দেশে একের পর এক সরকারি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। নতুন মেডিকেল কলেজ স্থাপনের মধ্য দিয়ে চিকিৎসক তৈরির সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ প্রশংসনীয় হলেও একটি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার অর্থ শুধু অ্যাকাডেমিক ভবন, শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষক নিয়োগ নয়। চিকিৎসাশিক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ। আর সেজন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন হাসপাতাল। দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, দেশে ১২টি সরকারি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার ৮ থেকে ১৮ বছর পার হলেও সেগুলোর নিজস্ব হাসপাতাল ভবন নির্মিত হয়নি। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসাশিক্ষার মান ও ভবিষ্যৎ চিকিৎসকদের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
পাবনা, নোয়াখালী ও কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ২০০৮ সালে। এরপর ২০১১ সালে যশোর, ২০১৪ সালে জামালপুর ও রাঙামাটি, ২০১৭ সালে হবিগঞ্জ এবং ২০১৮ সালে নীলফামারী, নেত্রকোনা, নওগাঁ, মাগুরা ও চাঁদপুর মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য ২১২ থেকে ২৭৮ শয্যার হাসপাতাল অনুমোদিত থাকলেও এখন পর্যন্ত হাসপাতাল ভবন নির্মাণ হয়নি। কোনো কোনো কলেজ থেকে একাধিক ব্যাচের শিক্ষার্থী এমবিবিএস ডিগ্রি নিয়ে বের হয়েছেন। অথচ তাদের শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ সম্পন্ন করতে হয়েছে অন্য হাসপাতালের ওপর নির্ভর করে।
মেডিকেল শিক্ষার সঙ্গে সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। এখানে শুধু বই পড়ে কিংবা শ্রেণিকক্ষে পাঠ গ্রহণ করে একজন দক্ষ চিকিৎসক হয়ে ওঠা সম্ভব নয়। রোগীর উপসর্গ পর্যবেক্ষণ, রোগ নির্ণয়, বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফল বিশ্লেষণ, চিকিৎসাপদ্ধতি নির্ধারণ এবং জটিল পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হয়। এসব দক্ষতা গড়ে ওঠে হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগে রোগীর সরাসরি সংস্পর্শে থেকে। ফলে একটি মেডিকেল কলেজের সঙ্গে মানসম্মত হাসপাতালের সংযুক্তি কোনো অতিরিক্ত সুবিধা নয়, বরং চিকিৎসাশিক্ষার অপরিহার্য শর্ত। উপায় না থাকায় বর্তমানে এসব কলেজের শিক্ষার্থী জেলা সদর ও জেনারেল হাসপাতাল ব্যবহার করে ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন।
জেলা সদর হাসপাতালে সাধারণ রোগের চিকিৎসা হলেও সব ধরনের জটিল ও বিশেষায়িত চিকিৎসার পর্যাপ্ত সুযোগ থাকে না। একটি পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মেডিসিন, সার্জারি, গাইনি, শিশু, হৃদ্রোগ, ক্যানসারসহ বিভিন্ন বিভাগের সমন্বিত চিকিৎসাসেবা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ থাকা প্রয়োজন। নিজস্ব হাসপাতাল না থাকলে শিক্ষার্থীরা এসব ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা অর্জন থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। এর প্রভাব ভবিষ্যতে চিকিৎসকদের পেশাগত দক্ষতার ওপর পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বিষয়টি শুধু শিক্ষার্থীদের স্বার্থের নয়, দেশের সামগ্রিক চিকিৎসাসেবার মানের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
জমি নির্বাচন, অধিগ্রহণ, উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি ও অনুমোদনের মতো প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা এ সমস্যার অন্যতম কারণ। যদিও ১২টি কলেজের জন্য সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব তৈরির কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদপ্তর। তবে কবে প্রকল্পটি অনুমোদিত হবে, কবে অর্থ বরাদ্দ হবে এবং কবে নির্মাণকাজ শুরু হবে, তার কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই।
এ অবস্থার অবসান হওয়া জরুরি। নতুন মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার চেয়ে আগে প্রতিষ্ঠিত কলেজগুলোর প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সমন্বিত প্রকল্প প্রস্তাব দ্রুত চূড়ান্ত করে মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা কমিশনের প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিটি কলেজের জন্য জমি অধিগ্রহণ, হাসপাতাল নির্মাণ, জনবল নিয়োগ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহের পৃথক সময়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা করতে হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থাও থাকতে হবে।
হাসপাতাল নির্মাণের অপেক্ষায় থাকা কলেজগুলোর শিক্ষার্থীদের বর্তমান সংকটও উপেক্ষা করা যাবে না। স্থায়ী হাসপাতাল চালু না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট জেলা সদর ও জেনারেল হাসপাতালের সঙ্গে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে। প্রয়োজনে বিশেষায়িত হাসপাতালের সঙ্গে সংযুক্ত করে শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়াতে হবে। পর্যাপ্ত শিক্ষক, চিকিৎসক, ল্যাবরেটরি ও ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।
চিকিৎসক তৈরির লক্ষ্য শুধু এমবিবিএস ডিগ্রিধারীর সংখ্যা বাড়ানো হতে পারে না। প্রয়োজন দক্ষ, অভিজ্ঞ ও মানবিক চিকিৎসক, যাদের হাতে মানুষের জীবন নিরাপদ থাকবে। হাসপাতাল ছাড়া মেডিকেল কলেজ পরিচালনা করে সেই লক্ষ্য অর্জন কঠিন। তাই নতুন ভবন নির্মাণের প্রতিশ্রুতিতে সীমাবদ্ধ না থেকে দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য উদ্যোগ নিতে হবে। ১২টি সরকারি মেডিকেল কলেজের নিজস্ব হাসপাতাল নির্মাণে বিলম্ব আর কাম্য নয়।