হাসান আরিফ, ঢাকা: দেশের উপকূলীয় দ্বীপ ও চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ সচল রাখতে যাত্রী পরিবহন সেবা দিয়ে আসছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি)। তবে এসব সেবা পরিচালনা করতে গিয়ে প্রতিবছর লোকসান গুনতে হচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটিকে। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাতে সংস্থাটির লোকসান হয়েছে ১৫ কোটি টাকা। এই লোকসান সামাল দিতে সরকারের কাছ থেকে পাওয়া বার্ষিক ভর্তুকি ৫০ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ কোটি টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে বিআইডব্লিউটিসি। অর্থাৎ বর্তমানের তুলনায় ভর্তুকি ১০ গুণ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সংস্থাটি।
বিআইডব্লিউটিসির পরিচালক (বাণিজ্য) এস এম আশিকুজ্জামান জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে দ্বীপাঞ্চলের বাসিন্দাদের যোগাযোগ রক্ষায় বিআইডব্লিউটিসি যাত্রী পরিবহন সেবা দিয়ে যাচ্ছে। এ সেবা পরিচালনা করতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে নিয়মিত লোকসান দিতে হচ্ছে। তাই যাত্রী পরিবহনে লোকসান কমিয়ে আনার চেষ্টা করছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে এ খাতে সরকারের দেওয়া বার্ষিক ৫০ লাখ টাকার ভর্তুকি বাড়িয়ে ৫ কোটি টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
বিআইডব্লিউটিসির তথ্য অনুযায়ী, দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে হাতিয়া, সন্দ্বীপ, ভোলা, চর কুকরি-মুকরি, মনপুরা, মহেশখালী, কুতুবদিয়া ও শাহপরীর দ্বীপের মতো বেশ কয়েকটি বড় দ্বীপ, চর ও দ্বীপাঞ্চল রয়েছে। এসব এলাকার বাসিন্দাদের শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ দৈনন্দিন প্রয়োজনে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়। নৌপথই এসব এলাকার যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম। এ কারণে দ্বীপাঞ্চলের মানুষের যাতায়াতের সুবিধা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন ধরনের নৌযান পরিচালনা করছে বিআইডব্লিউটিসি।
বর্তমানে এসব নৌপথে সংস্থাটির ১০টি সি-ট্রাক, চারটি জাহাজ ও দুটি ফেরি চলাচল করছে। এসব নৌযানের মাধ্যমে দ্বীপ ও চরাঞ্চলের মানুষের যাতায়াতের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। তবে যাত্রী পরিবহন সেবা থেকে আয় এবং পরিচালন ব্যয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য না থাকায় সংস্থাটিকে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে। গত অর্থবছরে এ খাতে ১৫ কোটি টাকা লোকসানের তথ্য সেই আর্থিক চাপেরই চিত্র তুলে ধরেছে।
এ অবস্থায় ভর্তুকির পরিমাণ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে বিআইডব্লিউটিসি। বর্তমানে সরকার এ খাতে বছরে ৫০ লাখ টাকা ভর্তুকি দেয়। সংস্থাটির প্রস্তাব অনুযায়ী, তা বাড়িয়ে ৫ কোটি টাকা করা হলে অতিরিক্ত ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা সরকারি সহায়তা প্রয়োজন হবে। তবে প্রস্তাবিত ৫ কোটি টাকা ভর্তুকি পাওয়া গেলেও গত অর্থবছরের ১৫ কোটি টাকার লোকসানের পুরোটা এ অর্থ দিয়ে পূরণ করা সম্ভব হবে না। ফলে লোকসান কমানোর পাশাপাশি সেবার আর্থিক ব্যবস্থাপনা উন্নত করার বিষয়টিও সংস্থাটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
ভর্তুকি বাড়ানোর প্রস্তাবটি পর্যালোচনার জন্য আগামী সোমবার সকাল ১০টায় সভা ডেকেছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশ সচিবালয়ে মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে বিআইডব্লিউটিসির উপকূলীয় যাত্রী সার্ভিসের পরিচালনাসংক্রান্ত বিষয় ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা পর্যালোচনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সভায় বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে। সভায় অংশগ্রহণের জন্য অর্থ বিভাগের সচিবকে উপযুক্ত প্রতিনিধি পাঠানোর অনুরোধ জানিয়েছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। এছাড়া মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখা ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদেরও উপস্থিত থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ফলে ভর্তুকি বৃদ্ধির প্রস্তাব নিয়ে অর্থ বিভাগের মতামত এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর পর্যালোচনা এ বৈঠকে গুরুত্ব পাবে।
বিআইডব্লিউটিসির জন্য উপকূলীয় যাত্রী পরিবহন শুধু বাণিজ্যিক কার্যক্রম নয়, দ্বীপাঞ্চলের মানুষের যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তাও এর সঙ্গে যুক্ত। দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন এসব এলাকার বাসিন্দাদের নৌপথে যাতায়াতের সুযোগ সচল রাখা জরুরি। বিশেষ করে যেসব এলাকায় বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা সীমিত, সেখানে নৌপরিবহন সেবার ধারাবাহিকতা স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কারণ এসব পথ লাভজনক না হওয়ায় বেসরকারি পরিবহন ব্যবস্থা খুব একটা কার্যকর না।
সূত্র জানিয়েছে, যাত্রী পরিবহন সেবা চালু রাখার পাশাপাশি সংস্থাটির লোকসান কমানোও বড় চ্যালেঞ্জ। এজন্য একদিকে পরিচালন ব্যয় ও আয়-ব্যয়ের হিসাব পর্যালোচনা, অন্যদিকে সরকারি সহায়তার পরিমাণ পুনর্নির্ধারণের বিষয়টি সামনে এসেছে। বিআইডব্লিউটিসি ভর্তুকি বাড়ানোর যে প্রস্তাব দিয়েছে, তা অনুমোদিত হলে এ খাতে সরকারের বার্ষিক সহায়তা ৫ কোটি টাকায় উন্নীত হবে। তবে এ বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের পর্যালোচনা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের পরই ভর্তুকির নতুন পরিমাণ নির্ধারিত হবে।