দিষ্ট বয়স নির্ধারণ করতেই হবে! আবার এটি কোনো সরকারি বা বেসরকারি চাকরিও নয়। তাহলে স্বাধীন এই পেশায় বয়স নির্ধারণের দরকারটাই বা কী?
আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন— এটি সম্পূর্ণ একটি স্বাধীন পেশা। তাই বয়সের বেড়াজাল তৈরি করার চেয়ে শিক্ষার মান, কোর্সের ধরন এবং আইন শিক্ষা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কঠোর তদারকির দিকে নজর দেওয়ার সময় এসেছে। উকিল হওয়ার মতো একটি স্বাধীন পেশায় বয়সের সীমাবদ্ধতা টেনে আনা নিছক নতুন বাধা সৃষ্টি করা বলেই মনে করছেন ৩৫ বছর বা তদূর্ধ্ব শিক্ষার্থী ও শিক্ষানবিসরা।
সর্বোপরি, আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও সিনিয়রের অনুগত শিক্ষানবিস আইনজীবীরা অর্থলোভে পথভ্রষ্ট না হয়ে বৈধ প্রক্রিয়ায় যৌক্তিক সমাধানের পথ নির্ধারণে প্রতিকার প্রার্থীকে সহায়তা করবেন এবং আইন শিক্ষায় তাদের অর্জিত জ্ঞান জনকল্যাণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে প্রত্যাশা সবার।
কার্যনির্বাহী সদস্য
জেলা ট্যাক্সেস বার অ্যাসোসিয়েশন, নীলফামারী