Print Date & Time : 07 November 2026 Saturday 01:51 am

তিন মাসে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে ৩১ শতাংশ (ভিডিও)

image

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: আমদানি বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে, কিন্তু সেই তুলনায় বাড়ছে না রপ্তানি আয়। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সেও রয়েছে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি। তারপরও সামাল দেওয়া যাচ্ছে না বৈদেশিক লেনদেনের চাপ। মাত্র তিন মাসেই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে প্রায় ৩১ শতাংশ। শুধু তাই নয়, উদ্বৃত্ত থেকে ঘুরে সামগ্রিক বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য এখন বড় ঘাটতিতে।

বাণিজ্য ঘাটতি বৃদ্ধির এমন উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ বৈদেশিক লেনদেনের পরিসংখ্যানে। 

 

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর-এই তিন মাসে দেশের পণ্য আমদানি ও রপ্তানির ব্যবধান বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলারে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই ঘাটতি ছিল ৫ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে ১ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলার, যা প্রায় ৩০ দশমিক ৭৭ শতাংশ।

এই ঘাটতি বৃদ্ধির প্রধান কারণ আমদানি ব্যয়ের উচ্চ প্রবৃদ্ধি। প্রথম তিন মাসে পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ১৯ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার। আগের বছর একই সময়ে যা ছিল ১৬ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ আমদানি ব্যয় বেড়েছে ১৫ দশমিক ১ শতাংশ।

এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে জ্বালানি আমদানি ব্যয়। গত বছরের একই সময়ে জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল ২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলারে। প্রবৃদ্ধি প্রায় ১০৫ শতাংশ।

এ ছাড়া রমজানকে সামনে রেখে চিনি ও ভোজ্য তেল আমদানি বেড়েছে। পাশাপাশি গম, তৈলবীজ ও ওষুধশিল্পের কাঁচামালসহ বিভিন্ন পণ্যের আমদানিও বেড়েছে। তবে মূলধনি যন্ত্রপাতি ও কাঁচা তুলার আমদানি কমেছে।

অন্যদিকে, একই সময়ে পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ১১ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে আয় ছিল ১১ দশমিক ০৯ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ রপ্তানি আয় বেড়েছে প্রায় ৭ শতাংশ। তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে এসেছে ১০ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৬ দশমিক ২ শতাংশ বেশি।

অর্থাৎ আমদানি ব্যয় যেখানে ১৫ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে, সেখানে রপ্তানি আয় বেড়েছে মাত্র ৭ শতাংশ। এই ব্যবধানই বাড়িয়ে তুলছে বাণিজ্য ঘাটতি।

এদিকে বৈদেশিক লেনদেনে কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে প্রবাসী আয়। জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৮৫৯ কোটি ২০ লাখ ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এসেছিল ৭৫৮ কোটি ৫০ লাখ ডলার। অর্থাৎ রেমিট্যান্স বেড়েছে ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ।

তবে রেমিট্যান্স বাড়লেও চলতি হিসাবের ঘাটতি কমেনি। বরং তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩৩ কোটি ২০ লাখ ডলারে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই ঘাটতি ছিল ৮২ কোটি ১০ লাখ ডলার। এ ছাড়া সেবা খাতে ঘাটতি হয়েছে ১২৮ কোটি ৩০ লাখ ডলার এবং প্রাথমিক আয় খাতে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৩০ কোটি ১০ লাখ ডলার।

আরও উদ্বেগের বিষয়, সামগ্রিক বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যেও বড় পরিবর্তন এসেছে। গত অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ৮৫ কোটি ৩০ লাখ ডলারের উদ্বৃত্ত থাকলেও এবার ১১৬ কোটি ৪০ লাখ ডলারের ঘাটতি হয়েছে।

আর্থিক হিসাবে উদ্বৃত্তও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই উদ্বৃত্ত ছিল ১৭৯ কোটি ৬০ লাখ ডলার, এবার তা নেমে এসেছে ৩২ কোটি ৩০ লাখ ডলারে। একই সময়ে নিট বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগ বা এফডিআই এসেছে ৩৫ কোটি ৩০ লাখ ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় কিছুটা কম।

এ ছাড়া প্রথম তিন মাসে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ নেওয়া হয়েছে ৫৪ কোটি ২০ লাখ ডলার। বিপরীতে ঋণের আসল পরিশোধ করতে হয়েছে ৮৯ কোটি ৪০ লাখ ডলার।

অর্থনীতিবিদদের মতে, আমদানি ও রপ্তানির প্রবৃদ্ধির এই ব্যবধান বৈদেশিক মুদ্রাবাজার ও রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরির অন্যতম কারণ।

এ পরিস্থিতি সামাল দিতে রপ্তানি বহুমুখীকরণ, আনুষ্ঠানিক পথে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানো, উৎপাদনমুখী আমদানিকে অগ্রাধিকার দেওয়া, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় সতর্কতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

সব মিলিয়ে রপ্তানি ও প্রবাসী আয় বাড়লেও আমদানি ব্যয়ের উচ্চ প্রবৃদ্ধি এবং বৈদেশিক দায়ের চাপে দেশের বৈদেশিক খাত এখন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে। এই চাপ সামাল দেওয়া না গেলে আগামী মাসগুলোতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর আরও চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।  

—জা. অর্থনীতি/এলএটি