অনলাইন ডেস্ক: বিছানায় দীর্ঘক্ষণ এপাশ-ওপাশ করা কিংবা মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে পুনরায় না আসা একটি সাধারণ হলেও জটিল স্বাস্থ্যগত সমস্যা। বিশেষজ্ঞদের মতে, সপ্তাহে অন্তত তিন রাত এমন সমস্যা হওয়া এবং তা তিন মাস বা তার বেশি সময় ধরে স্থায়ী হয়ে যদি প্রাত্যহিক কাজে ব্যাঘাত ঘটায়, তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় তাকে দীর্ঘমেয়াদি অনিদ্রা বা ইনসমনিয়া বলা হয়। মানুষের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের অভ্যন্তরীণ দেহঘড়ি বা বায়োলজিক্যাল ক্লক পরিবর্তিত হয়, ফলে বয়স্ক ব্যক্তিদের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। এছাড়া জিনগত কারণ, পরিবেশগত চাপ এবং দুশ্চিন্তা ঘুমের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে নষ্ট করে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্লিপ মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক কলিন ইসপির মতে, উদ্বেগ বা মানসিক চাপ মানুষের মস্তিষ্কে বিপদের সতর্কতা তৈরি করে, যা ঘুম তাড়াতে বাধ্য করে। পাশাপাশি অনিয়মিত কাজের সময়সূচি বা দিনে অতিরিক্ত ঘুমের অভ্যাসও রাতের স্বাভাবিক বিশ্রামে বাধা সৃষ্টি করে।
ঘুম না এলে জোর করে ঘুমানোর চেষ্টা করা সবচেয়ে বড় ভুল বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। অধ্যাপক ইসপির মতে, জোর করে ঘুম আনা যায় না; বরং বারবার চেষ্টা করলে উদ্বেগ আরও বাড়ে, তাই ঘুম না এলে সাময়িকভাবে জেগে থাকার মানসিকতা গ্রহণ করা এবং বিছানা ছেড়ে উঠে গিয়ে কিছুক্ষণ পর আবার নতুন করে ঘুমাতে যাওয়াই কার্যকর। ব্রিটিশ স্লিপ সোসাইটির প্রেসিডেন্ট ড. অ্যালি হায়ার জানান, অনেক সময় সঙ্গীর নাক ডাকা বা পাশ ফেরার কারণে ঘুমে ব্যাঘাত ঘটলে আলাদা ঘরে ঘুমানোর কৌশল বা 'স্লিপ ডিভোর্স' বেছে নেওয়া যেতে পারে। এছাড়া সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের ড. ফেইথ অর্চার্ড পরামর্শ দেন, বিছানায় বসে কাজ করা বা সোফায় ঘুমিয়ে পড়ার অভ্যাস পরিহার করে ঘুমানোর জন্য নির্দিষ্ট স্থান ও সময় নির্ধারণ করা প্রয়োজন। রাতে মন অস্থির থাকলে কিছু সময় হালকা কোনো বই পড়ে মস্তিষ্ক শান্ত করে নেওয়া যেতে পারে।
অনিদ্রার সমাধান হিসেবে বিশেষজ্ঞরা নিয়মিত ঘুমের ওষুধ খাওয়ার পরিবর্তে মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসার ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। ড. হায়ার ও অধ্যাপক ইসপি জানান, কগনিটিভ বিহেভিওরাল থেরাপি (সিবিটি) নামক আচরণগত চিকিৎসা শতকরা ৭০ থেকে ৮০ ভাগ রোগীর ক্ষেত্রে ইতিবাচক ফল দেয় এবং এর মাধ্যমে প্রায় অর্ধেক রোগী পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেন। এই থেরাপির অংশ হিসেবে ‘স্লিপ রেস্ট্রিকশন থেরাপি’ প্রয়োগ করা হয়, যেখানে রোগীকে সামান্য দেরিতে ঘুমাতে গিয়ে খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠার মাধ্যমে একটি স্থায়ী রুটিনে অভ্যস্ত করানো হয়। অনিদ্রা কাটাতে বাজারে প্রচলিত মেলাটোনিন বা ম্যাগনেসিয়ামের মতো সম্পূরক বা ওষুধের কার্যকারিতা সম্পর্কে তারা জানান, বড় কোনো বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এসবের বড় ধরনের সুফল নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়নি, বরং অনেক ক্ষেত্রেই এগুলো সাময়িক মানসিক আশ্বাসের অংশ হিসেবে কাজ করে।
বিভিন্ন বাহ্যিক উপাদান ও শারীরিক অবস্থাও ঘুমের গভীরতায় সরাসরি প্রভাব ফেলে। ডিজিটাল পর্দার ক্ষেত্রে শুধু ডিভাইসের ব্যবহার নয়, বরং স্ক্রিনে কী ধরনের উপাদান দেখা হচ্ছে এবং কী ধরনের আলো চোখে পড়ছে তা গুরুত্বপূর্ণ; উত্তেজনা সৃষ্টিকারী কোনো বিষয় স্ক্রিনে দেখলে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। এছাড়া নারীদের ক্ষেত্রে মেনোপজ বা রজোবিরতি চলাকালীন হরমোনের পরিবর্তন, শারীরিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি বা হট ফ্ল্যাশ এবং মেজাজের ওঠানামা ঘুম ব্যাহত করে। অন্যদিকে অ্যালকোহল পান পেশি শিথিল করে নাক ডাকার সমস্যা বাড়ায়, বারবার মূত্রত্যাগের প্রবণতা তৈরি করে এবং ঘুমের গভীরতার স্বাভাবিক বিন্যাস নষ্ট করে দেয়। যারা রাতের পালায় বা নাইট শিফটে দায়িত্ব পালন করেন, তাদের ক্ষেত্রে ছুটির দিনগুলোতে নিয়মিত সময়ে স্বাভাবিক ঘুম নিশ্চিত করার পাশাপাশি দিনের বিভিন্ন সময়ে স্বল্প সময়ের ঘুম বা ন্যাপ নিয়ে ঘুমের ঘাটতি পূরণ করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
জেএ/অভি